নিহত পুলিশের স্বজনরা কাঁদলেন, কাঁদালেন

আপডেট : ০৭ মে ২০১৪, ০০:০৭
কনস্টেবল বরুণ কুমার দে’র স্ত্রী শীলা রানী দে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। আর চিত্কার করে বলছিলেন, ‘ও আমাকে ফোনে বলল, হরতাল ডিউটি শেষে বাড়ি আসছি। মেয়ের জন্য লাল টুকটুকে জামা কিনে আনব। আমি ওর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ২-৩ ঘন্টা পর আবার মোবাইল বেজে ওঠল। মোবাইল ধরতেই ওপাশ থেকে জানাল, আমার সব শেষ হয়ে গেছে।’ কনস্টেবল বরুণ কুমার দে গত বছরের ১৪ মার্চ রাতে খুলনার খানজাহান আলী থানা এলাকায় হরতাল ডিউটি পালনকালে জামায়াত-শিবিরের হামলায় নিহত হয়েছেন। প্রিয় মানুষরা নেই। চলে গেছেন না ফেরার দেশে। স্বাভাবিক মৃত্যু হলে হয়তো মনকে বোঝাতে পারতেন স্বজনরা। কিন্তু ঘরে ফেরার কথা দিয়েও শেষ পর্যন্ত কথা রাখেননি বরুণের মত আরো ১০৮ জন পুলিশ সদস্য। এরা সবাই গত বছর দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এদের মধ্যে সরকার বিরোধী আন্দোলন ঠেকাতে গিয়ে ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। নিহত পুলিশ সদস্যদের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ আয়োজন করে এক শোকসভার। গত সোমবার রাতে রমনার পুলিশ কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত ওই শোক সভাটি বাস্তবেই শোক সভায় পরিণত হয়। নিহতদের স্বজনরা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল, পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পেয়ে জানালেন নিজেদের জমাট দুঃখ, দুর্দশার কথা। প্রিয় মানুষদের কথা মনে করে স্বজনরা নিজেরা কাঁদলেন, কাঁদালেন আগত কর্মকর্তাদেরও। স্বামী-সন্তানহারা, বাবা-ভাইহারাদের মর্মস্পর্শী বর্ণনা শোনার আগ পর্যন্ত হয়ত তারাও ভাবেননি শোক সভাটি এমন বেদনাদায়ক হবে। চরম ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষদের কিভাবে ক্ষতিপূরুণ দেয়া যায় সেই চিন্তাই এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। স্বজনরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক পরিবার থেকে একজনকে চাকরি প্রদানের দাবি তোলেন। গাইবান্ধার বামনডাঙায় নিহত কনস্টেবল খাজা নাজিম উদ্দিনের স্ত্রী ফিরোজা বেগম জানান, তার বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এক ছেলে সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে চাকরি নিয়ে আলাদা থাকে। ছোট ছেলে ফরিদুল ইসলাম রাজশাহী প্রকৌশল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়াশুনা করছে। তার প্রতিমাসের পড়াশুনার খরচ যোগানো সম্ভব হচ্ছে না। শিলা রানী দে বলেন, বরুণের খবর যখন আসলো তখন আমি ৬ বছরের মেয়ে সিনথিয়াকে খাওয়াচ্ছিলাম। এখন মাসে পেনশন ভাতা হিসাবে মাত্র ১২শ’ টাকা পাই। বললেন, এ টাকা দিয়ে কিভাবে সংসার চালাবেন তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি পাস জানিয়ে বলেন, প্রাইমারি স্কুলে একটি চাকরি হলে তার সংসার বেঁচে যাবে। খুলনার কয়রার বেতকাশী ক্যাম্পে গত বছরের ১০ মার্চ রাতে জামায়াত-শিবির কর্মীরা হামলা চালায়। এসময় গুলিতে নিহত হন কনস্টেবল মফিজুর রহমান। খুলনার দিঘলিয়া বাজারে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে এই কনস্টেবল তার পরিবারসহ থাকতেন। বড় ছেলে পারভেজ শেখ পার্শ্ববতী লোহাগড়া কলেজে হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। ছোট ছেলে শরিফ উদ্দিন সাগর দিঘলিয়ার একটি কলেজে ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত। মফিজুরের স্ত্রী আজমিরা বেগম বলেন, স্বামী নিহত হওয়ার পর এখন ঘর ভাড়া দিয়ে সংসার চালানো তার জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ফরিদপুর জেলা পুলিশের অধীনে কম্পিউটার অপারেটর পদে ছোট ছেলে চাকরির আবেদন করেছে। পরীক্ষা দিয়েছে। পুলিশ সদর দফতর থেকে জানানো হয়েছে, তার ছেলের চাকরি হয়েছে। কিন্তু গত তিনমাস ধরে ফরিদপুর জেলা পুলিশের কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও এখন পর্যন্ত নিয়োগপত্র হাতে পাননি। গত বছরের ১৪ আগস্ট হবিগঞ্জে লাখাই থানা এলাকায় ডিউটি করার সময় আল্পনা চৌধুরীর স্বামী এসআই কাঞ্চন দেবকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তাদের মেয়ে পাঁচ বছরের আদৃতা এখন তার বাবাকে খোঁজে। পুলিশ কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত শোক সভায় আদৃতা এই প্রতিবেদকের কাছে জানায়, ‘বাবা আমাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবে বলেছিল। কিন্তু এখনও বাবা তাকে ভর্তি করে দেয়নি।’ আল্পনা চৌধুরী চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘এ বছর আদৃতাকে হবিগঞ্জের মাধবপুরের একটি স্কুলের নার্সারিতে ভর্তি করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিদিনই আদৃতা বায়না ধরে তার বাবার সাথে স্কুলে যাবে। আমি কিছুতেই বোঝাতে পারি না যে, ওর বাবা আর নেই।’ শোক সভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিহত পুলিশ সদস্যের পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করে বলেন, নিহতদের প্রত্যেক পরিবার থেকে যোগ্যতা অনুযায়ী অন্তত একজনকে চাকরি দেয়া হবে।