রাজধানীতে সাম্প্রতিক সময় অস্ত্রের চাহিদা আগের যে কোন সময়ের তুলনায় বেড়েছে। সন্ত্রাসীরা এসব অস্ত্র সংগ্রহ করছে সীমান্ত এলাকার অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। এ কাজে জড়িত রয়েছে কম করে হলেও ২০টি চক্র। তারাই বিভিন্ন কৌশলে সীমান্ত এলাকা থেকে এসব অস্ত্র পৌঁছে দিচ্ছে রাজধানীতে। আর অস্ত্র বহন করতে ব্যবহার করা হচ্ছে তরুণীদেরও। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য জানিয়েছে গ্রেফতারকৃত এক তরুণীসহ ৭ অস্ত্র বা আর্মস ক্যারিয়ার।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অ্যান্টি কিডন্যাপিং স্কোয়াড সোমবার রাতে রাজধানীর ফার্মগেট ও সায়দাবাদ এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৫টি বিদেশি পিস্তল, ৫টি ম্যাগজিন, ২৮ রাউন্ড গুলি ও ৬ কেজি ২’শ গ্রাম বিস্ফোরকদ্রব্য। গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছে কাবিল, জিন্নুর রহমান ওরফে জিল্লুর, রাকিবুল হাসান ওরফে রকি, নিজামউদ্দিন, সাদ্দাম হোসেন, শরিফুল ইসলাম ওরফে আশরাফুল ইসলাম, মোসাম্মত্ খালেদা বেগম ওরফে রেবিনা ওরফে সীমা। ডিবি পুলিশ গতকাল মঙ্গলবার তাদের দুই মামলায় ৬ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি ডিবি (দক্ষিণ) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, গ্রেফতারকৃতরা অবৈধ অস্ত্র বহনকারী। তারা বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। অস্ত্র বহনকারী মোসাম্মত্ খালেদা বেগম ওরফে রেবিনা ওরফে সীমা এ প্রতিবেদককে বলে, তার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে। সেখানে একটি ক্লিনিকের কর্মচারী। এ ক্লিনিকে পরিচয় অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানী হায়াতের সঙ্গে। আর হায়াতের মাধ্যমেই সে অস্ত্রের ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করে। প্রতিটি অস্ত্র বহনের জন্য সে পেয়ে থাকে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটা অস্ত্রের চালান সে ঢাকায় পৌঁঁছে দিয়েছে। সীমা আরো বলে, যারা অস্ত্র বহন করে তাদের তারা ‘পাইলট’ হিসেবে অভিহিত করে। এটা তাদের সুবিধার জন্য সাংকেতিক নাম। তার মত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আর তিন তরুণী অস্ত্র বহনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে।
তার দুই বিয়ে হয়েছিল। দুই স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। দুই বছরের ছেলে রয়েছে। ক্লিনিকে কাজ করে যে টাকা পায় তা দিয়ে সংসার চালানো দুষ্কর। এ অবস্থায় অস্ত্র চোরাচালানী হায়াতই তাকে বেশি আয়ের পথ বাতলে দেয়। প্রতি মাসে ২/৩ বার চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসে। নির্ধারিত স্থানে অস্ত্র পৌঁছে দিয়ে ফিরে যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে। কার কাছে অস্ত্র বিক্রি করে সে ব্যাপারে তার কোন ধারণা নেই। ইতিপূর্বে পুলিশের হাতে তাকে ধরা পড়তে হয়নি। তবে কাজটি যে ভাল করেনি পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর সে বুঝতে পেড়েছে। অপর দিকে জানাজানি হলে ক্লিনিকের চাকরিটাও তার খোয়াতে হবে।
অ্যান্টি কিডন্যাপিং স্কোয়াড প্রধান এডিসি (ডিবি) ছানোয়ার হোসেন বলেন, সম্প্রতি বেশ কয়েকজন ‘ভুয়া ডিবি’কে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্য মতে, পুলিশ নিশ্চিত হয় সীমান্ত শহর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বেশ কয়েকটি চক্র রাজধানীতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে অস্ত্র সরবরাহ করছে। এরই সূত্র ধরে সোমবার ভোর রাতে ফার্মগেট এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় তাদের। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৩টি পিস্তল, ৫টি ম্যাগজিন ও ১৫ রাউন্ড গুলি। গ্রেফতারকৃতরা বাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে গাবতলীতে পৌঁছে সেখান থেকে আবার বাসে করে ফার্মগেট নামে। এসময় পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা স্বীকার করেছে, তাদের অস্ত্রের চালানটি কুমিল্লা যাবার কথা ছিল। ডিবির সহকারী কমিশনার মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ফার্মগেট থেকে গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্য মতে অভিযান চালানো হয় সায়েদাবাদে। এসময় গ্রেফতার করা হয় নিজাম উদ্দিন, সাদ্দাম হোসেন, মোঃ শরিফুল ইসলাম ওরফে আশরাফুল ইসলাম ও মোসাম্মত্ খালেদা বেগম ওরফে রেবিনা ওরফে সীমাকে। উদ্ধার করা হয় ২টি পিস্তল, ১৩ রাউন্ড গুলি, ৬ কেজি ২’শ গ্রাম বিস্ফোরক। এর মধ্যে একটি পিস্তল ছিল সীমার শরীরে স্কচটেপ দিয়ে আটকানো। অস্ত্রের এ চালানটি যাবার কথা ছিল মুন্সীগঞ্জে।
এডিসি ছানোয়ার বলেন, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে নিজামউদ্দিনের বাড়ি ঢাকায়। বাকীরা সবাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা। সীমান্ত থেকে ঢাকায় অস্ত্র আনতে তারা যাতে ধরা না পড়ে সে জন্য অস্ত্র ব্যবসায়ীরা কুমিল্লা ও মুন্সীগঞ্জের কয়েকটি স্থানে জমা করে। দরদাম ঠিক হবার পর সেখান থেকে সন্ত্রাসীরা অস্ত্র সংগ্রহ করে। অনেক সময় অস্ত্র ভাড়াও দেয়া হয়। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার ঢাকার এজেন্ট নিজামউদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন। সে মাদক ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত রয়েছে।
