শুধু বিশেষ দিনে একগাদা গান আর নাটক দেখিয়ে রবীন্দ্র অনুরাগ তৈরি সম্ভব নয়

আপডেট : ০৭ মে ২০১৪, ২০:০৭
এদেশের শীর্ষ রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী সাদী মহম্মদ দীর্ঘ ২ যুগ ধরে তার নিজের সংগঠন রবিরাগের হয়ে দর্শকদের মোহিত করছেন। আজ সারাদিন গানের মধ্যে দিয়ে কাটানোর সেই গল্পই বলেছেন বিনোদন প্রতিদিনের কাছে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন আরাফাত সৈকত রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে আজকের ব্যস্ততা প্রসঙ্গে একটু বলুন। সারাদিনই তো গাইব। তবে এই দিনটি আমাদের রবিরাগের জন্য বিশেষ দিন। কারণ আমাদের এই দিনটিকে ঘিরেই সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে। আমরা ছোট্ট পরিসরে শুরু করেছিলাম রবিরাগের আসর। আজ তা অগণিত সদস্যের ভেতরে ছড়িয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথের চর্চায় এ প্রজন্মের শিল্পীদের ভূমিকা নিয়ে কী বলবেন? তারা অনেকেই খুব ভালো করছে। যেহেতু অবারিত সুযোগ এখন মিডিয়ায়, তাই আমি মনে করি এখন বেছে বেছে ভালো কাজ করার একটা সময় এসেছে। জন্মজয়ন্তী বা এ ধরনের আসরে মিডিয়াগুলো দিনব্যাপী অনুষ্ঠান রাখে। এর ধারাবাহিকতা প্রতিদিন কেন থাকে না? এটা তো আমারও প্রশ্ন। আজকের দিনটি আমাদের উত্সবের। কিন্তু প্রতিদিনের সকালটা অন্তত রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে শুরু হতে পারে। যা চ্যানেল আই শুরু করেছে এরই ভেতরে। অন্য সকল চ্যানেলেরও শুরু করা উচিত বলে মনে করি। কম্পোজিশনের ক্ষেত্রে তরুণরা প্রতিনিয়ত নানারকম নিরীক্ষা করছে। এটাকে কোন চোখে দেখেন আপনি? আমি খুবই ইতিবাচক এইসব বিষয়ে। কারণ ওরা তবুও তো এই চর্চার ভেতরে আছে। তবে এর মানে এই নয় যে, বাণীটাকে ঢেকে মিউজিকটা সামনে আসবে। দুই বাংলার একটা তুলনা করা হয় সবসময়। ওপার-এপারের রবীন্দ্রচর্চার বিষয়টিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? আমি তো বাজি ধরে বলব, ওপার বাংলার চেয়ে আমরা অনেক রক্ষণশীলভাবে রবীন্দ্রনাথকে বয়ে বেড়াই। রক্ষণশীল বলছি ইতিবাচক অর্থে। ওপার বাংলার দুটি রবীন্দ্রগানের সংগঠনের নাম আপনিও বলতে পারবেন না। আমাদের এখানে কিন্তু অনেক রয়েছে। এখানেই আমাদের রবীন্দ্রচর্চায় জয়। রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানের গানগুলোর একটি সংকলন করেছেন আপনার সমকালীন শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। এই সংকলনে আপনার গানও রয়েছে। এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে কী বলবেন? দেখুন আমি শুধু নই। আমরা সকলেই গেয়েছি। বন্যা ডেকেছে তাই গেয়ে এসেছি। কিন্তু এত বড় একটা কাজ শুধু মাত্র বাণিজ্যটাকে ধরে রাখার জন্য তাড়াহুড়ো করে হয়েছে বলে মনে হয়েছে। অগণিত ভুল রয়েছে এতে। ভুলগুলো গায়কীতে, অনেকের শব্দচয়নে। অথচ এটা গীতিবিতানের অডিও ডিকশনারি হতে পারত। কিন্তু সেই সময়টা না দিয়েই অনেক অগোছালো করে কাজটি করা হয়েছে। এর গান শুনে কেউ গান তুললে তারা ভুল শিখবে। এটা আয়োজক বা স্পন্সরের দোষ নয়, তারা তো গান বোঝেন না। তারা যে লগ্নি বা রিলিজে উদ্যোগী হয়েছেন তাতেই তাদেরকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু যিনি পরিচালনায় ছিলেন তার উচিত ছিল আরও যত্নশীল হওয়া। রবীন্দ্রসংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় কতটা আগ্রহী হচ্ছে এ প্রজন্মের তরুণেরা? অনেক। তবে আমাদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রীদের বাবা-মায়ের উন্নাসিকতা আমাকে খুব হতাশ করে। তারা যেন মনেই করেন যে, আমার ছেলে যতটা পারে বাংলা থেকে, বাংলা গান থেকে দূরে থাকলেই বুঝি স্মার্ট। এটা পারিবারিকভাবে কাটানো দরকার। আমাদের শোবিজ অঙ্গনে নাটক, সিরিয়ালে বা চলচ্চিত্রে কতটা রবীন্দ্রচর্চা হচ্ছে বলে মনে করেন? হতাশাজনক। তবে অনেকেই ভালো করছেন। কিন্তু রবীন্দ্র চর্চা মানেই যে, রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প নিয়ে নাটক বানাতে হবে তা তো নয়। বিশেষ একটি দিনে একগাদা নাটক প্রচার করে কী লাভ? কে দেখবে এগুলো? বরং নিয়মিত সিরিয়ালে আমাদের জীবনের অনুষঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে আনতে হবে। আমাদের চলচ্চিত্রের নায়িকারা একাকী ঘরে আধা মিনিট রবীন্দ্র গান শুনতে পারে না। আমরা কি এই ধরনের দৃশ্য ছবিতে দেখাতে পারি না? তরুণদেরই এটা বদলাতে হবে। আমরা বাংলা সিনেমায় নায়িকাদের শুরুতেই দেখি ডিসকো নাচছে আর জিম করছে। আমার চারপাশের বাঙালি মেয়েরা তো এমন না। তবে আমরা কী দেখাচ্ছি। এগুলো ভাববার দরকার। শুধু বিশেষ দিনে অগণিত গান আর নাটক দেখিয়ে রবীন্দ্র অনুরাগ তৈরি সম্ভব নয়।