আজ পঁচিশে বৈশাখ

আপডেট : ০৭ মে ২০১৪, ২৩:১৩
হে নূতন, দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ। নিজের জন্মদিন পঁচিশে বৈশাখকে এভাবেই ডাক দিয়েছিলেন কবিগুরু। মহাকালের বিস্তীর্ণ পটভূমিতে এক ব্যতিক্রমী রবির কিরণে উজ্জ্বল এই পঁচিশে বৈশাখ। ১৮৬১ সালের এদিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোয় সাধক ও সামন্তপ্রভু জমিদার দেবেন্দ নাথ ঠাকুরের ঘর আলো করে জন্ম নিয়েছিলেন বাঙালির কবি, বাংলার কবি, কবিগুরু রবীন্দ নাথ ঠাকুর। আজ পঁচিশে বৈশাখ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৩তম জন্মদিন। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের বাংলা ২২ শ্রাবণ মৃত্যুবরণ করলেও বাংলা ভাষার প্রধান কবি হয়ে বাঙালির হূদয়ে চির আসন করে নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় ও দার্শনিক চেতনা ছিল—শুধু নিজের শান্তি বা নিজের আত্মার মুক্তির জন্য ধর্ম নয়। মানুষের কল্যাণের জন্য যে সাধনা তাই ছিল তার ধর্ম। তার দর্শন ছিল মানুষের মুক্তির দর্শন। বিশ্বাস করতেন বিশ্বমানবতায়। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির মন-মানসিকতা গঠনে, চেতনার উন্মেষে অন্যতম প্রধান অবলম্বন। বাঙালির ঐতিহ্যলালিত দর্শন ও সাহিত্য, তাঁর রচনার মধ্য দিয়ে বিশ্বসাহিত্য সভায় পরিচিতি পায়। ১৯১৩ সালে প্রথম বাঙালি এবং এশীয় হিসাবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ কবির জন্মবার্ষিকীর দিবসটি পালন করবে হূদয় উত্সারিত আবেগ ও শ্রদ্ধায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুমুখী সৃজনশীলতা বাংলা সাহিত্য ও শিল্পের প্রায় সবকটি শাখাকে স্পর্শ করেছে, সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর হাতেই বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক ছোটগল্পের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলা উপন্যাসকে তিনি আধুনিক ও সার্থক উপন্যাসে তুলে এনেছেন। শুধু সৃজনশীল সাহিত্য রচনায় নয়, অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র নিয়ে তাঁর ভাবনাও তাঁকে অত্যন্ত উঁচু স্থানে নিয়ে গেছে। তাঁর লেখা গান বাঙালির হূদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। বাংলাদেশের মানুষের কাছে রবীন্দ নাথ প্রেরণাদায়ী পুরুষ। রবীন্দ নাথের কবিতা, গান মানুষদের দেখায় পথের দিশা। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতার বাণী রবীন্দ জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ বলেন, রবীন্দ নাথ জীবন, মানবাত্মা এবং প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্যের নান্দনিক কবি। মৃত্যুকে তিনি দেখেছেন মহাজীবনের যতি হিসাবে। জীবন-মৃত্যু ও জগত্-সংসার তাঁর কাছে প্রতিভাত হয় এক ও অখণ্ডরূপে। রবীন্দ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কবিগুরুর জন্মদিনের সূচনালগ্নে শান্তিময় পৃথিবী গড়াই হোক আমাদের প্রত্যয়। বিশ্বব্যাপী দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও বৈষম্যের বিলোপ সাধন এবং ধর্ম-বর্ণ-ভাষার বৈচিত্র্য সমুন্নত রাখতে রবীন্দবশ্বকবির ব্যঞ্জনাময় উপস্থিতি শোষণ, বঞ্চনা, সামপ্রদায়িকতা ও অমানবিকতা প্রতিরোধে বাঙালির অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখবে। বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ বলেন, বিশ্বকবির জন্মদিন উদ্যাপন বাঙালির আত্মপরিচয়ে দীপ্ত হওয়া ও আগামীর পথচলার অনুপ্রেরণা সৃষ্টির এক অপরিমেয় উত্স। জাতি তাই গভীর শ্রদ্ধা, উত্সাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে পালন করবে প্রিয় কবির জন্মদিন। দেশব্যাপী কর্মসূচি জাতীয় পর্যায়ে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। ঢাকাসহ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দিবসটি যথাযোগ্যভাবে উদযাপন করা হবে। কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, নওগাঁর পতিসর, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও খুলনার দক্ষিণডিহিতে স্থানীয় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় যথাযোগ্য মর্যাদায় তাঁর ১৫৩তম জন্মদিন উদযাপন করা হবে। এ উপলক্ষে রবীন্দ মেলা, রবীন্দ বিষয়ক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে স্থানীয় প্রশাসন। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহ এ উপলক্ষে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনও বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এবার বিশ্বকবি রবীন্দ নাথ ঠাকুরের ১৫৩তম জন্মদিন উদ্যাপনের থিম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ ও রবীন্দ নাথ’। প্রতিবারের মতো এ বছরও জন্মবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠান হবে ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে। সকাল ১১টায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে। প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন। স্বাগত ভাষণ দেবেন সংস্কৃতি সচিব ড. রণজিত্ কুমার বিশ্বাস। রবীন্দ স্মারক বক্তৃতা দেবেন অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। শিল্পকলা একাডেমি সন্ধ্যা ৭টায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার প্রধান মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে শিল্পকলা একাডেমি। সাংস্কৃতিক পর্ব ছাড়াও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে শিল্পকলা একাডেমিতে তিনদিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কবির চিত্রশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও যথাযোগ্য মার্যাদায় কবির জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন করবে। ছায়ানট ছায়ানট ভবনে আজ বৃহস্পতিবার থেকে দুইদিনব্যাপী রবীন্দ উত্সবের আয়োজন করেছে ছায়ানট। সম্মেলক ও একক গান ছাড়াও থাকছে নৃত্য, পাঠ ও আবৃত্তি। উত্সবে অংশ নেবেন ঢাকাসহ দেশের নানা অঞ্চলের প্রবীণ-নবীন এবং প্রতিশ্রুতিমান শিল্পীরা। আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় উদীচী কেন্দ ীয় কার্যালয়ে আয়োজন করা হয়েছে আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কেন্দচ্যানেল আই রবীন্দ মেলা তেজগাঁওয়ে নিজস্ব কার্যালয়ে সকাল ১১-৫ মিনিটে শুরু হবে মেলার আনুষ্ঠানিকতা। অস্থায়ী মঞ্চ থেকে দিনব্যাপী পরিবেশিত হবে প্রবীণ-নবীন শিল্পীদের পরিবেশনায় রবীন্দ সঙ্গীত, রবীন্দ নৃত্যনাট্য, শিশুনৃত্য ইত্যাদি। সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে সন্ধ্যা ছয়টায় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও অন্যান্য অনুষ্ঠানমালা বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি চ্যানেলসমূহ ব্যাপকভাবে সম্প্রচার করবে।