ওই রবীন্দ্রনাথ আসে

আপডেট : ০৮ মে ২০১৪, ১৯:০৭
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবিতাবস্থায় তাঁর শেষ জন্মদিন উপলক্ষে রচিত ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধের শেষে একটি কবিতা সংযোজিত আছে : ‘ওই মহামানব আসে’। কবিতাটি গান হিসেবে আজ আমাদের সবার কাছে অতি প্রিয়। সেখানে বলা হয়েছে : মহামানব আসছেন; পৃথিবীর প্রতিটি কণায় রোমাঞ্চের শিহরণ; স্বর্গভূমি থেকে মর্ত্যভূমি সর্বত্র তাঁর আগমনধ্বনি; ঘন অন্ধকার ভেদ করে পর্বতশৃঙ্গে নবপ্রভাতের হাতছানি; মহাকাশও ঘোষণা করে এই মানুষেরই জয়বার্তা। কিন্তু প্রশ্ন আসে, কে এই ‘মানুষ’, যাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন: ‘মহামানব’? অসুস্থ থাকায় রবীন্দ্রনাথ নিজহাতে লেখেননি গানটি, মৈত্রেয়ী দেবীকে ‘ডিকটেট’ করেছিলেন। লেখা শেষ হলে গানের সুরও হলো। মৈত্রেয়ী দেবী তাঁর ‘স্বর্গের কাছাকাছি’ গ্রন্থে লিখেছেন : ‘শান্তিদেবকে ডেকে আনা হল সন্ধ্যায়। তারপর তাঁর সঙ্গে গলা রেখে সুর সংযোজনা করলেন [রবীন্দ্রনাথ]। শরীরের ঐ অবস্থায় কী রকম অনায়াসে এই সুর সৃষ্টি হল দেখে মুগ্ধ হলাম। গানটান শিখিয়ে তারপর [রবীন্দ্রনাথ] বলছেন, আমার জন্মদিনের উত্সবে গানটা গাওয়া হবে, তারপর এই বোকার দেশে সকলে বলবে না তো যে নিজেকেই মহামানব বলেছে।’ রবীন্দ্রনাথ বাংলা দেশকে ‘বোকার দেশ’ বলেছিলেন আদরার্থে, যে অর্থে মা প্রিয় সন্তানকে ‘বোকা’ বলেন। তিনি এ-ও জানতেন, বাঙালিরা তাঁকে এত ভালোবাসে, যে ভালোবাসার পরিধিতে তাঁকে ‘মহামানব’ হিসেবে গ্রহণ করতে বাঙালির এতটুকু বাধবে না। কিন্তু তিনি নিজেকে ‘মহামানব’ বলতে চান না। তাহলে রবীন্দ্রনাথ কাকে বলেছিলেন ‘মহামানব’, কার সন্ধানে ছিলেন তিনি? ছেলেবেলা থেকে ঔপনিষদিক শিক্ষা-পরিবেশে বড় হয়েছিলেন বলে রবীন্দ্রচেতনায় বিশেষ এক সত্তার অধিষ্ঠান ছিল। তিনি তাঁর লেখায় সেই পরম সত্তার কথা উল্লেখ করেছেন এভাবে : ‘উনি এর পরম গতি, উনি এর পরম সম্পদ, উনি এর পরম আশ্রয়, উনি এর পরম আনন্দ। অর্থাত্ এর পরিপূর্ণতা তাঁর মধ্যে। উত্কর্ষের পথে এ চলেছে সেই বৃহতের দিকে, এর ঐশ্বর্য সেইখানেই, এর প্রতিষ্ঠা তাঁর মধ্যেই, এর শাশ্বত আনন্দের ধন যা-কিছু সে তাঁতেই।’ এই পরম সত্তার আয়োজন তিনি করেছেন জীবন জুড়ে। তিনি মনে করতেন পার্থিব কর্মের মধ্যেই জীবন সীমিত নয়, জীবন পরিব্যাপ্ত অপার্থিব জগতেও। তাঁর কাছে জীবন এমন এক চক্র, যার শেষ নেই, সূচনা আছে মাত্র। তাই জীবন শুধুই যাপন নয়, জীবনকে উদ্যাপন করতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তবে তাঁর এ জীবন শুধুই ভোগের নয়, জমিদারির স্থূলতায় জীর্ণও নয়। বলা চলে, জীবনকে শুধু শিশ্নোদরপূর্তির মধ্যে সীমায়িত না-করে রাখাই রবীন্দ্র জীবনজিজ্ঞাসার মূল। অরবিন্দ পোদ্দারের মতো কট্টর বস্তুবাদীরা অবশ্য রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর অব্যবহিত পরই অভিযোগ করেন : ‘তিনি [রবীন্দ্রনাথ] বস্তুগত দিক থেকে মানুষের জীবনকে পরিবর্তিত করার, মানবতন্ত্রের সার্থকতার পথের বাধাবিঘ্ন অপসারিত করার কথা চিন্তা করতে পারেন নি।’ কট্টর বস্তুবাদীরা শিল্পস্রষ্টা লেখক এবং কর্মীকে একভাবে বিবেচনা করেন। তারা মনে করেন, কর্মীর মতো কবিও কবিতায় আদর্শের ঝাণ্ডা ওড়াবেন, লেখক লেখনীতে তুলবেন মতবাদী পতাকা। কথিত আদর্শ ও মতবাদের জগদ্দল পাথরের নিচে পিষ্ট করে এভাবে অনেক সম্ভাবনাময় লেখককে ধ্বংস করেছে বস্তুবাদীরা। সম্ভাবনাময় কবিরা কর্মীর মতো ঝাণ্ডা ওড়াতে গিয়ে বৈদ্যুতিক তারে স্থবির হয়ে আটকে গেছেন। বস্তুবাদীরা বুঝতে পারেনি যে, আপাত স্থির ও শান্ত বৈদ্যুতিক তারের মধ্যেই আছে অগ্নির তরঙ্গ। স্রষ্টার অন্তরস্থিত প্রজ্জ্বলন সম্ভাবনা এর চেয়েও বেশি। প্রশ্ন জাগে, এই সমালোচকগণ কি লক্ষ করেননি রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবন! কলকাতার স্থায়ী আবাসিক ভবনে তো বটেই, বাংলাদেশের শিলাইদহ, সাহাজাদপুর, পতিসর ইত্যাদি স্থানের অস্থায়ী বাসভবনে রবীন্দ্রনাথ ব্যবহূত আসবাবপত্রসমূহ নিরীক্ষা করলে বোঝা যায় : রবীন্দ্রনাথ জানতেন কী করে জীবন উদ্যাপন করতে হয়। সে-সময়ই প্রয়োজনীয় ও সৌখিন সব ধরনের বিদেশি আসবাবে সুসজ্জিত ছিল তাঁর ঘর। শান্তিনিকেতনের জাদুঘরে রক্ষিত রবীন্দ্রনাথের ব্যবহূত নানা ধরনের বিদেশি লেখনী বা কালি অথবা তাঁর চশমার সৌখিন ফ্রেমসকল দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বস্তুগত দিক থেকে জীবনের পরিবর্তন তিনি স্বীকার করেন। যাদের জীবনে বস্তুগত উপায় সীমিত তার জন্য ক্ষোভ ছিল তাঁর। কিন্তু তা নিয়ে মিছিল তিনি করেননি, এটা সত্য। রবীন্দ্রমানসে মিছিলের ধারণা ছিল না, ছিল নিবেদনের ধারণা। ওই যে গীতাঞ্জলির প্রথম গান, যেখানে আছে : ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার ’পরে’। এই ধারণাই রবীন্দ্রনাথকে মহান করেছে, বড় করেছে। এটা আত্মনিবেদন নয়, স্ব-সত্তায় আত্মজাগরণ; এটা আত্মবিলোপ নয়, আপনার মধ্যে অন্যের দীনতা দ্রবীকরণের শক্তি। অন্যের মত অগ্রাহ্য করে নিজের মত চাপিয়ে দেওয়া যদি আধিপত্যবাদ হয়, সংখ্যাধিক্যের জোড়ে অপরের ন্যায়সঙ্গত বোধের অপমৃত্যু ঘটানোও যদি গণতন্ত্র হয়, সে আধিপত্যবাদ বা গণতন্ত্র কোনোটাই নেই রবীন্দ্রনাথে। রবীন্দ্রনাথে আছে সংবেদনশীল জ্ঞানচর্চা ও মানবসত্যের আলোকে জগত্ দেখার প্রত্যয়। ‘সংবেদনশীল জ্ঞানচর্চা’ ও ‘মানবসত্যের আলোকে জগত্ দেখা’—এ প্রতীতিদ্বয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। সংবেদনশীল জ্ঞানচর্চায় মনুষ্যত্বই মুখ্য, তার বাহ্যিক পরিচয় নয়। আর এখানেই উঠে আসে মানবসত্য। মানুষ ধর্মের নামে বিভক্ত। শুধু বিভক্তই নয়, হানাহানিতে লিপ্ত। কিন্তু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মবাণী হলো : মানুষ অমৃতের সন্তান। বলা হয়নি, শুধু হিন্দুরাই অমৃতের সন্তান। মুসলিমদের ধর্মকথায় আছে : মানুষ হলো আশরাফুল মাকলুকাত্। বলা হয়নি, শুধুই মুসলমানরা আশরাফুল মাকলুকাত্। তাহলে সমস্যা কোথায়? রবীন্দ্রনাথ এই বাহ্যজগতে খুঁজে পেয়েছেন সমস্যা। তাই প্রচলিত ধর্মাচারের সময় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ধর্মের শাশ্বত বাণীতে হারাননি আস্থা। রবীন্দ্রনাথের ‘ধর্মমোহ’ নামে একটি কবিতা আছে। সমাজের ধার্মিকদের অধার্মিকের মতো আচরণ দেখে সেখানে তিনি সংক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেছেন। কবিতায় তিনি লিখেছেন : ‘নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর, ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর।’ কেন নাস্তিক বিধাতার বর পায়? রবীন্দ্রনাথ বলেছেন : তারা শাস্ত্র মানে না, মানে মানুষের ভালো—কারণ এটাই। অর্থাত্ তাঁর কাছে মনুষ্যত্বের বিকাশটাই মুখ্য, পাশবিকতা নয়। পশুর থাকে গায়ের জোড়, তাদের মাথা থাকলেও মস্তিষ্ক থাকে না। মানুষ কেন শুধু গায়ের জোড়ে জগত্ মাতাতে চায়! এটা বোধগম্য ছিল না রবীন্দ্রনাথের কাছে। রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্যের গণতন্ত্র সেখানে গিয়েই দেখেছেন। পাশ্চাত্যে যাকে বলে ‘সিভিলাইজেশন’ তার সঙ্গে ভারতীয় ‘সদাচার’-এর মিল থাকলেও প্রথার সীমায় যেখানে সদাচার আবদ্ধ, চিন্তার মুক্ততার কারণে সেখানে সিভিলাইজেশন রবীন্দ্রনাথের কাছে গ্রহণীয় ছিল। কিন্তু সেই সিভিলাইজড গণতন্ত্রীরাই ভারতকে পরাধীন করে রাখে। ইংরেজদের এই দ্বৈতনীতি দেখে পাশ্চাত্য গণতন্ত্র ও সিভিলাইজেশন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের আস্থা শূন্যে পৌঁছেছিল। রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছেন এবং তাঁর জীবন সায়াহ্নে লিখেছেন : ‘এই দেশ ইংরেজকে দীর্ঘকাল ধরে তার ঐশ্বর্য জুগিয়ে এসেছে। যখন সভ্যজগতের মহিমাধ্যানে একান্তমনে নিবিষ্ট ছিলেম তখন কোনোদিন সভ্যনামধারী মানব আদর্শের এতবড়ো নিষ্ঠুর বিকৃত রূপ কল্পনা করতেই পারি নি; অবশেষে দেখছি, একদিন এই বিকারের ভিতর দিয়ে বহুকোটি জনসাধারণের প্রতি সভ্যজাতির অপরিসীম অবজ্ঞাপূর্ণ ঔদাসীন্য।’ রবীন্দ্রনাথ ব্যবহূত ‘সভ্যজাতি’ শব্দবন্ধটি জিজ্ঞাসায় পরিপূর্ণ। যে জাতি আর জাতিকে ঔপনিবেশিকতায় নিষ্পেষণ করে তার গণতন্ত্রই কী আর সভ্যতাই কী! তিনি আশা করেছেন, ‘ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে।’ গুরুত্ব দিই ‘পূর্বাচল’ শব্দটির ওপর। অর্থাত্ রবীন্দ্রনাথের আশা, আলোর দেখা মিলবে প্রাচ্যদেশ থেকেই। তিনি কোনো মহামানবের আবির্ভাবের প্রত্যাশায় আরো লিখেছেন : ‘আজ আশা করে আছি, পরিত্রাণকর্তার জন্মদিন আসছে আমাদের এই দারিদ্র্যলাঞ্ছিত কুটীরের মধ্যে; অপেক্ষা করে থাকব, সভ্যতার দৈববাণী সে নিয়ে আসবে, মানুষের চরম আশ্বাসের কথা মানুষকে শোনাবে এই পূর্বদিগন্ত থেকেই।’ এখানেও গুরুত্বপূর্ণ শব্দবন্ধ ‘পূর্বদিগন্ত’। প্রকৃতপক্ষেই পরিত্রাণ প্রয়োজন ছিল : পরিত্রাণ রাজনৈতিক; পরিত্রাণ মনোজাগতিক। রবীন্দ্রনাথ আমাদের মনোজাগতিক পরিত্রাণের সারথি। তিনিই পূর্বদিগন্ত থেকে আবির্ভূত, তিনি আলোকস্রষ্টা মহামানব। নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথই সেই মহামানব। প্রবন্ধের সূচনাতে মৈত্রেয়ী দেবীকে উল্লেখকৃত রবীন্দ্রবচন যদি স্মরণ করি, তাহলে বলতেই হয়, রবীন্দ্রনাথ ঠিক বুঝেছিলেন, তিনিই বাঙালির মহামানব। কারণ, সময়কে ধারণ করে তিনি সময়োত্তীর্ণ; কর্মকে অবলম্বন করে তিনি কর্মবীর; চিন্তাকে সৃজন করে তিনি ভবিষ্যতের অগ্রদূত। যুগকে নির্মাণ করেন যিনি তিনিই যুগমানব; মহান মানব যিনি তিনিই মহামানব—ব্যাকরণভাষ্য যদি এটা হয় তবে রবীন্দ্রনাথই ‘যুগমানব’, তিনি ‘মহামানব’; নিজে চান বা না-চান। রবীন্দ্রভাষ্যের ‘ওই মহামানব আসে...’, বাঙালির বিশ্বাসে তাই হয়ে ওঠে ‘ওই রবীন্দ্রনাথ আসে...’।