গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ও কানজান

আপডেট : ০৮ মে ২০১৪, ১৯:০৮
ভাষান্তর :প্রবীর বিকাশ সরকার রবীন্দ্রনাথ এবং জাপান একটি অনাবিষ্কৃত ইতিহাস। এই ইতিহাস শতবর্ষপ্রাচীন। কবির সঙ্গে অনেক বিশিষ্ট জাপানির ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। তেমনি একজন ছিলেন জাপানের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী কানজান শিমোমুরা (১৮৭৩-১৯৩০)। রবীন্দ্রনাথ ১৯১৬ সালে জাপান ভ্রমণের সময় জাপানখ্যাত য়োকোহামা বন্দরনগরীর সানকেইএন বাগানবাড়িতে অবস্থানকালে উক্ত বাগানবাড়ির কর্ণধার ধনাঢ্য সিল্ক ব্যবসায়ী এবং তত্কালীন জাপানে শিল্পকলার প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক হারা তোমিতারোও-এর (১৮৬৯-১৯৩৯) পারিবারিক সংগ্রহশালায় বিখ্যাত শিল্পীদের চিত্রকর্ম দেখে অভিভূত হন। তার মধ্যে কানজান শিমোমুরার চিত্রকর্মও ছিল। একাধিক চিত্রকর্মের মধ্যে কানজান অঙ্কিত ‘য়োরোবোশি’ বা ‘অন্ধ ভিক্ষু’ চিত্রটি তাঁকে খুব মুগ্ধ করে, তিনি এটি শান্তিনিকেতনে নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। যা এখনো শান্তিনিকেতনে বিদ্যমান। সেই ঘটনা সম্পর্কে শিল্পী কানজান শিমোমুরার পুত্র কানজান হিদেতোকি ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে প্রকাশিত বুলেটিন ‘সাচিয়া’ বা ‘সত্য’র ৬ষ্ঠ সংখ্যায় একটি নিবন্ধ লিখেন ‘তাগো-রু অকিনা তো কানজান’ তথা ‘গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ এবং কানজান’ নামে। তারই ভাষান্তর এখানে তুলে ধরা হলো। গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর য়োকোহামা হোনমাকি ওয়াদায়ামাস্থ আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন ১৯১৬ সালের আগস্ট মাসে বলে মনে হয়। সেই সময় স্যার হারা তোমিতারোওর সানকেইএন বাগানবাড়ি থেকে কবির সঙ্গী ভারতীয় কিশোর চিত্রশিল্পী মুকুলচন্দ্র দে এবং তাঁদের দোভাষী ইয়াশিরোও ইউকিও (১৮৯০-১৯৭৫) একসঙ্গে এসেছিলেন। আমার স্বর্গীয় পিতা কানজান শিমোমুরাসহ আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্য এই প্রথম অন্তর থেকে আনন্দের সঙ্গে অতিথিবরণ করার সময় বিস্ময়ের সঙ্গে শুধুই সকলের বুক ধুকধুক করছিল, পরে অবশ্য ব্যাপারটি নিয়ে হাসিতামাশা হয়। য়োকোহামার সুবিখ্যাত সানকেইএন বাগানবাড়ির অতিথি হওয়ার পূর্বে গুরুদেব তাঁর বন্ধু টোকিওর উয়েনো শহরে অবস্থিত ইকেনোহাতাস্থ চিত্রশিল্পী য়োকোয়ামা তাইকান-এর (১৮৬৮-১৯৫৮) বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। তাইকান সানকেইএন-এর কর্ণধার হারা তোমিতারোওকে অনুরোধ করেন কবি যাতে শান্তস্থির হয়ে তাঁর বাগানবাড়িতে অবস্থান করে লেখালেখি করতে পারেন। হারা তোমিতারোও তাঁকে বাগানবাড়ির মধ্যে অবস্থিত ‘শোওফুওকাকু’ নামক সবুজশান্ত বিশ্রামালয়ে স্বাগত জানান। গুরুদেবও জায়গাটি দেখে একেবারে পছন্দ করে ফেলেন, এখানেই তিনি প্রায় তিন মাস অবস্থানকালে কাব্যচর্চা ও অন্যান্য কাজ করেন। তাইকান যখন ১৯০৩ সালে ওকাকুরা তেনশিন-এর (১৮৬৩-১৯১৩) পরামর্শে চিত্রশিল্পী হিশিদা শুনসোও-এর (১৮৭৪-১৯১১) সঙ্গে ভারতে যান তখন থেকেই তাঁরা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ও পরিচিত, কিন্তু কানজানের জন্য এটা ছিল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাত্ তাই তাঁর মধ্যে জড়তা বিরাজ করছিল। তবে গুরুদেবের সঙ্গে সাক্ষাত্ মাত্রই তিনি এমন আচরণ করেন যেন কানজানকে বহু আগে থেকেই তিনি চেনেন, গুরু-শিষ্যের মতো নিবিড় ঘনিষ্ঠতা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় প্রকাশ পায়। তারপর গুরুদেব কানজানের স্টুডিও পরিদর্শন করেন, তখন দুরূহ কাজে ব্যস্ত ছিলেন কানজান তথাপি জাপান চারুকলা ইন্সটিটিউটের পুনঃসংস্কার উপলক্ষে তৃতীয় চিত্রকলা প্রদর্শনীতে তাঁর প্রদর্শিতব্য শিল্পকর্ম ‘হারু সামে’ বা ‘বাসন্তী বৃষ্টি’র অঙ্কনকর্ম দেখান। এখানে রবীন্দ্রনাথ পুনরায় জাপানি চিত্রকলার কলাকৌশল যা ভারতে দেখা যায় না—এমন বিশেষ পদ্ধতিসমূহ পর্যবেক্ষণ করে আন্তরিকভাবে অভিভূত হন। সঙ্গী চিত্রশিল্পী মুকুল দের জন্যও ছিল এটা আরও একটি সুযোগ। এর আগে গুরুদেব হারা তোমিতারোওর সানকেইএন বাগানবাড়িতে কানজান শিমোমুরার বিশাল মাপের চিত্রকর্ম আগ্রহসহকারে উপভোগ করেন। সেটা ছিল এর আগের বছর (১৯১৫) জাপান চারুকলা ইন্সটিটিউটের পুনঃসংস্কার উপলক্ষে আয়োজিত দ্বিতীয় চিত্রকলা প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত ‘য়োরোবোশি’ বা ‘অন্ধ ভিক্ষু’ নামক একটি চিত্রকর্ম। গুরুদেব এই চিত্রকর্মটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে হারা তোমিতারোওর কাছে জানতে পারেন যে, এটা হচ্ছে বৌদ্ধধর্মীয় একটি উপাসনা ‘নিসেসাওকান’কে ভিত্তি করে অঙ্কিত, চিত্রে সেই দৃশ্যই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‘নিসসোওকান’ হচ্ছে : সূর্যাস্তের দিকে মুখ করে ধ্যানের মাধ্যমে পশ্চিম দিকে অবস্থিত পবিত্র স্বর্গভূমিকে কল্পনা করা। তবে তার চেয়ে বড় কথা যে এটা জাপানি চিত্রকলার আধুনিকতা—যা ভারতে রবীন্দ্রনাথ ওকাকুরা তেনশিনের কাছ থেকে বারংবার শুনেছেন। শিল্পাচার্য তেনশিন প্রতিষ্ঠিত নিহোন বিজুত্সুইন তথা জাপান চারুকলা ইন্সটিটিউটের কতিপয় অগ্রসরমাণ তরুণ শিক্ষার্থীর ঐতিহ্যবাহী পুরোনো রীতিনীতি, পদ্ধতিকে ছাড়িয়ে আধুনিক বিনির্মাণের আন্দোলনের বর্ণনাই গুরুদেবকে বিশেষভাবে কৌতূহলী করে তুলেছিল জাপানি চিত্রকলার প্রতি। ‘বলতে গেলে বলতে হয়, রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগতভাবে সত্যিকার অর্থে শিল্পকলাকে যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের কেউ ছিলেন না তবে এশিয়ার প্রাচীন সভ্যতাভুক্ত সংস্কৃতি ও শিল্পকলার ধারক একটি দেশ ভারতের একজন নাগরিক হিসেবে তিনি স্বীকার করেন যে, বর্তমান প্রাচ্যদেশগুলোর মধ্যে জাপান শিল্পকলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উন্নতি সাধনকৃত দেশ। বিশেষ করে প্রাচ্যধারার মধ্যে থেকে শৈল্পিকভাবে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে তার যে অক্লান্ত প্রচেষ্টা সেটা শক্তিশালী দেশের পক্ষেই সম্ভব। এহেন জাপানি শিল্পকলার প্রতি রবীন্দ্রনাথের চেতনাবোধ এবং পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে জাপানের প্রাচীন ভাববন্ধন সম্পর্কে তাঁর চিন্তা-ভাবনা কলকাতায় ওকাকুরা তেনশিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে—বিশেষ করে ওকাকুরার দুজন প্রধান শিষ্য য়োকোয়ামা তাইকান ও হিশিদা শুনসোওকে ভারতে প্রদত্ত আতিথেয়তা ও তাঁদের সঙ্গে সৃষ্ট ভাববিনিময় থেকেই জন্ম নিয়েছে। তাছাড়া হারা পরিবারের সংগ্রহশালায় শিল্পকলার বিশাল সংগ্রহ দেখে এবং হারা তোমিতারোওর প্রাচ্যাদর্শ সম্পর্কিত চিন্তা-চেতনার কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ নিজের ধারণা ও বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করেন। এর ফলে তিনি হারা সংগ্রহশালার আধুনিক জাপানি চিত্রকর্ম থেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় একটি নির্বাচন করে তার নকলচিত্র নিয়ে শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে স্থাপন করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। তাঁর এই অনুরোধ হারা মহাশয় মারফত আমার কাছেও আসে। তখন সম্ভবত মেইজি যুগের (১৮৬৮-১৯১২) পর নতুন জাপানি চিত্রকর্ম হিসেবে কানজানের এই বিশাল মাপের ‘য়োরোবোশি’ চিত্রকর্মটি নির্বাচন করে রবীন্দ্রনাথ সেটাকে কপি করার জন্য আরাই কাম্পোকে (১৮৭৮-১৯৪৫) অনুরোধ জানান। চিত্রশিল্পী আরাই হারা পরিবারে অবস্থান করে কয়েক মাস লাগিয়ে সুচারুরূপে চিত্রকর্মের কাজটি সুসম্পাদন করেন। তারপর ভারতে পাঠানো হয়।’ উপরোক্ত বর্ণনা পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের তখনকার দোভাষী ইয়াশিরো ইউকিও লিখিত তাঁর ‘গেইজুত্সু নো পাতোরন’ তথা ‘শিল্পকলার পৃষ্টপোষক’ গ্রন্থে। এই চিত্রকর্মটি এখনো পশ্চিমবঙ্গে রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের কলাভবনে সংরক্ষিত আছে বলে আগের বছর ওকাকুরা তেনশিনের পুত্র ওকাকুরা কোশিরোও কর্তৃক জেনে খুবই প্রীত হই। গুরুদেব জাপানে অবস্থানকালে কানজান শিমোমুরার আবেদনে সাড়া দিয়ে স্মারক হিসেবে সংস্কৃত ভাষায় একটি স্তবক তুলি দিয়ে লিখে দিয়েছিলেন। সংস্কৃত ভাষার নিচে ইংরেজিও ছিল, সেটি নিম্নরূপ : Lead me from unreal to real, from dark to light, from death to deathlessness. এটা সত্যিই ‘য়োরোবোশি’ চিত্র সম্পর্কে যথার্থ গুরুত্ববহ একটি বাণী বলে আমার বিশ্বাস।