শাহজাদপুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় জায়গাগুলোর একটি। ছিন্নপত্রাবলীর ১৪৯ নম্বর চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘এখানে (সাজাদপুরে) যেমন আমার মনে লেখবার ভাব এবং লেখবার ইচ্ছা আসে এমন আর কোথাও না।’ এই চিঠিতেই তিনি আরো লিখেছিলেন, ‘আমার এই সাজাদপুরের দুপুর বেলা গল্পের দুপুর বেলা— মনে আছে ঠিক এই সময়ে এই টেবিলে বসে আপনার মনে ভোর হয়ে পোস্ট্মাস্টার গল্পটা লিখেছিলুম। আমিও লিখছিলুম এবং আমার চার দিকের আলো এবং বাতাস এবং তরুশাখার কম্পন তাদের ভাষা যোগ করে দিচ্ছিল। এই রকম চতুর্দিকের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিশে গিয়ে নিজের মনের মতো একটা-কিছু রচনা করে যাওয়ার যে সুখ তেমন সুখ জগতে খুব অল্পই আছে।’ শাহজাদপুর সম্পর্কে ১৫০ নম্বর চিঠিতে তিনি আরো লিখেছিলেন, ‘... আমি এর মোহ থেকে কিছুতেই আপনাকে ছাড়াতে পারি নে। এই আলো, এই বাতাস, এই স্তব্ধতা আমার রোমকূপের মধ্যে প্রবেশ করে আমার রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে— এ আমার প্রতিদিনকার নতুন নেশা, এর ব্যাকুলতা আমি নিঃশেষ করে বলে উঠতে পারি নে।’ —অর্থাত্ শাহজাদপুর রবীন্দ্রনাথের প্রাণের জায়গা। ওপরের উদ্ধৃতির মাধ্যমে বোঝা যায় যে, শাহজাদপুরের আলো-বাতাস-গাছ-পাখি-ঘাস-প্রতিধূলিকণা রবীন্দ্রনাথ অন্তর দিয়ে গ্রহণ করেছিলেন, তাই এরা সবাই মিলে রবীন্দ্রনাথকে ভাষা জুগিয়েছে অর্থাত্ এই পরিবেশ তাঁকে নতুন পথের সন্ধান দিয়েছে। তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এখানে না এলে রবীন্দ্রনাথের মানসগঠন অপূর্ণ থেকে যেত। এখানে রবীন্দ্রনাথের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্যিই যুক্তিযুক্ত।
বাংলাদেশে একটি রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রবীন্দ্র-অনুরাগী প্রতিটি মানুষের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা। ২৭ জানুয়ারি ২০১১ তারিখে বাংলাদেশ সরকারের আন্তঃমন্ত্রণালয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, সিরাজগঞ্জ জেলার রবীন্দ্রস্মৃতি বিজড়িত শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে।
এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে বাঙালি জাতি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি আমাদের কিছুটা হলেও দায়মুক্তি ঘটবে। বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবির নামে আমাদের দেশে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় না থাকার দীনতা থেকেও আমরা মুক্তি পাবো। এছাড়া উত্তরবঙ্গে শিক্ষার পরিবেশ হবে সম্প্রসারিত। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ সিদ্ধান্তের আলোকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) প্রফেসর ড. এ কে আজাদ চৌধুরীর নেতৃত্বে কমিশনের অন্য দুজন সদস্যসহ মোট পাঁচ সদস্যের একটি দল সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্রকাছারিবাড়িসহ রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য স্থানসমূহ পরিদর্শন করেন। এই স্থানগুলো হলো—শাহজাদপুরের পোতাজিয়া ইউনিয়নের বাথান ল্যান্ড হিসেবে পরিচিত বুড়ি পোতাজিয়ার মৌজার রামকান্তপুর, পৌর সদরের দ্বারিয়াপুর মৌজার বিসিক বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন স্থান ও নরিনা ইউনিয়নের টেটিয়ারকান্দা সংলাগ্ন স্থান। সদস্যবৃন্দ বিশ্ববিদ্যালয় শুরু করার জন্য প্রাথমিক অবকাঠামোর দিকটিও পর্যবেক্ষণ করেন। প্রাথমিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শুরু করার জন্য শাহজাদপুরে কিছু স্থাপনা রয়েছে। কাছারিবাড়িতে যে স্থাপনা রয়েছে তার মাধ্যমে ভিসি, প্রোভিসির দপ্তরসহ পাঁচ-ছয়টি বিভাগ শুরু করার মতো অবস্থা আছে। তাছাড়া, সাময়িকভাবে কয়েকটি বাড়ি ভাড়া নেওয়া এবং শাহজাদপুর শহরে যে সমস্ত কলেজ রয়েছে সেখানকার কিছু শ্রেণিকক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করাও সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভিমত অনুযায়ী শান্তিনিকেতনের আদলে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারের অনুমোদিত পাঁচ সদস্যের একটি দল ২৮ জুন ২০১৩ থেকে ৩ জুলাই ২০১৩ তারিখ পর্যন্ত ভারতের পশ্চিমবাংলার দুটি বিশ্ববিদ্যালয় সফর করেন। এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো—বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় (শান্তিনিকেতন) ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। সফরকারী দলের সদস্যরা হলেন—বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের দুজন সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মোহব্বত খান ও অধ্যাপক ড. আবুল হাশেম, উপ-সচিব ফেরদৌস জামান, শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী সালাউদ্দিন আকবর এবং বাংলা একাডেমির পরিচালক ড. আবদুল ওয়াহাব। এসব পদক্ষেপ আমাদের মনে আশার সঞ্চার করেছিল। আমরা এও জানি যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবম জাতীয় সংসদের জুন মাসের অধিবেশনে অপু উকিলের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘সরকার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর গবেষণা এবং তাঁর অমর সৃষ্টিকে স্মৃতিতে অম্লান রাখার উদ্দেশ্যে সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের খসড়া ও ডিপিপি প্রণয়নের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। আইনের খসড়া ও ডিপিপি শীঘ্রই সরকারের কাছে পৌঁছবে বলে আশা করা যাচ্ছে। যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রস্তাবিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে মর্মে আশা করা যায়।’ (সূত্র : দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৩ জুন ২০১৩) —এই পরিপ্রেক্ষিতে, প্রস্তাবিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মঞ্জুরি কমিশন একটি পূর্ণাঙ্গ ও যুগোপযোগী আইনের খসড়া প্রস্তুত করে এবং ৭ আগস্ট ২০১৩ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। ১৩ আগস্ট ২০১৩ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই আইনের খসড়াটি বিশিষ্ট পণ্ডিতজনের মতামতের জন্য পাঠায়। আমরা জানতে পেরেছি যে, বিশিষ্টজনেরা এই আইনের খসড়াটি অনুমোদন করেছেন এবং তাঁরা কিছু অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী আইনটি সংশোধন-পরিমার্জন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আইন সংক্রান্ত নথিটি প্রস্তুত করেছেন। আমরা যতদূর জানি, এই আইনটি এখন মন্ত্রিপরিষদ সভায় (কেবিনেটে) উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা রয়েছে। তাছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়িতে নির্মিত ভবনসহ ১৫০ একর, নওগাঁর পতিসরে আরও ৬০ একর এবং কুষ্টিয়ার শিলাইদহে আরও ৫৮ একর জমি রয়েছে।’ (সূত্র-দৈনিক সমকাল, ০৫.১০.২০১৩)। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ১৯১৩ সালে সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে আসায় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজের শেষ পর্যায়ে এসেও শেষ পর্যন্ত শেষ করা যায়নি। আমরা জানি যে, মহাজোট সরকার গত পাঁচ বছরে মোট ১০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছিলেন। এবং এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় কোনো বাধা আছে বলে আমাদের জানা নেই। গত ৮ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের সম্মানিত সংসদ সদস্য জনাব হাসিবুর রহমান স্বপনের এক প্রশ্নের উত্তরে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানিয়েছেন, ‘বিশ্ব কবির জন্মজয়ন্তী ২৫ শে বৈশাখ ১৪২১ (৮ মে ২০১৪) তারিখে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় উদ্বোধন করা না গেলেও আগামী শিক্ষাবর্ষেই রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হবে।’ (দৈনিক করোতোয়া, ০৯.৪.২০১৪)। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখন পর্যন্ত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় সব কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর এমন নীরব থাকা রবীন্দ্রপ্রেমীদের হতাশায় আচ্ছন্ন করছে। সামনের জুলাই মাস থেকে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হলে, এখনই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু করে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন হলেই ভালো হতো।
১৯৬৯ সালে ঘূর্ণিঝড়ে শাহজাদপুরে অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছিল, তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে ত্রাণ পাঠিয়েছিলেন, তারপর নিজে গিয়েছিলেন শাহজাদপুরে। তিনি রবীন্দ্র-কাছারিবাড়ির গোল সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে তত্কালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি মোঃ আব্দুর রহমান (প্রাক্তন এম. সি. এ.)-কে বলেছিলেন, ‘আমাদের হাতে ক্ষমতা আসলে, তখন এটা আমরা দেখবো। রবীন্দ্রনাথের নামে কিছু করবো।’ (মোঃ আব্দুর রহমান-এর সাক্ষাত্কার থেকে জানা, যা ‘বাঙালির প্রাণের দাবি, শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়’ নামক স্যুভেনিরে প্রকাশিত হয়।) কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথের নামে ‘কিছু হওয়া’র আশা আর পূরণ হয়নি। এই স্বপ্ন দীর্ঘদিন চাপা পড়ে ছিল। এরপর নব্বই-এর দশকে ড. মযহারুল ইসলাম শাহজাদপুরবাসী তথা রবীন্দ্রপ্রেমী প্রতিটি মানুষকে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। সেই স্বপ্ন একটু একটু করে দানা বাঁধতে বাঁধতে আজ তা প্রায় সম্পন্নের পথে। আমরা আশা করি, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এ বছরেই বাস্তবায়িত হবে। রবীন্দ্রভক্ত প্রতিটি বাঙালি রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছেন।
