গাব্রিয়েল ফের্নান্দেস লেদেসমার আঁকা রবীন্দ্রনাথ

আপডেট : ০৮ মে ২০১৪, ১৯:০৯
রবীন্দ্রনাথের সূত্রে চিত্রশিল্পী দিয়েগো রিবেরা আর রবের্তো মন্তেনেগ্রোর নামটির সঙ্গে সঙ্গেই চলে আসবে মেহিকোরই আরেক শিল্পী গাব্রিয়েল ফের্নান্দেস লেদেসমার নামটিও। তিনিও শিল্পী হিসেবে রিবেরা কিংবা মন্তেনেগ্রোর তুলনায় কোনো অংশে কম ছিলেন না, বরং তাঁর ক্ষেত্রে আরেকটি অতিরিক্ত মাত্রা হচ্ছে এই যে, তিনি তুলির পাশাপাশি কলমেও ছিলেন তুখোড়। যদিও তাঁর কলমটি ছিল তুলিরই সম্পূরক। অর্থাত্ আঁকাআঁকিই ছিল তাঁর লেখার বিষয়। ১৯০০ সালের ৩০ মে মাসে জন্ম নেয়া লেদেসমা ছিলেন একাধারে চিত্রকর, প্রিন্টমেকার, ভাস্কর, গ্রাফিকশিল্পী, লেখক এবং শিক্ষক। মন্তেনেগ্রোর মতো তিনিও হস্তশিল্প এবং লোকশিল্পের সমঝদার যেমন ছিলেন, তেমনি এর প্রসারে ও মর্যাদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই বন্ধু ফ্রান্সিস্কো দিয়াস দে লেয়নের সঙ্গে নিজের শহর আগুয়াস কালিয়েন্তেসে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘স্বাধীন শিল্পীগোষ্ঠী’ (Circulo de Artistas Independientes) এবং আয়োজন করেন বহু প্রদর্শনীর। বিশের দশকের শুরুতেই তত্কালীন শিক্ষামন্ত্রী হোসে বাসকনসেলোসের উদ্যোগে চিত্রকলা বিষয়ক প্রকল্পে পেশাদার শিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন। শিক্ষামন্ত্রণালয়ের পুস্তক প্রকল্পের ‘শিশু কিশোরদের জন্য চিরায়ত পাঠ’ (Lecturas clasicas para niños) এবং ‘বিশ্বজনীন পাঠ’ (Lecturas Universales) —এই দুটো সিরিজের গ্রন্থের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন সহকর্মী ও সহশিল্পী রবের্তো মন্তেনেগ্রোর সাথে। এই সিরিজ থেকেই বেরিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের চারটি গ্রন্থের সাড়ে চারশ পৃষ্ঠার একটি সংকলন তাগোরে (Tagore), ‘শিশু কিশোরদের জন্য চিরায়ত পাঠ’-এর অন্তর্ভুক্ত ‘লা লুনা নুয়েবা’ নামে রবীন্দ্রনাথের The Crescent Moon-এর অনুবাদ আর দূরপ্রাচ্যের কিংবদন্তী (Leyendas de Lejano Oriente)-তে অন্তর্ভুক্ত ১৩টি কবিতা। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের ‘সাহিত্য কর্ম’ (Obra de Tagore) নামে ৬৩ পৃষ্ঠার আরও একটি গ্রন্থ। এই চারটি গ্রন্থের মুদ্রণ সৌকর্য, অলঙ্করণ ও প্রচ্ছদের দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন মন্তেনেগ্রোর সাথে। নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল ঠিক কোন অলঙ্করণগুলো তাঁর তুলি থেকে জন্ম নিয়েছে। তবে কাজগুলো যে দু’জনই অত্যন্ত যত্ন আর সৃজনশীলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছিলেন তা এই বইগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। যেহেতু রবীন্দ্রনাথ তাই অলঙ্করণে ও প্রচ্ছদে ছিল ভারতীয় আদল ও শিল্পরীতির বেশ খানিকটা সচেতন পরিগ্রহণ। তাগোরে গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায়ের সূচনা ও অন্তিমে মুদ্রিত হয়েছিল ভিন্ন ভিন্ন অলঙ্করণ। এমনকি প্রতিটি অধ্যায়ের প্রারম্ভিক বর্ণটিকেও লেদেসমা এবং মন্তেনেগ্রো অলঙ্করণের সৌন্দর্যে দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছিলেন। প্রতিভাবান এই শিল্পীর স্পর্শে অন্যান্য গ্রন্থের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিসম্ভারও হয়ে উঠেছিল সুষমামণ্ডিত। মন্তেনেগ্রোর সাথে লেদেসমা এই কাজগুলো করলেও রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে একটি কাজ তিনি একাই করেছিলেন যেটি আমাদের কাছে এতকাল অজানাই ছিল। অজানা থাকবার একটি বড় কারণ তা রবীন্দ্রনাথের কোনো গ্রন্থের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল না। কাজটি ছিল তাঁর আঁকা রবীন্দ্রনাথের এক প্রতিকৃতি। এটি খুব সম্ভবত লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় প্রতিকৃতি যা মেহিকোর প্রথম সারির এক শিল্পীর আঁকা। প্রতিকৃতিটি মুদ্রিত হয়েছিল ‘লা আন্তোর্চা’ নামক একটি পত্রিকায় হোসে বাসকনসেলোসের ‘এল আপোস্তোল’ শীর্ষক এক প্রবন্ধের (Jose vasconcelos, El Apostol, La Antorcha, 24 de enero 1925, Num. 14. P.4) সঙ্গে। এটি কাঠ খোদাই চিত্রের একটি মুদ্রিত রূপ। তাঁর অন্যান্য চিত্রের মতোই এই ছবিটির এক কোনায় তাঁর আদ্যাক্ষর রূপে উত্কীর্ণ হয়ে আছে G.F.L—এই তিনটি বর্ণ। এই বর্ণ তিনটি না থাকলেও তাঁর স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত অন্যান্য কাঠ খোদাই চিত্রের শৈলীর সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে সহজেই তাঁর আঁকা বলে একে শনাক্ত করতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। রিবেরা তাঁর ‘জ্ঞানীরা’ (Los sabios) ছবিতে রবীন্দ্রনাথকে ঘটনার যোগসূত্রের মাধ্যমে স্পষ্টতা দান করলেও আদলের স্পষ্টতার ব্যাপারে তিনি ছিলেন উদাসীন। অন্যদিকে লেদেসমা এবং মন্তেনেগ্রো আদলের স্পষ্টতাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন বেশি। লেদেসমার কর্মজীবনের ঘটনাবলির দিকে তাকালে আমাদের মনে একটা কৌতূহল দানা না বেঁধে পারে না : তাঁর মতো একজন বামপন্থি আদর্শের শিল্পী রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি আঁকতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন পুরোপুরি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নাকি অনুরুদ্ধ হয়ে? প্রশ্নটা এলো এই কারণে যে মেহিকোতে এই সময়টায় লেখক-শিল্পীদের মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটতে শুরু করেছে। বিপ্লবোত্তর মেহিকোতে ডান এবং বাম—উভয় পক্ষই মেহিকোর সার্বিক উন্নয়ন চাইলেও পথের ভিন্নতার কারণে পরস্পরের মধ্যে বৈরিতার একটা পরিবেশ ক্রমশই ঘনীভূত হচ্ছিল। আমরা দেখব বছর তিনেক পরে, এরই প্রকাশ ঘটছে রিবেরার ‘জ্ঞানীরা’ নামক আক্রমণাত্মক ছবিটিতে যেখানে রবীন্দ্রনাথকে লাঞ্ছনার রংয়ে তুলে ধরলেন বামপন্থি বিশ্বাসের একরোখা তীব্রতায়। তীব্র না হলেও লেদেসমাও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে রিবেরার অনাত্মীয় ছিলেন না। আমরা লক্ষ করলেই দেখব, এই লেদেসমাই তাঁর ভাই এবং গিইয়ের্মো রুইসের সাথে ‘এস্কুয়েলা দে এস্কুলতুরা ই তাইয়া দিরেক্তো’ নামে শিল্পকলা বিষয়ক এমন এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন যেটি শিল্পের কলাকৈবল্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করে মনোযোগ দিয়েছিল হস্তশিল্প ও জনপ্রিয় শিল্পের প্রতি। এমনকি তাঁরা প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করলেন শ্রমিক ও শিশুদেরকে। লেদেসমাপন্থি এও বিশ্বাস করত যে শিল্পের একটি সামাজিক উদ্দেশ্য থাকতে হবে। আমাদের এও মনে পড়বে যে ১৯৩৪ সালে তিনি ছিলেন বিপ্লবী লেখক-শিল্পী সংঘের (Liga de Escritores y Artistas Revolucionarios) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। প্রায় সমবিশ্বাসের হয়েও রিবেরা থেকে একেবারেই ভিন্নচোখে তাকিয়েছিলেন তিনি রবীন্দ্রনাথের দিকে।