রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু মহাকবিই নয়; মানবতাবাদী এক ক্ষণজন্মা পুরুষ। তিনি বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত মানবতার জয়গান গেয়েছেন। কেউ কেউ বলবার চেষ্টা করেন রবীন্দ্রনাথ জমিদার ছিলেন। তাই গরীব মানুষের দুঃখ সেই অর্থে বুঝতেন না, জানতেন না। তিনি সবসময় মানুষকে ভরসার কথা শুনিয়েছেন। চাষীদের দুঃখ যাতনা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন। জামাতা নগেন্দ্রনাথকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,‘চাষীদের সঙ্গে Co-operation-এ চাষ করা, ব্যাংক করা, ওদের স্বাস্থ্যকর বাসস্থান স্থাপন করা, ঋণ মোচন করা, ছেলেদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা, বৃদ্ধ বয়সের সংস্থান করে দেয়া, রাস্তা করা, বাঁধ বেঁধে দেয়া ...... জলকষ্ট দূর করা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য সূত্রে আবদ্ধ করা .... এক জায়গায় যদি আমরা এরকম আদর্শ পল্লী স্থাপনে কৃতকার্য হতে পারি তবে সমস্ত দেশের পক্ষে তার চেয়ে লাভের আর কিছু হতে পারে না ।’
শাহাজাদপুর কাছারিতে প্রজাদের বসবার নানা রকমের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অনেক প্রজার বসবারও ব্যবস্থা করা ছিল। ফরাস পাতা ছিল সেখানে শুধু ব্রাহ্মণ এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুদেরই বসার ব্যবস্থা ছিল। অনেক সম্ভ্রান্ত মুসলমান প্রজাও দাঁড়িয়ে থেকে দরবার করে। রবীন্দ্রনাথের প্রধান কর্মচারী ছিলেন বিপিন চন্দ্র বিশ্বাস। রবীন্দ্রনাথ খুব বিরক্তির সাথে তাঁকে বলেছিলেন, বিপিন, এ তোমাদের কেমনতর ব্যবস্থা হে ! বিপিন বাবু উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এই প্রথা বরাবর চলে আসছে হুজুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘ বরাবর চলে আসতে পারে, কিন্তু এরপর আর চলবে না’ । বিপিন বাবু ভয়ে ভয়ে বলেছিলেন, ‘সেটা হুজুর সুবিধা হবে বলে মনে হয় না । নানা রকম আপত্তি উঠবে।’ রবীন্দ্রনাথ বিরক্তিভাবে বলেছিলেন, কেন সুবিধা হবে না ? আর আপত্তিই বা কোথায় ? বিপিন বাবু বললেন, ব্রাহ্মণরা তাহলে বসবেন না । রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, বেশ, না বসেন না বসবেন, কিন্তু এ ব্যবস্থা আর চলবে না । তাতে যাদের জাত যাবে তারা না হয় নিজের শুচিতা নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকবেন ।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ কিন্তু বারবার রবীন্দ্রনাথকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মার্চ মাসের ২ তারিখে দৈনিক সমকাল পত্রিকায় ‘একজন বিচারপতির রায়’ শিরোনামে একটা ছোট নিবন্ধ ছাপা হয়েছে । সেখানে রবীন্দ্রনাথকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে চি?িহ্নত করে একজন বিচারপতির রায়ে সংযুক্ত অংশবিশেষ উল্লেখ করা হয়েছে । আবুল কালাম আজাদ ওরফে কলিমুল্লাহ এবং অন্যান্য বনাম মাধব বিগ্রহ এবং অন্যান্য মামলার রায়ে বিচারপতি শরীফউদ্দিন চাকলাদার ও বিচারপতি মো: জহির হোসেনের ( ২০১২ সালের ১৮ নভেম্বর) রায়ে রবীন্দ্রনাথকে নিষ্ঠুর অত্যাচারী জমিদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্বদ্যািলয় প্রতিষ্ঠার নাকি বিরোধিতা করেছিলেন । (http://www.samakal.net/2014/03/02/43134)
এই কথা বেশ কিছুকাল ধরে বাংলাদেশে মুখে মুখে চলছে। কেউ কেউ কোনো প্রমাণ উপস্থিত না করেই লিখিতভাবে জানাচ্ছেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে এক বিরাট জনসভা হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলতেন, অর্ধসত্য, আংশিক সত্য মিথ্যার চেয়েও ভয়ংকর । বছরের পর বছর বিকৃত সত্য মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে । ও- রকম একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল বটে, কিন্তু তাতে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি ছিল অসম্ভব, কেননা সেদিন তিনি কলকাতায়ই ছিলেন না । ১৯১২ সালের ১৯ মার্চ সিটি অফ প্যারিস জাহাজযোগে রবীন্দ্রনাথের বিলাতযাত্রার কথা ছিল। তাঁর সফরসঙ্গী ডা. দ্বিজেন্দ্রনাথ মিত্র জাহাজে উঠে পড়েছিলেন, কবির মালপত্রও তাতে তোলা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আকস্মিকভাবে ঐদিন সকালেই অসুস্থ হয়ে পড়ায় রবীন্দ্রনাথ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। পরে মাদ্রাজ থেকে তাঁর মালপত্র ফিরিয়ে আনা হয়। কলকাতায় কয়েকদিন বিশ্রাম করে ২৪ মার্চ রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে চলে আসেন এবং ২৮ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিলের মধ্যে সেখানে বসে ১৮টি গান ও কবিতা রচনা করেন যা পরে গীতিমাল্য (১৯১৪) গ্রন্থে সংকলিত হয় । ২ গীতিমাল্য গ্রন্থেও ৪- সংখ্যক কবিতা ‘স্থির নয়নে তাকিয়ে আছি’ যে শিলাইদহে ১৫ চৈত্র ১৩১৮ তারিখে [ ২৮শে মার্চ ১৯১২] রচিত হয়, তা উক্ত গ্রন্থে কবিতাটি নিচেই লেখা আছে। উল্লেখযোগ্য যে, ইংরেজি গীতিঞ্জলির (১৯১২) সূচনাও হয় এ সময়ে । অসুস্থতাবশত বাধ্যতামূলক বিশ্রামকালে তিনি একটি-দুটি করে নিজের কবিতা ও গান এখানে অনুবাদ করতে শুরু করেন। ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঢাকা সফরের এসে যেভাবে প্রথমে ঢাকার নবাবের আতিথ্যলাভ করেন এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবর্ধিত হন, তিনি ঐ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা করে থাকলে তা সম্ভবপর হতো না। বিশেষ করে পাকিস্তানী ধ্যান-ধারণায় আচ্ছন্ন উচ্চশিক্ষিত সমাজের একটি অংশ এই প্রপাগান্ডার বাদ্যি বাজিয়ে এসেছেন। এখনও এই সমাজের উপরিভাগেও তাঁরা অবস্থান করছেন। দৈনিক সমকালে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের এক বিচারক জমিজমা সংক্রান্ত মামলার এক রায়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এই জাতীয় মন্তব্য করেছেন। বিচারপতিদ্বয়ের রায়ে বলা হয়েছে, প্রভুদের (বৃটিশ) খুশি করতে জমিদাররা সবকিছু করতেন। এই জমিদারদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ বিশেষভাবে সুপরিচিত। এমনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অত্যাচার নির্যাতন করে প্রজাদের কাছ থেকে কর আদায় করতেন। অথচ গরীব কৃষকদের একত্রিত করবার জন্যে আজীবন নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তাঁর আপন বিশ্বাসকে প্রকাশ করেছেন এভাবে—‘অনেক গরীব আপন সামর্থ্য এক জায়গায় মিলাইতে পারিলে সেই মিলনেই মূলধন।’ শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। তাঁর কথায় ফুটে ওঠে সেই ভরসার কথা। “তোমরা যে পঞ্চাশ জনে চিরকাল পাশাপাশি পৃথক চাষ করিয়া আসিতেছ, তোমরা তোমাদের সমস্ত জমি, হাল, লাঙ্গল, গোলাঘর, পরিশ্রম, একত্র করিতে পারিলেই গরীব হইয়াও বড়ো মূলধনের সুযোগ আপনিই পাইবে।” সাহস নিয়ে দাঁড়ানোর আহবান শোনা তাঁর অমর কাব্য পংক্তিতে।
‘যারা এতদিন মরেছিল তারা উঠুক বেঁচে
যারা যুগে যুগে ছিল খাটো হয়ে
তারা দাঁড়াক একবার মাথা তুলে ’।
