স্বপ্নের গায়ে লোবানের গন্ধ

আপডেট : ০৮ মে ২০১৪, ১৯:১০
‘সুমন ভাই, আপনি সত্যি ভাগ্যবান। বড় আপার মতো নামজাদা উকিল আপনার বড় বোন তাই আপনার হার্ট এখনো টিক টিক আওয়াজ দেয়। আল্লার রহমতে বড় আপা মাথার ওপর ছাতি ধরে আছে বলে সাহস করে এক রাতে দুইটা খুনের কন্ট্রাক্ট নিতেও ভয় পাই না’ রাজু আজ অনেক বেশি কথা বলছে। সুমনের মনে হয় রাজুর কথা বলার ঝোঁক বেড়ে গেছে। রাজুর ভাবনা-চিন্তার ধাঁচ সুমনকে ভাবিয়ে তুলছে। তার কথার মধ্যে ঘুরেফিরে বড় আপার প্রসঙ্গ চলে আসে। এটা সুমনের কানে কটু ঠেকে। গেল মাসে সুমনের ডান হাত কুত্তা বাবুর লাশ পড়ল। কুত্তা বাবুকে কে খুন করল সেটা সুমন এখনো ঠাওর করতে পারছে না। মুখ ফুটে বলার মতো কোনো প্রমাণ সুমনের হাতে নাই। তবুও তার সন্দেহের পাল্লা দিন দিন রাজুর দিকে ঝুঁকছে। কুত্তা বাবু মরার পর থেকে সুমনের মনে হচ্ছে তার নিজের দলের লিডারগিরি হাত পিছলে বের হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লিডারগিরি তার হাত থেকে বের হয়ে যাচ্ছে কার হাতে? চিন্তার ঝোঁকে সুমন দুই হাতের মুঠা খুলে হাতের তালুর দিকে চেয়ে বসে থাকে। মাথার মধ্যে জবাব ছাড়া হরেক প্রশ্নের জট। কাদের ভাই কি খুনের মতো রিস্কি ব্যবসা সরাসরি নিজের হাতে তুলে নেবে? উঁহু, এটা সম্ভব না। কাদের ভাই শিক্ষিত পলিটিশিয়ান। পরপর দুইবার এমপি হয়েছে। তিনবার এমপি হলেই সে মন্ত্রী হয়ে যাবে। সুমন, রাজুদের মতো ভাড়াটিয়া খুনি হাতের মুঠায় থাকতে খুনের মতো ঝুঁকির ব্যবসায় নেমে উনি মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করবে কেন। তাহলে? কে তার লিডারগিরি নিয়ে টান দিল? বড় আপা কি ডাইরেক্ট লেনদেনে নামতে চায়? উনার সমাজসেবা ব্যবসায় আয় ইনকাম কি কমে গেছে? বড় আপার চিন্তা মনে আসতে সুমনের মাথা ভার হয়ে আসে। হাতের মুঠা শক্ত করে চেপে রাখায় তার নখগুলো তালুতে ফুটে ব্যথা লাগছে। তবুও সে হাতের মুঠা ঢিলা করে না। তার কেবলই মনে হচ্ছে, লিডারগিরি ধরে রাখতে হলে শক্ত হাতে দলের হাল ধরতে হবে। লিডারগিরি ফসকে গেলে তার নিজের লাশ কুত্তা বাবুর মতো ড্রেনের পাশে চিত্ হয়ে পড়ে থাকবে। কুত্তা বাবুর মরা মুখের ওপর মাছির ভনভনানি মনে আসতে সুমন থুক করে মাটিতে থুতু ফেলে। মনে হয়, ডুমা মাছির দল সুমনের মরার জন্য অপেক্ষা করতে পারছে না, ওর জ্যান্ত ঠোঁটের কোনা ঠেলে মুখের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। সুমন নড়ে বসে আর একবার বড় দলায় থুতু ফেলে। কুত্তা বাবুর মরার খবর পেয়ে সুমন সেই রাতে চটজলদি বাসায় ফিরে গিয়েছিল। ভেবেছিল, খুনের জন্য কেউ তাকে সন্দেহ করে বাসায় খুঁজতে এলে বড় আপা দরজা খুলে হেসে বলবেন, ‘ওহ্ ডিয়ার, এত রাতে সুমন কি আর জেগে আছে? দশটা না বাজতে সে ঘুমিয়ে কাদা। ওর কাজ কারবার এখনো ছোটদের মতো রয়ে গেল। আপনারা বসুন। আমি ওকে ডেকে তুলছি।’ বড় আপা এমন কথা আগে অনেকবার বলেছে। দরজায় দাঁড়িয়ে দুলে দুলে কথাগুলো বলার সময় তাকে ক্লিওপেট্রার মতো সুন্দর দেখায়। সে রাতে সুমন বাসায় ফিরে মনে বড় মাপের ধাক্কা খেয়েছিল। সিঁড়ির মাথায় বড় আপা রাজুর গা ঘেঁষে দাঁড়ানো। পরনের শাড়ির আঁচল বাঁ হাতে গড়িয়ে পড়েছে। ডান হাতে রাজুর পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে বড় আপা বলছিল, ‘ওকে বয়, প্লানমাফিক কাজ শেষ কর। বাকিটা আমার ওপর ছেড়ে দিও। ও ভালো কথা। বাই দা বাই। তোমাকে শিগগিরই একটা জরুরি কাজের ভার দেব।’ কুত্তা বাবুর মতো বিশ্বাসী অনুগত বন্ধু হারিয়ে সুমন চোখে আঁঁধার দেখছিল। এমন একটা ঘটনার পরে রাজু বড় আপার গা ঘেঁষে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে হেসে কথা বলছিল। চোখের সামনে এমন দৃশ্য দেখে ঘরে ঢুকে সুমন মেজাজ সামলাতে পারেনি। কুত্তা বাবুর খুনের ব্যাপারে রাজু তাকে কিছু বলেছে কি না জানতে চাওয়ায় বড় আপা মুখ আঁধার করে বলেছিল, ‘তোর চামড়া বাঁচাতে গিয়ে আমার নিজের গায়ের চামড়া এখন খসে পড়ার দশা। জীবনভর সাধ্য সাধনা করে ত্যাগী সমাজকর্মী হিসেবে যেটুকু সম্মান কামাই করেছিলাম, তার সবই তোর জন্য খোয়াতে হয় কি না আমি সেই আতঙ্কে আছি।’ সুমন তার বোনের গলার স্বরে চমকে উঠেছিল। কুত্তা বাবুর খুনের জন্য বড় আপা কি তাকেই দায়ী করছে? বড় আপা ইচ্ছা করে কুত্তা বাবুর খুনের দায় সুমনের ঘাড়ে চাপাচ্ছে—এটা ভাবতে সুমনের সব ভাবনা থমকে দাঁড়ায়। ২. কুত্তা বাবুর মৃত্যু এবং মহল্লায় আনন্দ মিছিলের সাত দিন পরে গলির মাথার প্রাইমারি স্কুলের মাঠে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে মতবিনিময় সভা। এলাকার এমপি কাদের মুন্সি প্রধান অতিথি। সুমনের বড় আপা এডভোকেট লায়লা বিশেষ অতিথি। মানবাধিকার কর্মী বড় আপা বক্তৃতায় আবেগের বান ডাকিয়ে দিলেন। আবেগের বশে ভাঙা গলায় বললেন, আমাদের কারো ঘরে বাবুর মতো সন্ত্রাসীর আর জন্ম হবে না। বাবুর বাপ বদলা হাজিকে পাশে বসিয়ে নিজের রুমাল দিয়ে তার শুকনা চোখ বার বার মুছে দিলেন। বললেন, ‘বাবুর নামের সঙ্গে আপনারা আর কুত্তা শব্দ যোগ করবেন না। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাবু সব দোষের ঊর্ধ্বে চলে গেছে।’ বড় আপার কথা শুনে কাদের এমপি রুমালে চোখ মুছে বললেন, ‘এডভোকেট লায়লা মানবতার জন্য তার জীবনটাই বিলিয়ে দিয়েছেন। তার চিন্তা ও কাজ নোবেল প্রাইজ পাওয়ার উপযুক্ত।’ সেই রাতে কাদের এমপির বাড়ির দোতলায় কোনার রুমে সুমনের ডাক পড়ল। কোনার রুমের দরজা বারো মাস বন্ধ থাকে বলে ভেতরে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। একটা মাত্র টিউব লাইটের আলো রুমের কোনা-কানায় পৌঁছায় নাই। মেঝেতে ছড়ানো ছিটানো কয়েকটা চেয়ার পার হয়ে দরজা বরাবর পুরোনো একখানা ইজি চেয়ারে কাদের এমপি শরীর বিছিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তার শোয়ার মধ্যে আয়েশের ভাব নেই। তার মৃদু নড়াচড়ায় ইজি চেয়ার থেকে কিচকিচ আওয়াজ উঠছে। সুমন চেয়ার টেনে যখন কাদের এমপির সামনে বসে তখন ঘরে সুনসান নিরবতা। সিরিয়াস কাজে কাদের মুন্সি ভূমিকা করে সময় নষ্ট করে না। সে সোজাসাপ্টা মূল কথায় ঢুকে যায়। সামনে বসা সুমনের চোখের দিকে চেয়ে শীতল গলায় সে বলে, ‘সুমন, তোর বোনের সুন্দর নরম দুইখান হাত তার পরনের শাড়ির চেয়ে বেশি লম্বা হয়ে গেছে। তুই কি সেটা টের পাস?’ সুমনের কাছ থেকে কাদের এমপি প্রশ্নের জবাব আশা করেনি। একটানে আরও কিছু বলার জন্য সে হাঁ করেছিল। কিন্তু কাদেরকে চমকে দিয়ে সুমন আচমকা মুখ খোলে। বলে, ‘টের পাই বললে অল্প বলা হয় কাদের ভাই। বড় আপার বাড়ন্ত হাতের কাজ আমি নিজ চোখে দেখতেও পাই। সেই সাথে... ...’ সুমন লম্বা দম নেয়ার জন্য বুক টান করে বসে। আবছা আঁধারে তার মুখ থমথমে হয়ে ওঠে। সুমনের ভাব দেখে কাদের এমপির ভেতরে ভয়ের ছায়া। একবার ভাবে, সুমনকে সঙ্গে নিয়ে সে ড্রয়িংরুমের আলোতে গিয়ে বসে। ফের মনে হয়, সময় এখন সুমনের হাতে বাঁধা। কাদের তাকে হুকুম করলেও সে আঁধার রুম ছেড়ে নড়বে না। নিজের অজান্তে কাদেরের চোখ সুমনের কোমড় ছুঁয়ে আসে। ওর সার্ট কি কোমড়ের কাছে ফুলে আছে? সুমন কি তার প্রভুর পায়ের তলে পিস্তল হাতে বসে আছে? কথাটা ভাবতে গিয়ে কাদের নিজের মনে মুচকি হাসে। ভাবে, প্রভুর পা চাটার সময় কুকুরের দাঁত তার মুখেই থাকে। তাই বলে সে প্রভুকে কামড়ায় না। সুমন কোমরে পিস্তল নিয়ে তার প্রভুর সামনে বসে থাকলে তাতে ভয় পাওয়ার কী আছে? কিন্তু মানুষের প্রভুভক্তি কি কুকুরের মতো পিওর? কাদের চোরা চোখে সুমনের মনে ভক্তির গভীরতা মেপে দেখতে চায়। কাদের এমপির বুকে ভয়ের গুড়গুড় সুমন কুকুরের মতো গন্ধ শুঁকে টের পায়। সে মন খুলে হাসে। বলে, ‘আপনার নাকে কি আগর বাতির গন্ধ আসছে কাদের ভাই?’ কাদেরকে কপাল কুঁচকে তাকাতে দেখে সুমন ব্যাখ্যা করে বলে, ‘লাশ রাখা খাটিয়ার চারপাশে লোবান কাঠি জ্বালায় দেখেন নাই? লোবানের ধোঁয়ার গন্ধ কেমন বিটকেলে না। আপনার নাকে কি লোবানের গন্ধ আসছে?’ সুমন নাক কুঁচকে গন্ধ শুকতে চেষ্টা করে। কাদেরকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলে, ‘কুত্তা বাবু মরার পরে এক মাস পার হয়ে গেল, কিন্তু মহল্লার বাতাসে এখনো লোবানের গন্ধ। আপনি টের পান না?’ ‘এই ঘরটা বন্ধ থাকে বলে বাতাসে ভ্যাপসা ভাব। চলো আমরা ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসি। ওখানে এসির বাতাসে সব গন্ধ দূর হয়ে যাবে।’ ‘না ভাই, আমি এখানে বসে কথা শেষ করে চলে যাব।’ ‘তুই যাবি কিভাবে? নতুন কাজের অর্ডার নিবি না? অর্ডারের সাথে ফিফটি পারসেন্ট অ্যাডভান্স। টাকার গন্ধ নাকে গেলে মাথা থেকে লোবানের গন্ধ মুছে যাবে।’ সুমন কোনো কথা শুনতে পাচ্ছে না। তার চোখ কাদেরের মুখে থির হয়ে আছে। ‘কাদের ভাই, বড় আপা রাজুকে শরীরের লোভ দেখাচ্ছে।’ কথাটা বলতে গিয়ে সুমনের গলা কেঁপে যায় দেখে কাদের এমপি গলা তুলে হাসে। ‘তোর দেখি নাক টিপলে দুধ পড়ে। লায়লা আমার বউ না প্রেমিকা? তোর বোন বলে কথাটা বলতে আমার মুখে বাধছে। সত্যের খাতিরে তবুও বলি, মহিলা ব্যাসিক্যালি বাজাইরা। যেদিন যার সাথে দরকার সেদিন তার সাথে শুতে যায়। লায়লা রাজুর সাথে শুতে গেলে আমার কোনো ক্ষতি আছে?’ ‘আপনি পলিটিশিয়ান। হাজার কুত্তার সাথে মিশে এক গামলায় পানি খেলে আপনার জাত যায় না। রাজু পাতি মাস্তান। সে কি আপনার সাথে এক শানকিতে মুখ ডুবাতে রাজি হবে?’ কাদের এমপির কপালে চিন্তার ভাঁজ। সুমনের ইশারা ধরতে পেরে তার বুকে সাহস ফিরে আসে। এই সামান্য ব্যাপারে সুমন এত ভয় পাচ্ছে কেন ভেবে সে অবাক হচ্ছে। কাদেরের মনের কথা বুঝতে পেরে সুমন বলে, ‘আমরা খুনের কারবারি সস্তা মাস্তান। রাতে ইনকাম করি দিনে পকেট ফাঁকা করে ফের লাশের বাণিজ্য খুঁজতে বের হই। আমরা ভবিষ্যত্ নিয়ে স্বপ্ন দেখি না। বড় আপা এমপি মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। নিজের স্বপ্ন পুরা করার জন্য সে রাজুকে ভবিষ্যতের মিথ্যা স্বপ্ন দেখাচ্ছে। স্বপ্নের ঘোরে পথের কাঁটা ভেবে রাজু আপনার লাশ ফেলবে। আমি জানি, কাজ শেষে রাজু নিজে ‘ক্রস ফায়ারে’ মরবে। কিন্তু রাজু এই সত্য জানে না।’ সুমনের সব কথা হঠাত্ শেষ হয়ে গেলে ঘরে থমথমে ভাব দ্রুত জমাট বাঁধতে শুরু করে। কাদেরের কথা বলতে ইচ্ছা করে না। তার নাকে লোবানের গন্ধ। কুত্তা বাবুর খাটিয়া থেকে লোবানের ধোঁয়া তার নাকে ধাক্কা মারছে। কুত্তা বাবুর পাশে নিজের লাশ দেখে কাদের চমকে ওঠে। লাশের সারিতে তারা দুইজন নয়। সুমন, রাজু সবাই সার বেঁধে তার পাশে শুয়ে আছে। সবার খাটিয়া থেকে লোবানের ধোঁয়া পাক দিয়ে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। ঘন ধোঁয়ার ফাঁক গলে মাঝে মাঝে এডভোকেট লায়লার মুখ ভেসে ওঠে। লোবানের গন্ধে কাদেরের দম আটকে আসে।