কাজী শাহেদ আহমেদের ‘জীবনের শিলালিপি’

সময়ের মুগ্ধকর ক্যানভাস

আপডেট : ০৮ মে ২০১৪, ১৯:১০
জীবনের শিলালিপি কাজী শাহেদ আহমেদ প্রচ্ছদ :শিবু কুমার শীল প্রকাশক :আগামী প্রকাশনী প্রথম প্রকাশ :২০১৪ মূল্য :৮০০ টাকা কাজী শাহেদ আহমেদের আত্মজীবনীগ্রন্থ ‘জীবনের শিলালিপি’ পড়তে পড়তে বারবার মনে হচ্ছিল, কী সুন্দর করে গল্প বলতে পারেন তিনি, তাঁকে বলা যায় একজন অনবদ্য গল্পকার, অসাধারণ কথাকার। কথা বলার ঢঙে তিনি লিখে যান জীবন সংগ্রামের অনবদ্য কাহিনি। তাঁর উপস্থাপন শৈলী মুগ্ধকর। ‘জীবনের শিলালিপি’ বইয়ের শুরুতে তিনি একটি শপথ লিখেছেন—‘যাহা লিখিলাম তাহা সত্য।/যাহা ছাপিলাম না তাহাও সত্য।/যাহা ত্রিশ বছর পর ছাপা হইবে তাহাও সত্য।’ তাঁর লেখার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হলো, তিনি অত্যন্ত সহজভাবে কঠিন সত্য বলে যান। তাই একজন প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তা, সংবাদপত্র প্রকাশক, সম্পাদক এবং শিল্পপতি—এসব পরিচয়ের বাইরে তাঁর লেখক পরিচয় আমাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে। ‘ভৈরব’ উপন্যাসের মাধ্যমে গত বছর কাজী শাহেদ আহমেদকে আমরা আবিষ্কার করলাম একজন চমত্কার লেখক হিসেবে, গল্পের কথক হিসেবে। লেখক কাজী শাহেদ আহমেদের উন্মেষ আমাদের মুগ্ধ করল। সেই মুগ্ধতা কাটতে না কাটতেই তিনি আমাদের উপহার দিলেন ‘জীবনের শিলালিপি’। ‘জীবনের শিলালিপি’ বইয়ে কাজী শাহেদ আহমেদ ইংরেজ, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ আমলের জীবনের অভিজ্ঞতা অকপটে স্বীকার করেছেন নিজস্ব ভঙ্গিতে। সত্যভাষণ তাঁর লেখার মূল উপজীব্য। এ সততা সত্যিই মুগ্ধ করে, পাঠে উত্সাহ জোগায়। ‘জীবনের শিলালিপি’ শুধু একজন ব্যক্তির জীবনকাহিনি নয়, বরং একটি উত্তাল পরিবর্তনশীল নতুন সময়ের স্বাক্ষর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং পরবর্তী নানা সময়ের প্রামাণ্য দলিল ‘জীবনের শিলালিপি’। মানুষ হিসেবে কাজী শাহেদ আহমেদ একটু আলাদা; এ কথা তাঁর সমসাময়িক এবং অগ্রজ-অনুজ সবাই স্বীকার করেন। ‘জীবনের শিলালিপি’ বইয়ে তিনি গভীর মমতার সাথে ব্যক্তিজীবন, কর্মজীবনের পাশাপাশি পারিবারিক ও সাংসারিক জীবনকে রূপায়িত করেছেন। তিনি একজন সুপুত্র, আদর্শ স্বামী ও পিতা, পিতামহ হিসেবেও তার ভূমিকা অত্যন্ত মমতাময়। পরিবারের সদস্যদের প্রতি তিনি যেমন, তেমনি মানুষের প্রতি তার দরদী মন আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। মানবিক বোধ তাঁর মধ্যে প্রবলভাবে কাজ করত ছেলেবেলা থেকেই। তাই কলেজ থেকে ফেরার পথে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত জগলুকে বাড়ি নিয়ে যেতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। কাজী শাহেদ আহমেদ তাঁর সমসাময়িক সময়ের চিত্র তুলে এনেছেন ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। এ ধরনের স্মৃতিচারণায় যুক্তির চেয়ে আবেগের প্রাবল্য লক্ষ করা যায়, যা থেকে কাজী শাহেদ আহমেদও মুক্ত হতে পারেননি। ফলে কোথাও কোথাও আবেগের আধিক্য লক্ষ করা গেছে, এ আবেগ তাঁর সত্যভাষণের পরিচয়ও বহন করে। অতীত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরতে গিয়ে তিনি সত্যকে লুকানোর চেষ্টা করেন না। এটা তাঁর সাহসেরও পরিচয় বহন করে। একান্ত ব্যক্তিজীবনের অন্তরালের দুঃখ-সুখ, সংগ্রাম-সাফল্য সবই তুলে এনেছেন নির্দ্বিধায়। স্পস্ট ভাষায় কঠিন বিষয় মেলে ধরবার মাঝেও তাঁর রসবোধ অসাধারণ। বাংলাদেশে সংবাদপত্রের আধুনিকায়নে তাঁর ভূমিকা স্মরণযোগ্য। সংবাদ পরিবেশনে আন্তরিকতা ও সত্য প্রকাশে অবিচল থেকেছেন সবসময়, সরকারি চাপের মুখে তিনি কখনো নতি স্বীকার করেননি। সাপ্তাহিক ‘খবরের কাগজ’ এবং মাসিক ‘আজকের সভ্যতা’ প্রকাশনা ও পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের সাময়িক পত্রিকার জগতে ঝড় তুলেছিলেন। আর দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ সংবাদপত্রের আধুনিকায়নে স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। সফল এ মানুষটি কেবল রাজনৈতিক জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারেননি। কিন্তু মানুষের চরিত্র সম্পর্কে যে বিচিত্র অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন ‘জীবনের শিলালিপি’ বইয়ে সে কাহিনি বেশ গুরুত্ব দিয়ে লিখেছেন। বলা চলে এ বই পাঠে একটা সময়ের আর্থ-রাজনৈতিক-সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য পাওয়া যায়। দেশভাগপরবর্তী পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে তাঁর ছাত্রজীবন ও কর্মজীবন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সৈনিক, কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারবর্গ যে দুুর্বিষহ জীবন যাপন করেছেন ‘জীবনের শিলালিপি’ বইয়ে কাজী শাহেদ আহমেদ তা অকপটে লিখেছেন। বাংলাদেশে যেমন সামরিক তেমনি বেসামরিক জীবনেও সমুজ্জল কাজী শাহেদ আহমেদ। কুমিল্লায় প্রথম মিলিটারি একাডেমি স্থাপন, ঢাকায় নেভাল হেড কোয়ার্টার স্থাপনা নির্মাণে তাঁর ভূমিকা নিঃসন্দেহে গৌরবের। শিল্পপতি হিসেবে যেসব কীর্তি স্থাপন করেছেন তার তুলনা হয় না। পঞ্চগড়ের মতো অনুন্নত অঞ্চলে ইলেকট্রিক পোল নির্মাণের কারখানা, পাটকল, ভেষজ (হারবাল) অরণ্য, জৈবিক (অর্গানিক) চা বাগান এবং আনুষঙ্গিক স্থাপনার মাধ্যমে ওই অঞ্চল ও মানুষের জীবনমানের অচিন্তনীয় পরিবর্তন ঘটিয়েছেন কাজী শাহেদ আহমেদ, এ অবদান কম গৌরবের নয়। কাজী শাহেদ আহমেদের ‘জীবনের শিলালিপি’ কেবল স্মৃতিচারণা নয়, আবার মূল্যায়নধর্মী লেখাও নয়। এ দুইয়ের মিশেলে এমন সব ছবি এঁকেছেন তিনি, যা বিক্ষিপ্ত হলেও একটা সময়ের স্বরূপ খুঁজে পাওয়া যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কেও পাঠক স্পষ্ট ধারণা পাবেন ‘জীবনের শিলালিপি’ বইয়ে। লেখক মোট ৪৬টি অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন তাঁর জীবনের নানা দিক সম্পর্কে। এর বাইরেও আলোকচিত্রের মাধ্যমে লেখকের জীবনের নানা সময় তুলে ধরা হয়েছে। কাহিনিসূত্রে বইয়ে সমসাময়িক আরও নানা চরিত্র উঠে এসেছে। প্রতিটি অধ্যায় জুড়ে যে ঘটনাগুলো প্রবাহিত হয়েছে তা কেবলই শিহরণ জাগায়। জীবনের প্রতিটি ধাপের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা সত্যিই ভাবিত করে। একটা মানুষের জীবন এত বিচিত্র হয়! কাজী শাহেদ আহমেদের ‘জীবনের শিলালিপি’ শুধু একজন ব্যক্তি মানুষের জীবনের বয়ান নয়; একটি সময়ের ক্যানভাস। জীবনের প্রতি ধাপে কাজী শাহেদ আহমেদের সংগ্রামী মানস আমাদের প্রেরণা জোগায়। আক্ষরিক অর্থেই তিনি একজন কর্মবীর। একজীবনে তিনি যে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, সফলতা ছিনিয়ে এনেছেন—তা সত্যিই অভাবনীয়। কাজী শাহেদ আহমেদের ভাষা সরল ও সহজ। তিনি লিখেন অনেকটা কথা বলার ভঙ্গিতে, গল্পের ছলে। পাঠককে তিনি সেই গল্পের শ্রোতা করে নেন; এটি কাজী শাহেদ আহমেদের লেখার গুণ হিসেবেই স্বীকৃত। বইটি পাঠকের প্রত্যাশা পূরণ করবে বলেই মনে করি।