আবদুল আউয়াল মিন্টুর ‘বাংলাদেশ :রাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি’

রাজনৈতিক অর্থনীতির সুলুকসন্ধান

আপডেট : ০৮ মে ২০১৪, ১৯:১০
বাংলাদেশ:রাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রচ্ছদ :ধ্রুব এষ প্রকাশক :অনুপম প্রকাশনী প্রথম প্রকাশ :ডিসেম্বর, ২০১৩ মূল্য :৮০০ টাকা সুষুম রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং তার সঠিক প্রয়োগ ছাড়া কোনো দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারিত হতে পারে না। আবার কোনো দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল হলে সে দেশের রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং তার প্রয়োগও যথাযথ হয় না। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও উদীয়মান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি আরো অনেক বেশি গুরুত্ব দাবি করে। দেশের প্রথিতযশা ব্যবসায়ী ও সচেতন সমাজচিন্তক আবদুল আউয়াল মিন্টু দেশ-বিদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার বিচার ও বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর প্রণীত ‘বাংলাদেশ : রাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি’ গ্রন্থে। রাজনীতি ও অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত নানা বিষয় এই গ্রন্থের প্রতিপাদ্য। যে বিষয়গুলো নিয়ে বইটির কাঠামো নির্মিত হয়েছে সেগুলো হলো—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য সু-রাজনীতির আবশ্যকীয়তা; অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান, উন্নততর প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ ও কার্যকর রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা; বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উল্টোমুখি প্রবণতা রোধ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির লক্ষ্যে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন সেসব বিষয়কে তর্ক-বিতর্ক-আলোচনায় নিয়ে আসা; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে নেতিবাচক ও ক্ষতিকর নীতিসমূহকে চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর পরিবর্তনে তর্ক-বিতর্ক শুরু করতে প্ররোচনা জোগানো; সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করে পাঠকদের মাঝে উচ্চতর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য-হার হ্রাসের গতিবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বর্তমান রাজনীতি ও অর্থনীতির আলোকে ভবিষ্যত্ কর্মপন্থা কী হওয়া উচিত সে সম্পর্কে আলোচনা; চলতি আর্থরাজনৈতিক সমস্যাবলির সমাধান অন্বেষণ; বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক আদর্শ ও বাস্তবতার পার্থক্যটা সহজ-সরল ভাষায় পাঠকের কাছে তুলে ধরা; গণতন্ত্রের মতো বিষয়কে পাঠকের কাছে তথ্যবহুল করে তুলে ধরা এবং গণতান্ত্রিক আদর্শ ও নৈতিক মূল্যবোধের জটিল ধ্যান-ধারণার জগতের মধ্য দিয়ে পাঠককে একটা পরিভ্রমণে নিয়ে যাওয়া, যাতে রাজনীতিকদের বক্তব্য ও অর্থনীতির দৈনন্দিন চর্চাকারীদের মধ্যেকার সাংঘর্ষিক মতবিরোধের কারণগুলো নির্ণয় করে সেগুলোকে দৃষ্টান্ত ও ব্যখাসহ সহজ-সরল ভাষায় সাধারণ জনগণের কাছে উপস্থাপন করা যায়। ৪৮২ পৃষ্ঠার এ গ্রন্থের বিষয়গুলোকে সাতটি অধ্যায়ে ভাগ করেছেন লেখক। প্রথম অধ্যায়ে বইয়ের প্রারম্ভিক আলোচ্য বিষয়টি মূলত পরের অধ্যায়গুলোতে বিস্তারিত আলোচনার বুনিয়াদবিশেষ। দ্বিতীয় অধ্যায়ে সামষ্টিক অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তৃতীয় অধ্যায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ে বাংলাদেশে উচ্চহারে মূল্যস্ফীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ অধ্যায়ের অন্তর্নিহিত মূলভাব হলো, বর্তমানে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে তার মূল কারণ শনাক্ত করা। পঞ্চম অধ্যায়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সাথে গণতন্ত্রের সম্পর্কের বিষয়ে। সপ্তম অধ্যায়ে লেখক পাঠকদের নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন সমাজকে রূপান্তরিতকরণ ও বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের আলোচনায়। এই অধ্যায়ে আলোকপাত করা হয়েছে দেশের অতীত ইতিহাস, বর্তমান আর্থ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও এসবের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াবলির ওপর। পাঠকের পাঠের সুবিধার্থে এ গ্রন্থের আলোচনাগুলো কোন পথে এগিয়ে যাবে লেখক তা নির্দেশ করে দিয়েছেন বই পরিচিতিতে। জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, আলোচনা ও অনুসন্ধানের আলোকে এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে এ গ্রন্থে পাঁচটি বিষয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। বিষয়গুলো হলো—১. রাজনীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতি; ২. রাজনীতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক; ৩. রাজনীতি, মূল্যস্ফীতি ও জীবনমান; ৪. রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন; এবং ৫. রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থা। আলোচনা ও অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় রাজনীতি ও সুশাসনের সাথে জড়িত বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে। যেমন—নির্বাচন, গণতন্ত্র, ক্ষমতার কাঠামো ও নতুন সামাজিক চুক্তির প্রয়োজনীয়তা। লেখকের ভাষ্যে, ‘পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে আলোচনা সীমিত রাখার উদ্দেশ্য হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের বিষয়ে সবিশেষ মনোনিবেশ করা এবং আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার স্তরের আলোকে লেখার কলেবর আয়ত্তের মধ্যে রাখা। সীমিত বিষয় বেছে নেবার একটি কারণ হলো এই যে, ইস্যুগুলি একে অপরের সাথে সম্পর্কিত বিধায় পুরো বিষয়টি নিয়ে একটা সুসংহত কাঠামো গড়া সম্ভব। আরেক কারণ হলো, এই বিষয়গুলো নিয়েই দেশের জনগণ নিত্যনিয়ত গ্রামের হাটে-ঘাটে, বাজারে তো বটেই এমনকি শহরের অভিজাত হোটেলের সেমিনারেও আলোচনা করে থাকেন। নিত্যনিয়ত রাজনীতি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে যে তর্ক-বিতর্ক চলছে সেই বিতর্ক ঘুরেফিরে এগুলি নিয়েই হচ্ছে। এ কারণেই এ বিষয়গুলো বর্তমানে সমাজের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক।’ লেখক আবদুল আউয়াল মিন্টু দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন ব্যবসায়ী হওয়ায় এবং এফবিবিসিআই-এর মতো একটি সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক সংগঠনের দুই মেয়াদে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে অনিবার্যভাবেই, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিমন্থরতার কারণগুলো সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ করতে হয়েছে গভীরভাবে, তিনি এসব কারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এ গ্রন্থে। রাজনীতি, রাজনৈতিক তত্পরতা ও অস্থিরতা, নেতৃত্ব, আইনের শাসন, প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ কেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সে বিষয় বিশ্লেষণ করার প্রয়াস পেয়েছেন তিনি। কেবল উপরিতল অবলোকন করে ভাসা ভাসা ধারণা নয়, সমস্যার গভীরে অনুসন্ধানী দৃষ্টি ফেলে এর অন্তর্নিহিত কারণ আবিষ্কার এবং সমাধানের পথও খুঁজেছেন এই বইয়ের মাধ্যমে। মোদ্দা কথা, আর্থ-সামাজিক অঙ্গনে যেসব সংস্কারের প্রয়োজন সেসবের একটা সর্বাঙ্গীন কৌশলগত চিন্তাভাবনার গুরুত্বের ওপর উজ্জ্বল আলোকপাত করাই এই বইয়ের মূল উদ্দেশ্য। পরিশেষে বলা যায়, ‘বাংলাদেশ : রাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি’ বইটিতে বেশকিছু বিতর্কিত বিষয় ও অভিমত থাকলেও বুদ্ধিদীপ্ত পাঠক তার বুদ্ধি, বিবেচনা ও যুক্তির ছাঁকনিতে ছেঁকে এ বইটি পাঠে উপকৃত হবেন।