অর্থ পাচার আফ্রিকার অর্থনীতির বড় শত্রু!

আপডেট : ০৯ মে ২০১৪, ১৯:৪২
পাচার হওয়া অর্থের সিংহভাগই অর্জিত হয় অবৈধভাবে এবং স্থানান্তরিত হয় মূলত অন্যত্র ব্যবহারের জন্য। সাধারণত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডই এসব অর্থের উত্স হয়ে থাকে। এ তালিকায় আছে ঘুষ, দুর্নীতি, কর ফাাঁকি ও চোরাচালান। জবাবদিহি করার ভয়ে অপরাধীরা যতোটা দ্রুত সম্ভব অর্থ পাঠিয়ে দেয় ভিন দেশে। সচরাচর যা ঘটে তা হচ্ছে, প্রথমত ঠিকানা হয় আফ্রিকার অন্য কোনো দেশ তথ্যটা শোনার পর যে কারোরই চমকে যাওয়াটা স্বাভাবিক। ১৯৭০ থেকে ২০০৯, এ-সময়ে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার হয়েছে ১.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ অংকটা একই সময়ে ওই মহাদেশে আসা বিদেশি সাহায্যের চেয়ে বেশি এবং বিদেশি ঋণের পাঁচ গুণ। আন্তর্জাতিক মন্দা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকা থেকে অর্থ পাচার কমেনি। এ অবস্থায় ইথিওপিয়ার শহর বাহার দারে গত সপ্তায় সম্মেলনে বসেছিল আফ্রিকার নেতারা। এর আয়োজক ছিল আফ্রিকার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট টানা হাই লেভেল ফোরাম নামক একটি বেসরকারি সংগঠন। উদ্দেশ্য— সম্মিলিত উদ্যোগে দেশের বাইরে অবৈধভাবে অর্থ পাচার প্রতিরোধ করা। ১৯৭০ সাল থেকে এ মহাদেশে গড়ে প্রতিবছর অর্থ পাচার বৃদ্ধি পেয়েছে ১২.১ শতাংশ হারে। এ দুষ্কর্মটি সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোয় সবচে’ বেশি ঘটছে ঠিকই, কিন্তু মহাদেশের অন্য কোনো দেশও মুক্ত নয়, এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকাও। বলার অপেক্ষা রাখে না, পাচার হওয়া অর্থের সিংহভাগই অর্জিত হয় অবৈধভাবে এবং স্থানান্তরিত হয় মূলত অন্যত্র ব্যবহারের জন্য। সাধারণত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডই এসব অর্থের উত্স হয়ে থাকে। এ তালিকায় আছে ঘুষ, দুর্নীতি, কর ফাাঁকি ও চোরাচালান। জবাবদিহি করার ভয়ে অপরাধীরা যতোটা দ্রুত সম্ভব অর্থ পাঠিয়ে দেয় ভিন দেশে। সচরাচর যা ঘটে তা হচ্ছে, প্রথমত ঠিকানা হয় আফ্রিকার অন্য কোনো দেশ। সেখানেও নিরাপদ না মনে করলে চূড়ান্ত ঠিকানা হয় পশ্চিমা বিশ্বের কোনো দেশ, যেখানে নির্বিঘ্নে বিনিয়োগ করা যায়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মোট দেশজ উত্পাদন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর সংগ্রহ ও বিনিয়োগ প্রবাহের উপর। ফলশ্রুতিতে আফ্রিকা থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী কমানো যাচ্ছে না দরিদ্র লোকের সংখ্যা, বাড়ছে আয়ের অসমতা এবং নষ্ট হচ্ছে চাকরি সৃষ্টির সম্ভাবনা। কেনিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ডক্টর নুগুনা নদুগনু এ ব্যাপারে জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও শিল্পের বিস্তারের অনুপস্থিতিতে আফ্রিকার অধিকাংশ দেশে বেকারত্বের হার খুবই উচ্চ এবং সহসাই তাতে নাটকীয় কোনো পরিবর্তন আসবে না। কিছু বিশ্লেষক বলছেন, আফ্রিকার একেকটি দেশ থেকে আসলে কী পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে তা কিছুতেই বের করা সম্ভব না। ফিগার দাঁড় করানো হচ্ছে অনুমানের ভিত্তিতে। তবে অনুমানের চেয়ে কম যে হবে না তা নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায়। মাদক ব্যবসা এবং অবৈধভাবে সামুদ্রিক সম্পদ ও মাছ বিক্রিতে ঠিক কী পরিমাণ অর্থ আদান-প্রদান হচ্ছে, সে সম্পর্কে অনেকের হয়তো ধারণাই নেই— এ কথা বলেছেন সোমালিয়ার আধা-স্বায়ত্তশাসিত পান্টল্যান্ড অঞ্চলের নতুন প্রেসিডেন্ট আব্দিওয়েলি মোহাম্মেদ আলি। তাঁর তথ্যানুসারে, শুধু অবৈধভাবে মাছ ধরার কারণেই সোমালিয়া বছরে ৮০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলার বঞ্চিত হচ্ছে। এ অর্থ সোমালিয়ার স্থলভাগেই ঢুকে না। আব্দিওয়েলি সোমালিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট। ২০০০ থেকে ২০০৯, এ সময়ে নাইজেরিয়া থেকে অর্থ পাচার হয়েছে কমপক্ষে ২৫০ বিলিয়ন মার্কিন। যারা কি-না আফ্রিকার বৃহত্ অর্থনীতির বিবেচনায় সম্প্রতি শীর্ষ স্থানটি দখল করেছে। দ্বিতীয় বৃহত্ অর্থনীতির দক্ষিণ আফ্রিকা অর্থ পাচারের প্রশ্নেও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। একই সময়ে যাদের ক্ষতি ১৭০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। মিসর, আলজেরিয়া, লিবিয়া, মরক্কো, এ্যাঙ্গোলা, সুদান ও ক্যামেরুন রয়েছে যথাক্রমে এর পরের অবস্থানগুলোয়। নাইজেরিয়ার ইকোনোমিক এন্ড ফিনান্সিয়াল ক্রাইমস কমিশনের (ইএফসিসি) সাবেক সভাপতি নুহু রিবাদু বলেছেন, ‘নাইজেরিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত অর্থ পাচারের প্রবণতা যে খুবই বেশি তা অস্বীকার করার জো নেই। বিশ্বায়নের সুযোগে এটি আরো অধিকহারে ঘটছে। তবে এটিও ঠিক যে, আমরা বাইরে চলে যাওয়া অনেক অর্থ উদ্ধার করেছি। যেমন, সাবেক সামরিক স্বৈরশাসক সানি আবাচার বিদেশি ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি।’ মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানী ও অন্যান্য অসাধু ব্যবসায়ীই শুধুমাত্র দায়ী নয়, অর্থ পাচারের পরিমাণের বিচারে আফ্রিকার অনেক দেশে তাদেরকে হার মানিয়ে দেয় রাজনৈতিক নেতারা। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এ সম্পর্কিত খবরাখবর গোপন থাকলেও পরবর্তীতে ঠিকই প্রকাশ পায়। রিবাদুর মতে আফ্রিকার প্রত্যেকটি দেশেরই প্রয়োজন সত্ ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রাজনৈতিক নেতা, যারা কোনো ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মকে প্রশ্রয় দেবেন না। নইলে অর্থের অবৈধ বহিঃপ্রবাহ কিছুতেই বন্ধ করা যাবে না। সেইসঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বকে বোঝাতে হবে, তারা অর্থ সাহায্য দিয়ে যতোটা না উপকার করছেন তার চেয়ে ঢের বেশি ক্ষতি করছেন অর্থ পাচারের সুযোগ করে দিয়ে। নইলে আফ্রিকা থেকে দারিদ্র্য অনেক আগেই দূর হয়ে যেতো। আফ্রিকার অর্থ পাচার রোধে সবচে’ সোচ্চার মনে হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট থামো এমবেকিকে। তিনি এ ব্যাপারে নানা দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সাহায্য কামনা করেছেন। কেননা অর্থ পাচার তাঁর দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক কমিয়ে দিচ্ছে। তা না হলে হয়তো চীনের মতোই ডাবল ডিজিটে পৌঁছুতো তাদের প্রবৃদ্ধি। —আল জাজিরা ওয়েবসাইট অনুসরণে