দ্বীপ চরের সংগ্রামী জীবন

উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও পিছিয়ে

আপডেট : ০৯ মে ২০১৪, ১৯:৪২
তিন সন্তানের জননী রোকেয়া খাতুন আগাছা পরিষ্কার করছেন বাদাম ক্ষেতের। কয়েকদিন বৃষ্টি না হলে অনেক কষ্টের এ ফসল হয়তো তিনি আর তুলতে পারবেন না, কারণ চর অঞ্চলে নেই সেচ সুবিধা। প্রশ্ন করা হলে ম্লান হেসে জবাব দিলেন, ‘আল্লাহই ভরসা, চরের জীবন এমনই’। হঠাত্ অসুস্থ হলে উপায় কী? জবাব ঐ একটাই। রোকেয়া খাতুনের মতো অশীতিপর জবেদা খাতুন কিংবা ২৫ বছর বয়সী রুবিনা, বুলবুলি সবাই বললেন একই কথা। দেশের অনেক দ্বীপ চরের জনগোষ্ঠীর মতোই পাবনার পাইখন্ডের অতিদরিদ্র মানুষরা জানে না নাগরিক সুবিধা কী, কিংবা শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক সুযোগগুলোইবা কী? ভূ-প্রকৃতিগত কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক কঠিন হওয়ায় মূল ভূখণ্ডের অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত এরা। খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, ক্ষমতায়ন সবদিক দিয়েই দুর্গম চরের মানুষরা এক নাজুক অবস্থায় রয়েছে। প্রকৃতির নির্মমতায় নদী ভাঙ্গনের ফলে নেই স্থায়ী বাসস্থান। ফলে কোন এনজিও তাদেরকে ঋণ দিতে আগ্রহী হয় না। চরম দারিদ্র্য, কর্মহীনতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানারকম বঞ্চনার সঙ্গেই তাদের নিত্যসঙ্গী। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে দেশের বিস্তীর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল এখনও সবচেয়ে অবহেলিত এক জনপদ হিসেবে চিহ্নিত। এ কারণেই চরাঞ্চলের অতিদরিদ্ররা যেমন উন্নয়ন বঞ্চিত তেমনি উন্নয়নের মূলধারাতেও তারা সংযুক্ত হতে পারেনি। বিভিন্ন গবেষণামূলক তথ্যে দেখা গেছে দেশের প্রায় ৩২টি জেলার ১০০ উপজেলার অংশবিশেষ চরাঞ্চল। প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষ চরে জীবনব্যাপী বহুবিধ ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে। উত্পাদনমুখী কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় বছরের একটা বড় সময় ধরে কর্মহীনতা দ্বীপ চরবাসীর খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে বড় এক অন্তরায়। কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, ৭০ শতাংশ চরবাসীর বসবাসের জন্যে কোনো নিজস্ব জায়গা-জমি নেই। ৯৮ ভাগ চরবাসী এক বা একধিকবার নদী ভাঙ্গনের শিকার। অন্তত ৮৫ ভাগ গর্ভবতী নারী গর্ভকালীন বা প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। বিভিন্ন সমস্যার কারণে ৫৬ ভাগ চরের শিশু নিয়মিত স্কুলে যায় না। ৭৯ ভাগ অতিদরিদ্র চরবাসী সরকার প্রদত্ত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত। দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনধারণে সহযোগিতা করতে নানা ধরনের নিরাপত্তামূলক এবং জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বাজেটে প্রতিবছর বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু বিগত তিনটি অর্থ বাজেটে চরের অতিদরিদ্র মানুষের সার্বিক জীবন মান উন্নয়নে আলাদা করে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়নি। এ বিষয়ে ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্সের চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, তিন বছর আগে ২০০৯-১০ এবং ২০১০-১১ অর্থবছরে চরের মানুষের জন্যে সুনির্দিষ্টভাবে বরাদ্দ ছিল। সে সময় চরাঞ্চলের দারিদ্র্য নিরসনে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে ছিল দুর্যোগ মোকাবিলা ও খাদ্য নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম। এছাড়া চরে বসবাসরতদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ও সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি ছিলো। এরমধ্যে চরজীবিকায়ন, আশ্রয়ণ, ন্যাশনাল নিউট্রিশন, ইকোনমিক ইমপাওয়ারমেন্ট অব পুওর, উত্তরাঞ্চলে হতদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান, স্কুল ফিডিং এসব প্রকল্প উল্লেখ ছিল। এদিকে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাজেট কলেবর বৃদ্ধি পেলেও বণ্টন প্রক্রিয়া সুসমন্বিত না হওয়ায় তার সুফল দুর্গম চরের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী পাচ্ছে না। মূল ভূমির অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি সুবিধার আওতায় আসলেও চরাঞ্চলের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ২০ থেকে ২৫ শতাংশের বেশি মানুষ এই সুবিধাসমূহ পাচ্ছে না। এজন্য অবশ্য বাস্তব কিছু কারণও রয়েছে। এ ব্যবধান কমিয়ে চরের মানুষের সার্বিক উন্নয়নে জাতীয় পর্যায়ে একটি চর ফাউন্ডেশন কিংবা চর বোর্ড গঠন করার পাশাপাশি একটি চর উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। চরাঞ্চলে উন্নত ও যুগোপযোগী কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে কৃষি সম্প্রসারণ সেবা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। সেইসাথে চরাঞ্চলে মা ও শিশু মৃত্যু কমিয়ে আনতে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন। পাবনার বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের পাইখন্ড চরবাসীরা জানান, গেলো বছর গুলজারের স্ত্রী আসমা সন্তান হবার সময় মারা গেছেন। স্বাস্থ্য সেবার জন্য সুদূর উপজেলায় পৌঁছাতে সারাটি দিন পার হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, কোন মুমূর্ষু রোগীকে প্রাথমিক সেবা দেয়ার মতো কোন ব্যবস্থা নেই। বিশুদ্ধ পানির কিছু ব্যবস্থা থাকলেও অধিকাংশ বাড়িতে নেই স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা। চরাঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমকে আরো গতিশীল ও সার্বিক মানোন্নয়নের লক্ষ্যে চর উপযোগী অবকাঠামো নির্মাণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। হতদরিদ্র্র হবার কারণে সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভিজিডি, বয়স্ক ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতার মতো বিষয়গুলো চরের অতিদরিদ্র মানুষের জন্যে বিশেষ কোটা সংরক্ষণ ও নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারের স্বাস্থ্য সেবার আওতায় চর এলাকায় সমপ্রসারণ করা প্রয়োজন। সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি অর্জনে আমাদের শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমিয়ে আনতে দেশের চর এলাকার স্বাস্থ্যসুবিধা বাড়াতে হবে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা বিষয়ক কার্যক্রমে চরের অতিদরিদ্রদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন।