শিশুর পায়ে শিকল

আপডেট : ০৯ মে ২০১৪, ২১:৫২
শিকল বাঁধা দাস প্রথা বিলুপ্ত হয়নি এখনও। অবিশ্বাস্য হলেও এই ঘটনা এখন হরহামেশা দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে শরীয়তপুরের একটি মাদ্রাসার শিশু শিক্ষার্থীদের শিকল বাঁধা ছবি ছাপা হয়েছে। এতিমখানার শিশু ছাত্ররা যাতে পালিয়ে যেতে না পারে সে জন্যই নাকি এই বর্বর ব্যবস্থা। এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। শিশুরা হচ্ছে জাতির ভবিষ্যত্ এবং একইসঙ্গে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশ। শিশুর প্রতি ব্যবহারে সর্তকতা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আজকের শিশু জাতির সোনালি ভবিষ্যতের স্থপতি। সুন্দর কল্যাণকর জাতি গঠনের জন্য প্রয়োজন এমন সুন্দর পরিবেশ যেখানে জাতির ভবিষ্যত্ স্থপতিগণ সকল সম্ভাবনাসহ সুস্থ, স্বাভাবিক ও স্বাধীন মর্যাদা নিয়ে শারীরিক, মানসিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক এবং সামাজিকভাবে পূর্ণ বিকাশ লাভ করতে পারবে। এজন্য প্রয়োজন শিশুর অধিকার সংবলিত উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং তার সফল বাস্তবায়ন। দেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শিশুদের জন্য সুষ্ঠু কার্যক্রম গ্রহণ অপরিহার্য। প্রত্যেক শিশুকে দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় সকলের অংশগ্রহণ একান্ত বাঞ্ছনীয়। জাতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে শিশুদের উন্নয়নের সার্বিক কার্যক্রম অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (অনুচ্ছেদ-৩৪, শিশু আইন) মতে, শিশুর হেফাজতের দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি শিশুটির প্রতি কোনো অমানবিক আচরণ করতে পারবে না বা শিশুটিকে অরক্ষিত অবস্থায় কোথাও ফেলে রেখে যেতে পারবে না এবং এ ধরনের অবহেলার মাধ্যমে যদি শিশুটির ক্ষতি হয় তাহলে সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে শিশু আইনে বিবেচিত হবে। প্রতিটি শিশুই জন্মের পর যথাযথ সেবা পাবার অধিকারী। শিশুরা একটি জাতির ভবিষ্যত্ কর্ণধার বিধায় শিশুর প্রতি যত্ন নেবার ব্যাপারে দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিটি ব্যক্তিকেই শিশুর বিকাশে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবার ব্যাপারে সর্তক হতে শিশু আইনের এ ধারাটি নির্দেশনা দেয়। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারলে আজকের শিক্ষার্থীরা দায়িত্ব নিতে পারবে ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের। কিছু কিছু ঘটনাকে শুধু বর্তমানের মধ্যে সীমিত ভাবলে ভুল ভাবা হয়। শিক্ষার মতো ক্রমবিকাশমান ক্ষেত্রটির বেলায় একথা শতভাগ প্রযোজ্য। কারণ এক্ষেত্রের বাধা-বিপত্তি, ত্রুটি-বিচ্যুতির মধ্যে ভবিষ্যতের বিপদ-আশঙ্কা লুকোনো থাকে। আমাদের দেশে এক সময় উন্মত্ত মানসিক প্রতিবন্ধী বা বদ্ধ পাগলদের শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। যুগের বিবর্তনে এখন বদ্ধ পাগলদেরও বেঁধে রাখা হয় না। তাদের পাঠানো হয় মানসিক হাসপাতাল বা চিকিত্সালয়ে। দেশের কোনো কোনো মাদ্রাসায় শিশুদের শিক্ষাদানের বদলে মানসিক প্রতিবন্ধী বানানোর যে কসরত চলে ভেদরগঞ্জে ছয়-সাত বছরের শিশু শিক্ষার্থীদের শিকলবদ্ধ করে রাখা তারই প্রমাণ। শুধু আমাদের দেশে নয়, মাদ্রাসার শিশু ছাত্রদের শিকল পরানোর নির্দয়তা রয়েছে অনেক অর্ধসভ্য দেশে। বিশ্বের কোনো কোনো দেশে উগ্রবাদী মানসিক প্রতিবন্ধীদের উত্থানে শিকলে বাঁধা শিক্ষাজীবনের ভূমিকা চোখে পড়ার মতো। রাসুল (সা) শিশুদের ভালোবাসতেন। শিশুদের ভালোবাসা রাসুল (সা)-এর সুন্নত। শিশুদের শিকলে বাঁধাকে যাঁরা কর্তব্য বলে বেছে নিয়েছেন তাঁদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার যোগ্যতা সম্পর্কেই সংশয় থেকে যায়। শিশুদের শিকলে বেঁধে রাখা তাদের মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এটি দেশের প্রচলিত আইনেও দণ্ডনীয় অপরাধ। বর্তমান সময়ে কিছু কিছু মাদ্রাসার বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কতিপয় শিক্ষকের কাছে মানবাধিকার কিংবা আইনের হয়তো কোনো মূল্য নেই; কিন্তু প্রশাসনের নাকের ডগায় শিশুদের শিকলে বেঁধে রাখা হয় কীভাবে? তাদের কুম্ভকর্ণের ঘুম মোটেও প্রত্যাশিত নয়। ঢাকা