মানবকল্যাণে চুয়েট শিক্ষার্থীদের যত উদ্ভাবন

আপডেট : ০৯ মে ২০১৪, ২২:৪৭
একাডেমিক পড়াশোনার ব্যস্ততার মধ্যেই মানবকল্যাণে বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) শিক্ষার্থীরা। তরুণ এই শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, তাদের উদ্ভাবিত এসব প্রযুক্তি একদিন স্থান পাবে বিশ্ববাজারে। চুয়েট শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবিত এমন কয়েকটি প্রযুক্তি নিয়েই এ প্রতিবেদন। ১. গাইডেন্স সিস্টেম ফর ভিজুয়ালি ইমপ্যারড পারসনস এটি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পথ বাতলে দেয়ার পদ্ধতি। এটি মূলত একটি ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র ও স্মার্ট ফোনের একটি অ্যাপের সমন্বয় যার সাহায্যে দৃষ্টিহীন ব্যক্তি নির্বিঘ্নে পথ চলতে পারবে। ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রটির মধ্যে রয়েছে হেলমেট সদৃশ একটি বিশেষ চশমা যা কিনা তার ব্যবহারকারীকে জানিয়ে দেবে সামনে কোন বাধা অছে কি না। আর যন্ত্রটি হাতে নিয়ে এর ব্যবহারকারী কোথায় যাবেন তা বললে মোবাইলের জিপিএস সুবিধা ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটি জানিয়ে দেবে কিভাবে নির্ধারিত স্থানে যেতে হবে। যন্ত্রটি তৈরি করেছেন চুয়েটের কম্পিউটার কৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের সানজিদুল হক, একই বিভাগের তৃতীয় বর্ষের রবিউল ইসলাম, তড়িত্ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী হাসিবুল জামিল ও একই বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র জাহিদুল ইসলাম বাঁধন। যন্ত্রটি সম্পর্কে উদ্ভাবক দলের সদস্য হাসিবুল জামিল বলেন, ‘দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা যাতে সমাজে আর দশজন মানুষের মত চলতে ফিরতে পারে, দেশের উন্নয়নে কাজ করতে পারে সেই প্রয়াস থেকেই এটি তৈরি করেছি। যন্ত্রটির ইলেক্ট্রনিক অংশটি তৈরিতে মাত্র তিন হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্মাতারা। ২. অডিয়েন্স ইন্টেলিজেন্স রিমোট মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট অ্যান্ড সার্ভিল্যান্স সিস্টেম (এয়ারমাস) প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ডাক্তাররা সাধারণত থাকতে চান না। ফলে রোগীদের চিকিত্সা সেবা না পাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ সমস্যার সাময়িক, অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী সমাধান করে দিতে পারবে চুয়েট শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবিত এয়ারমাস যন্ত্র। এটি একই সাথে রক্তচাপ, হূত্স্পন্দন ও শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করতে পারে। এটি পরিমাপ করেই কাজ শেষ নয় এ যন্ত্রের। যন্ত্রটি থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে চলে যাবে ওই এলাকার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত ডাক্তারের কাছে। সংশ্লিষ্ট ডাক্তার আবার ওই অ্যাপের মাধ্যমেই দিতে পারবেন রোগের ব্যবস্থাপত্র। ফলে একজন ডাক্তার যেমন অনেক বেশি রোগীর সেবা করতে পারবেন তেমনি চিকিত্সা সেবাও মানুষের জন্য সহজলভ্য হবে। তবে যন্ত্রটি চালানোর জন্য কিছু প্রশিক্ষণ এর প্রয়োজন হবে বলে মনে করেন যন্ত্রটির উদ্ভাবকেরা। এটি তৈরি করেছেন তড়িত্ কৌশল বিভাগের শেষ বর্ষের ইনসান আরাফাত জামিল, চতুর্থ বর্ষের তামজিদ হোসেন অর্ক, তৃতীয় বর্ষের ধীমান কুমার সরকার সাগর, চতুর্থ বর্ষের আলী রেজা গালীব। এটি তৈরিতে খরচ হয়েছে মাত্র ৮ হাজার টাকা। ৩. লং রেঞ্জ সার্ভে রোবট এটি একটি তথ্য সংগ্রহকারী রোবট। যেসব স্থানে মানুষের পক্ষে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ সেসব স্থানে এটি যেতে পারবে অতি সহজেই। দুর্ঘটনা কবলিত স্থান থেকে শুরু করে যুদ্ধবিধ্বস্ত স্থান—সবখানে এটি যেতে পারবে। শুধু তাই নয়, দুর্ঘটনাকবলিত কোন যানবাহন বা কারখানার ছবি, অগ্নিদগ্ধ স্থানের তাপমাত্রা, ক্ষতিকর গ্যাসের উপস্থিতি ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করে রোবটটি পাঠিয়ে দেবে দূরবর্তী স্থানে অবস্থানকারী এর ব্যবহারকারীর কাছে। এটি তৈরি করেছেন চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তৌকির আহমেদ খান রাফি। রোবটটি তৈরিতে মাত্র ৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান তৌকির। ৪. হিউম্যানয়েড রোবট এই রোবট দেখতে অনেকটা মানুষের মতই। দুই পায়ের উপর ভর করে এটি চলতে পারে। মানুষের মত কথা শুনে কাজও করতে পারে। এর বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটিকে বাংলাতেও দিকনির্দেশনা দেয়া যায়। ফলে বাসার ছোট্ট মেয়েটির খেলার সাথী হিসেবে যেমন কাজ করবে এই রোবট, তেমনি নিঃসঙ্গ বৃদ্ধারও সকল কাজে সহযোগিতা করতে পারবে এটি। রোবটটিকে পরবর্তী ভার্সন নিয়ে কাজ চলছে। যার মাধ্যমে উদ্ধার কাজও চালানো যাবে। এই ধরনের রোবটের ব্যবহার উন্নত দেশগুলোতে প্রচুর পরিমাণে হলেও উচ্চমূল্যের কারণে এদেশে এর ব্যবহার নেই। কিন্তু দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এবং বাংলা বুঝতে পারে—স্বল্পমূল্যের এমন রোবট খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে বিশ্বাস এর উদ্ভাবকদের। এটি তৈরি করেছে তড়িত্ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র রাকেশ ঘোষ, মো. শামসুল আলম সম্রাট, হাসিবুল জামিল এবং একই বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ধীমান কুমার সরকার ও জাহিদুল ইসলাম বাঁধন। রোবটটি তৈরিতে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান এর উদ্ভাবকেরা। ৫. রিমোট কন্ট্রোল্ড সাবমেরিন অনেক সময় দেখা যায়, দুর্ঘটনায় পড়ে সাগরে বা নদীতে তলিয়ে যায় মানুষসহ বহু মূল্যবান সম্পদ। সনাতনী ডুবুরীর সাহায্যে চালানো হয় উদ্ধারকাজ। ফলে উদ্ধারকাজ চলে ধীর অত্যন্ত ধীর গতিতে। আবার অনেক সময় সাগরের তলদেশে ছিঁড়ে যায় মূল্যবান সাবমেরিন ক্যাবল। এসব মেরামত করা মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এসব সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে চুয়েট শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবিত দূর নিয়ন্ত্রিত সাবমেরিন। এটি সাগরের গভীরে প্রদক্ষিণ করে দিতে পারবে সাগরের তলদেশের অনেক অজানা তথ্য। এটি উদ্ভাবন করেছেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আল-আমিন, তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাহিন চৌধুরী। এই উদ্ভাবনে সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন তড়িেকৗশল বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী অঙ্কন আরাফাত। নিজেদের উদ্ভাবিত এই সাবমেরিন সম্পর্কে উদ্ভাবক দলের সদস্য মো. আল-আমিন বলেন, ‘সাগরের তলদেশে নিখোঁজ বা হারানো অনেক জিনিস খুঁজে পেতে এটি সাহায্য করবে।’ সাবমেরিনটি তৈরিতে প্রায় দশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান এর উদ্ভাবকেরা।