গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান

আপডেট : ১০ মে ২০১৪, ১৯:০৩
মাধব রায় সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিদ্যা) ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট বল ও ক্ষমতা গত বৃহস্পতিবারে ছিলো পঁচিশে বৈশাখ, রবিঠাকুরের জন্মজয়ন্তী। অনুষ্ঠান রেখা একটা কবিতা আবৃত্তি করেছে— বল দাও প্রভু বল দাও। আকাশ বললো— আচ্ছা মামা, রবীন্দ্রনাথ কি ফুটবল প্লেয়ার ছিলেন ? কেনরে, রবীন্দ্রনাথ ফুটবল প্লেয়ার হতে যাবেন কেন ? তিনি তো কবি, বিশ্বকবি। ওই যে কবিতা লিখলেন ‘বল দাও প্রভু’। সবাই হাসলো আকাশের কথা শুনে। কমলা বললেন— এই বল তো ফুটবল না। তাহলে ? আকাশের এই বোকাবোকা কথাবার্তায় রেখা একটু মনক্ষুণ্ন হয়েছে। সে বললো— এটি হচ্ছে মনোবল। মনের জোর, মানসিক শক্তি। ঠিক তাই —বললেন নীলকান্তবাবু। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির মনের জোর অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছেন। রেখাকে বললেন— আকাশকে আর ধমকাসনে মা। সে মনোবলকে খেলার পর্যায় নামিয়ে নিয়েছে। তবে পদার্থবিজ্ঞানেও বল রয়েছে, যার ইংরেজি হলো ফোর্স (Force)। কিন্তু ফোর্সটা কী ? বললো আকাশ। সে রেখার ধমকানিতে একটু সংকুচিত। ফোর্স হলো এমন একটা রাশি, যা স্থির বস্তুর ওপর প্রয়োগ হলে বস্তুটি গতিশীল হয় বা হতে চায়,অথবা গতিশীল বস্তুর ওপর প্রয়োগ হলে বস্তুর গতির পরিবর্তন হয় বা হতে চায়। একটু বুঝিয়ে বলো মামা। বললো আকাশ। বলছি। শুরু করলেন মামা। ধর তুই ফুটবল খেলছিস অথবা খেলা দেখছিস। কর্নার কিক করলো মেসি। কিক করার আগে ফুটবলটা মাটিতে রাখা ছিলো। তখন ছিলো সেটি স্থির, কিক করার পর গতিশীল হলো। উড়ে এসে পড়লো গোলপোস্টের সামনে। সেখান থেকে অঁরি পা ছুঁইয়ে দিলো, চলে গেলো গোলপোস্টের জালে। সবাই বললো গোল। কিন্তু ফুটবলের সাথে ফোর্স বলের কী সম্পর্ক? সম্পর্ক হলো, যখন ফুটবলটি মাটিতে স্থির ছিলো, তখন মেসি পা দিয়ে কিক করে যা প্রয়োগ করলো,তা হলো বল বা ফোর্স। ফোর্স স্থির বস্তুকে গতিশীল করলো। ফলে ফুটবলটি গোলপোস্টের সামনে এসে পড়লো। আর অঁরি যখন পা ছুঁইয়ে দিলো তখন সেটি গতির দিক পরিবর্তন করে গোলপোস্টে ঢুকে গেলো। পা ছুঁয়াতে না পারলে ফুটবলটি চলে যেতো মাঠের বাইরে। মেসি স্থির ফুটবলে কিক করে যা প্রয়োগ করলো, অথবা অঁরি চলন্ত ফুটবলে পা ছুঁইয়ে যা প্রয়োগ করলো, তাই হচ্ছে বল বা ফোর্স। বুঝলি? আকাশ কিছু বলছে না, মাথা ঝাঁকাচ্ছে। মানে হলো বুঝতে পেরেছে ? এত সুন্দর ব্যাখ্যায় সবাই বুঝে ফেলেছে। বিন্দু বললো সেও বুঝেছে। বলো দেখি কী বুঝেছো। বললো আকাশ। বিন্দু বললো, ফোর্স বা বল মানে হলো লাথি। হাসলো সবাই। নীলকান্তবাবু বললেন— না, ফোর্স মানে লাথি নয়। লাথি দিয়ে ফোর্স প্রয়োগ করা হলো। যদি একটা বস্তুকে নাড়াতে না পারি তাহলে কি ফোর্স প্রয়োগ করা হয়নি? বললো আকাশ। হয়েছে। হবে না কেন ? মামা ব্যাখ্যা করলেন— ধর তুই একটা টেবিলে ফোর্স প্রয়োগ করলি, কিন্তু টেবিলটা সরলো না। তাহলেও ফোর্স প্রয়োগ হলো। কিন্তু তুমি যে বললে স্থির বস্তু গতিশীল হবে। টেবিল না সরলে তো গতিশীল হলো না, তখন তো ফোর্স প্রয়োগ হলো না। নীলকান্তবাবু বললেন, ফোর্স ঠিকই প্রয়োগ করা হলো। ওই যে বললাম, স্থির বস্তু গতিশীল হয় বা হতে চায়। টেবিল গতিশীল হয়নি, ফোর্স কম ছিলো বলে। তুই আরেকটু বাড়িয়ে দে ফোর্স, তাহলেই তো টেবিলটা সরে যাবে। কথা হলো তুই গতিশীল হবার জন্য প্রয়োজনীয় ফোর্স প্রয়োগ করতে পেরেছিস কি না। কম হলে বস্তু গতিশীল হবে না। কিন্তু ফোর্স বা বল প্রয়োগ ঠিকই হলো। কিন্তু বলের একক কী ? বললেন কমলা। আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে বলের একক হলো নিউটন। নিউটন তো একজন বিজ্ঞানীর নাম। বললেন কমলা। তিনি কর্মাস গ্র্যাজুয়েট হলেও নিউটনের নাম জানেন। হ্যাঁ, তাঁর নামেই এই এককের নাম রাখা হয়েছে। তাহলে এক নিউটন বল কতটুকু ? চন্দ্রা বললো। যে পরিমাণ বল এক কিলোগ্রাম ভরের বস্তুর ওপর প্রয়োগ করা হলে এক মিটার পার সেকেন্ড স্কয়ার ত্বরণ সৃষ্টি হয়, সেই পরিমাণ বল হলো এক নিউটন বল। আরেকটু বুঝিয়ে বলো মামা। বললো আকাশ। নীলকান্তবাবু ভাবনায় পড়লেন। একে কীভাবে আরো সরল ব্যাখ্যা দেয়া যায়। তিনি একটু চুপ করে থেকে বললেন, আচ্ছা তুই কি ওজন বুঝিস ? হ্যাঁ বুঝবো না কেন ? সেদিন স্যান্ডউইচ আনলে। প্যাকেটের ওজন তো অনেক বেশি ছিলো। আমি বললাম পাঁচ কেজি। অণুদা বললো দুই কেজি হবে। না না, ঠিক তা নয়। কেজি আসলে ওজন নয়। কেজি হলো ভরের একক, মানে বস্তুর ভিতরে কতটুকু পদার্থ রয়েছে। আর ওজন ? ওজন হলো ঐ বস্তুকে পৃথিবী যে ফোর্স দিয়ে টানে। একশ গ্রামের বাটখারা চিনিস ? চিনবো না কেন ? বললো আকাশ। একশ গ্রামের একটা বাটখারাকে পৃথিবী প্রায় এক নিউটন বল দিয়ে টানে। এটি মাটি থেকে উপরে উঠাতে যে ফোর্স লাগবে তার পরিমাণ মোটামুটি এক নিউটন। সবাই খুশি হলো এই উদাহরণে। আকাশ আরেকটু বেশি বুঝতে চায়। সে বললো, অন্য পদ্ধতিতে বলের এককের নাম কী মামা ? নীলকান্তবাবু বললেন— সিজিএস পদ্ধতিতে বলের একক ডাইন, আর এফপিএস পদ্ধতিতে পাউন্ডাল। তখনো কি একশগ্রাম ভরের বাটখারা উঠাতে হবে ? না, একশগ্রাম ভরের বাটখারা উপরে উঠালে বল হবে আটানব্বই হাজার ডাইন। এতো বেশি ? হ্যাঁ, বললেন মামা। আর এক পাউন্ড ভরের বস্তুকে উপরে উঠালে হবে বত্রিশ পাউন্ডাল। সংখ্যাটাকে মনে রাখতে চেষ্টা করলো আকাশ।