চলতি বছর উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় এক মাসের বেশি সময় পার হলেও ঘটনার কোন ‘কূল-কিনারা’ করতে পারছে তদন্ত কমিটি। অপরাধীদের নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পারেনি আন্তঃমন্ত্রণালয় এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ড গঠিত কমিটি। কোন প্রক্রিয়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে তাও উদঘাটন করতে পারছেন না তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময়সীমা বাড়িয়ে নিয়েছে কমিটি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে প্রক্রিয়ায় তদন্ত চলছে তাতে এখন পর্যন্ত মূল অপরাধীদের শনাক্ত করা যায়নি। এ সপ্তাহের মধ্যেও তা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায় না।
তদন্ত কমিটির এক সদস্য জানান, জালিয়াত চক্র আধুনিক প্রক্রিয়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। এজন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও র্যাবের ইন্টেলিজেন্স টিমসহ বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা নেয়া হচ্ছে।
গত ৩ এপ্রিল এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রায় প্রতিটি পরীক্ষার আগের দিন প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষার আগের দিন ৯ এপ্রিল প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়। পরীক্ষার্থীদের হাতে হাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পাওয়া যায়। ফেসবুকেও প্রশ্নপত্রের কপি পাওয়া যায়। জানা যায়, পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত দুই সেট প্রশ্নই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় পরীক্ষা বাতিল করা হয়। এর পরে পদার্থ বিজ্ঞান প্রথমপত্র ও দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষার আগে ফেসবুকে সাজেশন আকারে ছড়িয়ে পড়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। ঐ সাজেশনে বেশ কিছু প্রশ্ন থাকলেও শুধু স্টার মার্ক করা প্রশ্নগুলোই পরীক্ষায় এসেছে। এই দুইটি পরীক্ষা বাতিল করা হয়নি।
ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও অর্থ) সোহরাব হোসাইনকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যবিশিষ্ট উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আন্ত:মন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (কলেজ), যুগ্ম সচিব (মাধ্যমিক), মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও কলেজ) এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক।
এ কমিটির প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের সার্বিক বিষয় তদন্ত করে পরবর্তী করণীয় এবং দেশের সব পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করার কথা রয়েছে।
এছাড়া এক ঘটনা তদন্তে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ কমিটিরও ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সোহরাব হোসাইন বলেন, তদন্ত কাজ এগিয়ে চলছে। নির্ধারিত সময়ে তদন্ত আশানুরূপ এগোয়নি বলে আরো ১৫ দিন সময়সীমা বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মূল অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের হাতে যতগুলো ক্লু আছে সব নিয়েই তদন্ত করছি। বিটিআরসিসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দেয়ার পর তারাও সহায়তা করছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে অগ্রগতি জানা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
একাধিক সূত্র জানায়, শুধু এইচএসসি নয়, বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে তদন্ত কমিটি। আগের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার সাথে এ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার যোগাযোগ থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এজন্য পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন, প্রস্তুত, সরবরাহ এবং সংরক্ষণের সাথে যারা জড়িত তাদের সকলকেই তদন্তের আওতাধীনে রেখেছে কমিটি। এজন্য যত প্রকারে প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে পারে তার সবগুলো বিচার করা হচ্ছে।
এসএসসি, এইচএসসি ও জেএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রথমে বিষয়ভিত্তিক নির্বাচিত পরীক্ষকদের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করা হয়। তাদের প্রস্তুতকৃত প্রশ্নগুলোর মধ্য থেকে বাছাই করে মডারেশন বোর্ড চারটি সেটের জন্য প্রশ্ন তৈরি করে। দীর্ঘদিন ধরে সুনাম ও বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে যারা কাজ করেছেন তাদেরকেই এই মডারেশন বোর্ডে দায়িত্ব দেয়া হয়। বোর্ডের প্রণীত প্রশ্নপত্রের চারটি সেট শিক্ষা বোর্ডের সদস্যদের মাধ্যমে কঠোর গোপনীয়তায় সিলগালা অবস্থায় লটারির মাধ্যমে ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ ও ‘ঘ’ সেট নির্বাচিত করা হয়। ওই চারটি সেটের মধ্যে দুইটি বোর্ডে সংরক্ষণ করা হয়। আর বাকি দুই সেট প্রশ্নপত্র মুদ্রণের জন্য বিজি প্রেসে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষার নিয়ম রয়েছে।
মডারেশন বোর্ড প্রশ্ন প্রণয়ন করলেও সেখান থেকে প্রশ্ন ফাঁসের সম্ভাবনা খুব কম মনে করলেও সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না তদন্ত কমিটির সদস্যরা। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান তাসলিমা বেগমকে মডারেশন বোর্ডের সদস্যদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, মডারেশন পর্যায় থেকে হুবহু প্রশ্ন কমনপড়া প্রায় অসম্ভব। কমিটির মাধ্যমে প্রণয়ন করে তা বাছাই ও পরবর্তীতে লটারির মাধ্যমে প্রশ্ন নির্ধারণ করা হয়। ফলে কেউ জানেন না কোন প্রশ্নটি নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঐ কর্মকর্তা জানান, প্রশ্ন ফাঁসের জন্য সন্দেহের তীর বেশি বিজি প্রেসের দিকে। আগেও কয়েকজন কর্মকর্তা কর্মচারীর জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। এবারও এ প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত অন্তত দুই জনের নাম উচ্চারিত হচ্ছে। গত সপ্তাহে তদন্ত কমিটির সদস্যরা বিজি প্রেস পরিদর্শনও করেছেন।
মন্ত্রণালয় ও বোর্ড সূত্র জানায়, বিজি প্রেসে প্রশ্ন প্রস্তুত হওয়ার পর পরীক্ষা শুরুর আগেই তা পাঠিয়ে দেয়া হয় বিভিন্ন জেলা শহরে। সেখানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তা সংরক্ষিত থাকে। সেখান থেকে জেলা শহরে ট্রেজারি ও উপজেলাতে নির্ধারিত ভল্টে প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ করে রাখা হয়। প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগে যাচাইয়ের নির্দেশনা রয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কেন্দে র প্রধান, উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কঠোর গোপনীয়তায় তা তারা যাচাই করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি জেলাতে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ এসেছে। অনেক উপজেলায় তিনজনের পরিবর্তে দুই জন এবং কোথাও কোথাও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি না থেকে প্রতিনিধি প্রেরণ করার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন ফাঁসের কোন ঘটনা ঘটেছে কিনা কিংবা টাকার লোভে কোন এলাকায় কেউ এটি করেছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অনুমান নির্ভর তদন্ত!
দুই তদন্ত কমিটির কয়েকজন সদস্য জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ চিন্তিত হলেও সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়া যাওয়ায় তারা এখনও হতাশ। এখন পর্যন্ত তারা যত উপায়ে প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে তা যাচাই করছেন, কিন্তু কোন উত্স থেকে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে তা সনাক্ত করা যায়নি। এজন্য আরও আধুনিক উপায়ে কাজ করতে হবে বলে মনে করছেন তারা। এছাড়া অতীতে প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িতদের বিষয়ে তেমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নজির না থাকায়ও এ ঘটনার তদন্তে অগ্রগতির বিষয়ে হতাশ সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষা সচিব মোহাম্মদ সাদিক বলেন, ফেসবুকে প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে বুঝা যায়, যারা এ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত তারা অর্থের জন্য নয়, অন্য কোনো কারণে প্রশ্নপত্র ফাঁস করছে। ইতিমধ্যে ফেসবুকে এ ধরনের কয়েকটি পেজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
প্রশ্ন ফাঁস বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, এবারের প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষে যা কিছু করার, সবই করা হবে। দোষীদের শাস্তির বিষয়ে কোনো নমনীয়তা চলবে না। এছাড়া ভবিষ্যতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে কৌশলও নির্ধারণ করা হচ্ছে।
