ভোটারদের স্মার্ট কার্ড প্রদান সংক্রান্ত ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প রক্ষায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পের ঋণের টাকা ছাড়ের জন্য কমিশনকে আগামী জুনের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি ও বিধি সংশোধনের শর্ত জুড়ে দিয়েছে। সেই শর্তপূরণের চেষ্টা করছে কমিশন। আড়াই বছর আগে গৃহীত এ প্রকল্পে খাতা-কলমে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। তবে নির্বাচন কমিশন বলছে, অগ্রগতি হয়েছে ৫ শতাংশ। দৃশ্যমান অগ্রগতির অংশ হিসাবে বিদেশ সফরও শুরু হয়েছে। শর্ত পূরণ করতে না পারলে ঋণের টাকা ছাড়ের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করবে ইসি।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন বিধি সংশোধনীর প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু তারা কিছু বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে তা কমিশনে ফেরত পাঠিয়েছে। আশা করছি সোমবার (আগামীকাল) সংশোধনী প্রস্তাবটি আবার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের গৃহীত আইডিয়া নামের এই প্রকল্পের (আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহেন্সিং অ্যাক্সেস টু সার্ভিসেস) বাস্তবায়নের ব্যাপারে শুরুতেই অবহেলা ছিল। আড়াই বছরে মাত্র ১ দশমিক ৪৩ অগ্রগতি হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে জুনের মধ্যে প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশে তাদের অর্থে চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে আইডিয়া নামের প্রকল্পকে সবচেয়ে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রকল্পের অগ্রগতি জানতে আগামী মাসে বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশে আসছে। এ রকম পরিস্থিতিতে কাজের অগ্রগতি দেখাতে কমিশন গত ৩০ এপ্রিল স্মার্ট কার্ড তৈরি ও বিতরণের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। এছাড়া প্রকল্পের মূল কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য দুই মাস আগে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সাইটেল নামের স্পেনের একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়েছে।
এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব সিরাজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, জুনের মধ্যে প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে। তবে যে সময় আছে, তাতে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ হবে না। সে জন্য মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হবে।
বাংলাদেশ সরকার ২০১১ সালের ২১ জুলাই বিশ্বব্যাংকের সাথে এ সংক্রান্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এক হাজার ৩৭৯ কোটি টাকার চুক্তি স্বাক্ষর করে। শেষ করার কথা ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে। এর মধ্যে প্রকল্প-সাহায্য এক হাজার ৩৬৫ কোটি এবং সরকারের ১৪ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ওই সময় জানানো হয়, প্রকল্পটির মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল ডাটাবেজ এবং নেটওয়ার্ক তৈরি হবে যা সব নাগরিককে স্বচ্ছভাবে সেবা দেয়ার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাসমূহ সহজে ও দ্রুত ব্যক্তি পরিচয় নিশ্চিত করতে পারবে। প্রকল্পটি আনুমানিক ৯ কোটি অত্যাধুনিক জাতীয় পরিচয়পত্র ছাপাবে যা ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকদের দেয়া হবে। বিশ্বব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (আইডিএ) থেকে প্রাপ্ত সুদমুক্ত এই ঋণের মেয়াদ ১০ বছরের রেয়াতসহ ৪০ বছর।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছুটা বাধা হয়ে দাঁড়ায় বিশ্বব্যাংকের শর্ত। কমিশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের দুজন শিক্ষকের সহায়তায় ‘জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন-২০১০’ সংশোধন ও এ আইনের আওতায় বিধিমালার খসড়া করলেও বিশ্বব্যাংক তা গ্রহণে অসম্মতি জানায়। ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক নিবন্ধন আইন পর্যালোচনা করে বলেছিল, আইনটি মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থি। এতে নাগরিকের ধর্মীয় পরিচয় সংগ্রহের বিধান রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নাগরিকের তথ্য সরবরাহ করা হলে তাতে তাদের নিরাপত্তা এবং তথ্যের গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুতরাং, আইন ও বিধিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী না আনলে তারা ঋণের টাকা ছাড় করবে না। বিশ্বব্যাংকের তরফে কমিশনকে জানিয়ে দেয়া হয় তাদের শর্ত মেনে আন্তর্জাতিক মানের কোন আইন পরামর্শকের মাধ্যমে একাজ সম্পন্ন করতে হবে। এরপর এ কাজের জন্য বরাদ্দ ঋণ ছাড় করা হবে। সেই শর্ত মেনেই শ্রীলংকা বংশোদ্ভূত শ্রী রাজেস নীবাসনের মাধ্যমে আইন সংশোধনের কাজ সম্পন্ন হয়। এই শর্ত আরোপের পর প্রায় আড়াই বছর পার হলেও কমিশন বিধিমালা করার বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। সমপ্রতি কমিশন এ-সংক্রান্ত বিধি সংশোধন করে তার খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজের স্বার্থে নাগরিকের নাম, ঠিকানা, নিবন্ধন নম্বরসহ প্রাথমিক কয়েকটি তথ্য ছাড়া বাকি তথ্য প্রকাশ করা হবে না। মন্ত্রণালয় বিধি যাচাই-বাছাই করে কিছু বিষয়ে কমিশনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
অগ্রগতি না হওয়ার কারণ
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সময়মতো বিশ্বব্যাংকের শর্ত পূরণ না করা, তিন দফায় প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন এবং অযোগ্য কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়ার কারণেই আইডিয়ার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। শুরুতে এই প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনালের আখতারুজ্জামান সিদ্দিকী। মাঝে কয়েক মাসের জন্য ছিলেন সালিম আহমেদ খান। বর্তমানে প্রকল্প পরিচালক সুলতানুজ্জামান মো. সালেহ উদ্দীন। দুই প্রকল্প পরিচালক ছাড়াও প্রেষণে দায়িত্ব পালন করা আরও একাধিক কর্মকর্তাকে মাঝপথে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। আইডিয়া প্রকল্পের পরিচালক মো. মহসীন আলী ইত্তেফাককে বলেন, ৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। আশা করছি জুনের মধ্যে কিছু অগ্রগতি হবে।
অগ্রগতি দেখাতে বিদেশ সফর
নাগরিকদের ডেটাবেইজ-এর ব্যবস্থাপনা, বায়োমেট্রিক ফিচারসহ পরিচয়পত্র তৈরি ও বিতরণ, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং আপিলের অধিকারসহ এ সংক্রান্ত সেবার বিভিন্ন বিষয়ে ধারণা নিতেই তিন কমিশনারের নেতৃত্বে ৬টি দেশ সফরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। তাদের সঙ্গে রয়েছেন কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনালের (অব.) মো. জাবেদ আলী, কমিশন সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব জেসমিন টুলী ও আইডিয়ার উপ-প্রকল্প পরিচালক আবদুল বারী এরই মধ্যে ১৭ থেকে ২৮ এপ্রিলের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুর সফর করেছেন। এছাড়া গত ৬ মে যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ড সফর করে গেছেন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ, ভারপ্রাপ্ত সচিব সিরাজুল ইসলাম, জাতীয় পরিচয়পত্র বিভাগের পরিচালক মহসিন আলী ও উপ-সচিব আমজাদ হোসেন। আর ১৮ থেকে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সফর করবেন নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ, অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান, আইডিয়া প্রকল্পের পরিচালক সুলতানুজ্জামান মো. সালেহ উদ্দীন ও সিনিয়র সহকারী সচিব সাইফুল হক চৌধুরী।
