আমি জাতিসংঘ মহাসচিবকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। এমন চমত্কার একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত। আজকে সত্যিকার অর্থে বিজয়োত্সব। ঘরে, কর্মক্ষেত্রে, সমাজে এবং মা হিসেবে, বোন, স্ত্রী, কন্যা হিসেবে, নাগরিক ও নেতা হিসেবে সকল স্তরে নারীর জয়ের উত্সব আজ। আজকে আমরা বেইজিংয়ে মিলিত হয়েছি সকল নারী ও তাদের পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার, সকল মৌলিক ও মানবাধিকার ভোগের নিশ্চয়তা এবং নিজ দেশে রাজনীতিতে অংশগ্রহণে সমপূর্ণ স্বাধীনতার বিষয়ে সারাবিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য।
বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট বলছে, নারীরা যদি স্বাস্থ্যবান ও শিক্ষিত হয় তবে তাদের পরিবারগুলো সবল হবে। তারা যদি সহিংসতা থেকে বেঁচে যায় তবেই তাদের পরিবার সবল হবে, সমাজ যদি তাদের সমপূর্ণ এবং সমান উপার্জনের সুযোগ দেয় তবেই তাদের পরিবার সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে। আর পরিবার যদি সমৃদ্ধি অর্জন করে, তাহলে সমাজ এবং রাষ্ট্রও সমৃদ্ধি অর্জন করবে। গত পঁচিশ বছর যাবত্ আমি নারী, শিশু ও পরিবার বিষয়ে নিরলসভাবে কাজ করছি। আর গত আড়াই বছরে আমি আমার নিজ দেশে ও সারাবিশ্বে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধাগুলো অনুধাবন করার সুযোগ পেয়েছি।
আমি ভারত এবং বাংলাদেশের নারীদের সাথে কথা বলেছি, যারা গাভী কিংবা রিকশা কেনার জন্য, জীবনধারণের উপকরণ ক্রয়ের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে থাকে। আমি দক্ষিণ আফ্রিকার সেসব সংগ্রামী নারীদের সাথে কথা বলেছি যারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে।
আমি ইন্দোনেশিয়ার মায়েদের দেখেছি যারা পুষ্টি,পরিবার পরিকল্পনা ও শিশুর যত্ন নিয়ে কথা বলার জন্য প্রতিনিয়ত একত্রিত হয়। আমি বেলারুসের ডাক্তার ও নার্সদের সাথে কথা বলেছি, যারা মুমূর্ষু শিশুগুলোকে বাঁচানোর জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আজকের এ সম্মেলন তাদের কথাই বলছে, যাদের কাজ অগোচরেই থেকে যাচ্ছে, যাদের কথা কেউ শুনতে পাচ্ছে না।
সারাবিশ্বে শিশু ও কিশোরদের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক নারীরাই। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমরা কেউই এ মহান কাজটির মূল্যায়ন করছি না- না অর্থনীতিবিদেরা, না ইতিহাসবিদেরা, না আমাদের সংস্কৃতি, না আমাদের সরকারে নেতৃত্বদানকারীরা। একজন আমেরিকান হিসেবে আমি আমার দেশের নারীদের হয়ে কথা বলি- যারা সন্তান লালন করে, যারা ঘরে-বাইরে প্রতিনিয়ত সহিংসতার শিকার হচ্ছে। আমি সেসব নারীদের কথা বলতে চাই, যারা সন্তানকে ভাল স্কুলে দেয়ার জন্য সংগ্রাম করে, যারা হাসপাতালে সারারাত নির্ঘুম থেকে মানুষের সেবা করে।
আমাদের এটা বুঝা উচিত নারীরা কীভাবে জীবনযাপন করবে তার কোন নির্দিষ্ট ফর্মুলা নেই। এবং সেজন্যই পরিবার ও নিজের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে নারীর নিজস্ব পছন্দকে সম্মান দিতে হবে। প্রত্যেক নারীই তার সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর অধিকার রাখে। আমাদের এটাও অবশ্যই অনুধাবন করা উচিত, নারীর পূর্ণ মর্যাদা ততক্ষণ প্রতিষ্ঠা পাবে না, যতক্ষণ তার মানবাধিকার সম্মানিত ও নিশ্চিত হচ্ছে না।
আমাদের আজকের সম্মেলনের লক্ষ্য হল, পরিবার ও সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন অনেক বেশি শক্তিশালী করা। আর এটা তখনই সম্ভব হবে যখন নেতৃত্বদানকারী সরকার প্রধানেরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার সংরক্ষণের দায়ভার গ্রহণ করবে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হল, মানবাধিকার ভোগের ক্ষেত্রে বরাবর নারীরাই বঞ্চিত। কিন্তু আমার বিশ্বাস নীরবতা ভাঙ্গার এখনই মোক্ষম সময়। আজ আমি বেইজিংয়ে দাঁড়িয়ে বলছি, এটাই উপযুক্ত সময়, এখন আর মানবাধিকার আর নারী অধিকারকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
নারীর ইতিহাস নীরবতার ইতিহাস। এখনও আমাদের কণ্ঠরোধ করার জন্য অনেকেই তত্পর। কিন্তু আজকে আমাদের কথা সবাই শুনবে এবং বেশ স্পষ্টভাবেই শুনবে। আজকের সম্মেলনের একটিই মেসেজ (বার্তা)-মানবাধিকারই নারীর অধিকার, নারীর অধিকারই মানবাধিকার। চল আজকের এই সম্মেলনকে আমরা নিজেদের এবং সারাবিশ্বের জন্য কাজের আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করি। চল আমরা এ আহ্বানে সাড়া দেই, তাহলে আমরা এমন একটা পৃথিবী গড়তে পারব যেখানে নারীর সম্মান ও পূর্ণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা পাবে, যেখানে প্রত্যেক বালক-বালিকা সমান যত্ন ও ভালোবাসা পাবে। সবাইকে আবারও অসংখ্য ধন্যবাদ।
