আত্মহননের পথ ছেড়ে জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত আমিনা। পার্থিব জগতে বন্ধু, স্বজন বিহীন তাই উপার্জনের টাকায় মাথা গোঁজার জন্য নিজের একখন্ড জমি কেনা তার একমাত্র লক্ষ্য। প্রায় ৩৫ বছর আগে বা্ঙ্গালী গৃহবধু হিসেবে সুন্দর সংসার সাজাবার প্রত্যয়ে ১৫ বছর বয়সেই লাল শাড়ী পরে নাগেশ্বরীর বেরুবাড়ী বাজার এলাকার আলীমুদ্দিনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় একই ইউনিয়নের চিলমারী গ্রামের পিসু মামুদের বড় মেয়ে আমিনা। বিয়ের ৫ বছরে কোল জুড়ে আসে ১ ছেলে ২ মেয়ে। সুখ বেশিদিন টেকেনি তার কপালে। এক সময় স্বামীর নির্যাতনে স্মৃতিভ্রম ঘটলে সন্তানদের রেখে বাড়ী থেকে বেরিয়ে যায়। এ সুযোগে স্বামী আলীমুদ্দিন দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন সংসার বাঁধে। একসময় স্মৃতি ফিরে আসলে স্বামী সন্তানের টানে বাড়ী ফিরে এসে স্বামী-সতিনের নির্মম নির্যাতন সইতে না পেরে আবারও ঘর ছেড়ে বাবার বাড়ীতে আশ্রয় নেয়।
দিনমজুর বাবার পক্ষে তার ভরন পোষনের সামর্থ্য না থাকায় কয়েক মাসের মধ্যে হাজী পাড়া গ্রামের কাছুর সাথে তাকে দ্বিতীয় বারের মত বিয়ে দেন। আরেকবার সে স্বামী ও সংসারের মায়ায় জড়ায়। ইতোমধ্যে হঠাত্ একদিন শুনতে পায় কঠিন এক রোগে আক্রান্ত হয়ে তার ৩ সন্তানই মারা গেছে। সন্তান হারানোর কষ্ট বুকে চেপে রেখে দ্বিতীয় স্বামীর সাথে ৭ বছর সংসার করার পর এক সময় এ সংসারও ভেঙ্গে যায়। শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়ে অভাবী পিতার ঘরে না ফিরে সে আত্মহননের চেষ্টা চালাতে গিয়ে প্রতিবেশিদের সহযোগিতায় বেচে যান। এর পর আর বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন নিয়ে আত্মপ্রত্যয়ী আমিনা একই এলাকার আখতার গাড়ীয়ালের মেয়ে আমীরনের নাগেশ্বরীর সাতানী পাড়ার জায়গায় ঘর তুলে বসবাস শুরু করেন। প্রথমাবস্থায় প্রতিবেশিদের বাড়ীতে ঝি এর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু এভাবে আর কতদিন। নিজে কিছু একটা করার চিন্তায় অন্যের বাগানে কুড়িয়ে পাওয়া সুপারি বিক্রি আর যাকাত-ফেতরার ৩ শত টাকা জমিয়ে এক কাদি কলা কিনে ফেরি করে বিক্রি করেন। এ থেকে উপার্জিত অর্থে ব্যবসার প্রসার ঘটিয়ে শুটকি মাছ, পেয়াজ, মরিচ, লবন, তেল ডালিতে নিয়ে ফেরি করেন। এভাবে কিছুদিন চলার পরে আয় বৃদ্ধি পেলে সংসার চালানোর পরে জমানো অর্থে একটি রিক্সা ভ্যান তৈরী করে চা-চিনি, চকলেট, বিস্কুট থেকে শুরু করে তেল লবনের পাশাপাশি ব্যবসায় যুক্ত করেন শাক, সবজি, ডালসহ বিভিন্ন ভোজ্য সামগ্রী। এবার আর নিজের গ্রামে নয় রিক্সা ভ্যান চালিয়ে ছুটতে থাকেন এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামে। ভোর না হতেই বেরিয়ে পরেন। ফেরেন সন্ধ্যার আগে। আত্মপ্রত্যয়ী সংগ্রামী নারী হিসেবে ইতোমধ্যে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন। এখন তিনি স্বপ্ন দেখেন পরিশ্রমের টাকায় এক টুকরা জমি কিনে মাথা গোঁজার ঠাঁই গড়বার।
