৯ মে বসুন্ধরা স্টার সিনেপ্লেক্সে হয়ে গেল ভারতে নির্মিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘যুদ্ধশিশু’র প্রিমিয়ার শো। ছবিটি বেশ কয়েকটি কারণে আগে থেকেই আলোচিত-সমালোচিত। সমালোচিত এর পূর্ব নাম নিয়ে। ছবিটির নাম রাখা হয়েছিল ‘বাস্টার্ড চাইল্ড’। নামে ‘বাস্টার্ড’ শব্দটি থাকার কারণে ছাড়পত্র দিতে বেঁকে বসে ভারতীয় সেন্সর বোর্ড। তারা জানায়, ছবিটির বিষয়বস্তু যেহেতু প্রতিবেশী বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র বাংলাদেশ এবং দেশটির মুক্তিযুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর ও আবেগের বিষয়, কাজেই ‘বাস্টার্ড’ শব্দটি দেশটির জন্য অবমাননাকর হতে পারে বিবেচনায় নাম পরিবর্তন করার জন্য বলা হলো। অবশেষে পরিচালক মৃত্যুঞ্জয় ছবিটির নাম বদলে রাখলেন ‘যুদ্ধশিশু’। ইংরেজিতে ‘চিল্ড্রেন অব ওয়ার :নাইন মান্থস টু ফ্রিডম’। আর আলোচিত এই কারণে যে, ভারতের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এই প্রথম তারা অন্য দেশের ইতিহাসনির্ভর সম্পূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করল। বাংলাদেশের জন্যও ঘটনাটি প্রথম ঘটল। এর আগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অন্য কোনো দেশে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি। বলিউডে হালে মুক্তি পাওয়া ‘গুন্ডে’সহ কয়েকটি ছবিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিষয় এসেছে, কিন্তু সেটা আলাদা করে উল্লেখ করার মতো নয়।
শুরুতেই ছবির কলাকুশলীদের নাম উঠছে আর ফ্লাশ করে এক মার্কিন সাংবাদিককে দেওয়া ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাত্কারের কিছু অংশ দেখানো হচ্ছে। সেখানে তিনি বাংলাদেশিদের স্বাধীনতাযুদ্ধে নামার বিষয়টির পক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছেন। এবং বেশ শক্তভাবে মার্কিন অবস্থানের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। ছবিটির মূল অংশ শুরু হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করার জন্য বেতার বরাবর পাঠানোর ভেতর দিয়ে। এরপর তিনটি আলাদা গল্পকে অবলম্বন করে এগোতে থাকল ছবিটি। একটি গল্প এই সময়ের। বোঝা গেল, ছবিটি বানানোর আগে পরিচালক মৃত্যুঞ্জয় শাহবাগ আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। অন্য একটা গল্প একাত্তরের সময়ের। ২৬শে মার্চ। ঢাকার সাধারণ মানুষের পাশাপাশি হত্যা করা হলো বেশ কিছু সাংবাদিক-লেখক ও বুদ্ধিজীবীকে। একভাগে রইল কিশোর ও চল্লিশ বছরের নিচের মেয়েরা। আর অন্যদিকে রইল চল্লিশ বছরের উপরের নারীরা। আলাদা করা হলে সঙ্গে সঙ্গে বয়স্ক নারীদের মেরে ফেলা হলো।
এ-ধরনের ছবি নিয়ে শুরুতেই যে ভয়টা থাকে তা হলো, ইতিহাস বিকৃত হওয়ার ভয়। ছবিটি যেহেতু ভারত থেকে বানানো হচ্ছে এবং পরিচালক বাংলাদেশের ফরিদপুরের ছেলে হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা কম, তাই এখানে বিতর্কিত হওয়ার মতো কিছু থাকবে এমনই ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, ফ্যাক্ট অ্যান্ড ফিকশনের এত চমত্কার সেতুবন্ধন যে তেমন কোনো অভিযোগ ওঠার কারণ ঘটেনি।
ছবিতে চমত্কার অভিনয় করেছেন এর অভিনয়শিল্পীরা। আলাদা করে ফারুখ শেখ ও পবন মালত্রার কথা বলতে হয়। রাইমা-ইন্দ্রনীল ছাড়াও তিলোত্তমা ও রিধি সেনের অভিনয় ছিল অসাধারণ।
পরিচালক মৃত্যুঞ্জয় এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘এই ছবি (তখনকার নাম ছিল বাস্টার্ড চাইল্ড) মুক্তি পেলে বাংলাদেশের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করতে পারবেন। তার ঋণ কতটুকু শোধ হয়েছে জানি না, তবে এটুকু বলতে পারি, একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মৃত্যুঞ্জয়ের প্রতি ভীষণভাবে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। উল্লেখ্য, ‘যুদ্ধশিশু’ ছবিটি ১৬ মে ভারত ও বাংলাদেশে যৌথভাবে মুক্তিপাচ্ছে। বাংলাদেশে স্টার সিনেপ্লাক্সে দেখানো হবে।
