আজ সোমবার শেষ হচ্ছে ভারতের গণতন্ত্রের উত্সব। এটিই লোকসভার নবম ও শেষ ধাপের নির্বাচন। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনে প্রায় সাড়ে ৮১ কোটি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ভাগ্য আজকের ভোটপর্বের মধ্য দিয়ে নির্ধারণ হয়ে যাবে। এখন শুধু ফল ঘোষণার অপেক্ষা। আগামী ১৬ মে ভোট গণনা ও ফল ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক উত্সবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।
নির্বাচনের আগের জনমত জরিপগুলোর ফল ছিলো বড়ই একপেশে। এসব জরিপে দেখা যাচ্ছিলো ক্ষমতাসীন কংগ্রেস জোট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরাজয় বরণ করতে যাচ্ছে। আর প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি ও তার শরিকেরা ক্ষমতায় আসছে। কিছু কিছু জনমত জরিপের ফল বিজেপিকে তো ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়ার মতোই ছিলো।
কিন্তু ভারতের নির্বাচনী জরিপ আর ভোটের ফল সব সময় এক রকম হয় না। এর প্রমাণ আগেও মিলেছে ভারতের নির্বাচনে। ২০০৪ ও ২০০৯ সালের নির্বাচনেও অনেক জরিপে বলা হয়েছিল, বিজেপি সরকার গঠন করবে। কংগ্রেসের সরকার গঠনের সম্ভাবনা কম। কিন্তু ঐ দুই নির্বাচনে জরিপের ফল মিথ্যা প্রমাণ করে কংগ্রেস জোটই ক্ষমতায় আসে। আর হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি আশানুরূপ কোনো অবস্থানই সৃষ্টি করতে পারেনি। তাই কংগ্রেস বরাবরই জরিপকে পিছে ঠেলে প্রচারণা চালিয়ে গেছে ভোটের জন্য। অতীতের সফলতা আর জরিপের ফল ভুল হওয়ার নজির তুলে ধরেছে ভারতীয়দের সামনে। তবে এ কথা সত্য এসব জরিপের ফল ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে, ভারতের জনগণ ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে এমন দলকেই ভোট দিতে চায়।
নির্বাচনের শুরু থেকেই গণমাধ্যমের প্রচারণা, মোদীর সমাবেশ সব কিছুই বিজেপির অনুকূলে ছিলো। কিন্তু নির্বাচনের মাঝামাঝি এসে কংগ্রেসের পক্ষে প্রচারণায় নামেন গান্ধী পরিবারের সহজাত রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। জাতীয় ইস্যু ও বিরোধী দল বিজেপিকে লক্ষ্য করে দেয়া বক্তব্যে নতুন করে কংগ্রেসের জোয়ার তোলেন তিনি। দীর্ঘ সময় পর কংগ্রেস যেন হারানো চেহারা ফিরে পেয়েছে। অনেকটা আত্মবিশ্বাস হারানো কংগ্রেস নেতারা যেন আলোর সন্ধান পেয়েছেন।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচনে শেষদিকে কংগ্রেস ঘুরে দাঁড়ালেও বিজেপিই এগিয়ে রয়েছে। বিজেপির ইতিহাসে এবারই প্রথম তারা সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে। যদিও বিজেপি জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে, ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। বড় দুই রাজনৈতিক দলের বাইরে নিজ নিজ রাজ্যে এসব দল অনেক বেশি শক্তিশালী। প্রভাবশালী এসব দলের নেতারাও ভারতের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। যেমন, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন মমতা ব্যানার্জি, তামিলনাড়ুতে জয়াললিতা, উত্তর প্রদেশে মায়াবতী, বিহারের নীতিশ কুমার, লালু প্রসাদ যাদব প্রমুখ। এসব নেতারা কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের নিয়ামক হিসেবেই কাজ করে থাকেন। বামরাও কম যায় না। যদিও তাদের দুর্গ পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালা অনেকটাই অরক্ষিত।
আঞ্চলিক দলগুলো শক্তিশালী হওয়ায় এবার চমক দেখাতে পারে বামদের উদ্যোগে গঠিত তৃতীয় ফ্রন্ট। এক্ষেত্রে বিজেপি ও কংগ্রেস জোট যদি প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন না পায় তবে সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে তৃতীয় ফ্রন্টের। তবে অসাম্প্রদায়িক এই জোটের ক্ষমতায় আসতে হলে বড় একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থন দরকার হবে। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য সমর্থনকারী দল হলো কংগ্রেস। বিজেপিকে রুখতে কয়েকদিন আগেই এই তৃতীয় ফ্রন্টকে সমর্থন দেয়ার আভাস দিয়েছিলো কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা। যদিও এ সমর্থন দেয়া নিয়ে অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশেষ করে কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী জানিয়েছেন তার দল তৃতীয় ফ্রন্টকে সমর্থন দেবে না।
কংগ্রেস সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন পাবে বলেই বিশ্বাস তার। তবে রাজনীতিতে শেষ বলে কোনো কথা নেই। ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালেও তৃতীয় ফ্রন্ট সরকার গঠন করেছিলো। সে সময় সমর্থন দিয়েছিলো কংগ্রেস। কিন্তু ঐ সময়ে কংগ্রেস সমর্থন তুলে নেয়ার কারণে দুইটি সরকার এক বছরও স্থায়ী হতে পারেনি। যে কারণে দুই বছর পর ১৯৯৮ সালে লোকসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।
এ কথা সত্য যে কোনো একক দল এবারের নির্বাচনে প্রয়োজনীয় আসন পাচ্ছে না। জোট সরকারই ভারতের নিয়তি। তবে কোনো একটি দল যদি একক আধিপত্য বজায় রাখার মতো আসন না পায় এবং সরকার গঠনের জন্য অধিকসংখ্যক রাজনৈতিক দলের মুখাপেক্ষী হয় সেক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রে একটি শক্তিশালী সরকার আসবে না। সকল যদি আর কিন্তুর উত্তর মিলবে ১৬ মে নির্বাচনের ফল ঘোষণায়। জানা যাবে সত্যিকার অর্থে ভারতীয়রা কী চাইছে? কারা আসছে ১২০ কোটি জনসংখ্যার দেশটির পরিচালনায়।
