থাইল্যান্ড : ঘুরে ফিরে কি সেনাশাসন?

আপডেট : ১১ মে ২০১৪, ২১:৪১
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইংলাক সিনাওয়াত্রার অপসারণ নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে যে রাজনৈতিক টানাপড়েন চলছিল গত সপ্তাহে আদালতের এক নির্দেশে তার যবনিকা হলো। আদালতের নির্দেশে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার ছেড়ে দিয়েছেন ইংলাক সিনাওয়াত্রা। কিন্তু তার সরকার এখনো ক্ষমতায়। তবে এতদিন ধরে যারা সরকার পতনের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল সেই বিক্ষোভকারীরা তাদের দাবি এখনো ছাড়েনি। তারা বলছেন, কেবল ইংলাকের অপসারণ হলেই চলবে না। তার সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। এখানেই শেষ নয়, তারা আবদার জানিয়েছে নিজেরাই একজন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবে! সমস্যা সমাধান তো হলোই না। বরং আরো জটিল হয়ে গেল পরিস্থিতি। একদিকে সরকারের পদত্যাগের দাবিতে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে রাজপথে অবস্থান নিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। অপরদিকে ইংলাক সমর্থকরাও তার সমর্থনে রাজপথে অবস্থান গ্রহণ করেছে। থাইল্যান্ডে এরা রেডশার্ট বাহিনী বলে পরিচিত। সেনাবাহিনী বলেছে, তারা আপাতত চুপ করে সব দেখবে। পরিস্থিতি যদি অসহনীয় হয়ে ওঠে তবে তারা বসে থাকবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, সাংবিধানিক আদালতের রায়ে ইংলাকের সরে যাওয়া সমস্যার সমাধান করবে না। বরং তিক্ত রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরো তিক্ত করে দিবে এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার সুযোগে ক্ষমতা গ্রহণে উত্সাহিত হতে পারে সেনাবাহিনী। কারণ ইংলাকপন্থিরা মনে করছেন, একটি মহল তাদের নেত্রীকেই টার্গেট করেছে। থাকসিন সিনাওয়াত্রার পর তার সমর্থক তিনটি নির্বাচিত সরকারকেই এভাবে আদালতের নির্দেশে সরে যেতে হলো। ২০০৬ সালে এক সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়েছিলেন ইংলাকের ভাই থাকসিন সিনাওয়াত্রা। তিনি এখন দুবাইয়ে স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছেন। কিন্তু তার অনুসারিরাই ভোটে জিতে তার দেশত্যাগের পর থেকে ক্ষমতায় আছে। কিন্তু শহরভিত্তিক এলিট শ্রেণীদের দল ডেমোক্র্যাট পার্টি ভোটে জিততে না পেরে ইংলাক সিনাওয়াত্রার পরিবারকে রাজনীতি থেকে নির্বাসনে পাঠানোর জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে। তাদের পক্ষে আন্দোলন বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সুথেপ থগসুবান। প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্র্যাট পার্টির ধারণা, যতদিন ইংলাকের পরিবারের কেউ রাজনীতি করবেন ততদিন ভোটের লড়াইয়ে তারা জিততে পারবে না। কারণ পল্লী এলাকার ভোটারদের প্রথম পছন্দ থাকসিন পরিবার ও তার দল। তিনি পল্লী এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের মধ্য দিয়ে তাদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। ডেমোক্র্যাট পার্টির জনপ্রিয়তা মূলত শহুরে শিক্ষিত সমপ্রদায়ের মধ্যে। পল্লী এলাকায় তাদের গ্রহণযোগ্যতা কম। ২০০১ সালের পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনেই থাকসিন কিংবা তার সমর্থক পক্ষ জয়লাভ করে আসছে বিপুল ভোটে। গত নির্বাচন প্রধান বিরোধী দল বর্জন করেছিল। রাজনৈতিক সংস্কারের নামে তাদের অন্যতম দাবি ছিল রাজনীতি থেকে ইংলাক ও তার পরিবারের নির্বাসন। কিন্তু ইংলাক সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচন দেন। সেই নির্বাচনও বাতিল ঘোষণা করে আদালত। আগামী জুলাই মাসে আরেকটি নির্বাচন হতে পারে। ইংলাকের বিরুদ্ধে একটি চাল সংগ্রহ প্রকল্পে থাই দুর্নীতি বিরোধী কমিশন অভিযোগপত্র দিয়েছে। অভিযোগটি নিয়ে সিনেটে ভোটাভুটি হবে। যদি ভোটাভুটিতে ইংলাক দোষী সাব্যস্ত হন তবে তিনি পাঁচ বছরের জন্য রাজনীতিতে নিষিদ্ধ হবেন। সেক্ষেত্রে তার পরিবারের কেউ দলের দায়িত্ব হাতে নিতে পারে। কিংবা পুয়া থাই পার্টি তার কোনো মিত্র দলের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। সেক্ষেত্রেও তাদেরই জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকবে। ইংলাকের দলকে যদি নিষিদ্ধ করা হয় তবে ভিন্ন নামে নতুন দল গঠন করা হতে পারে। এর আগে থাকসিনের থাই রাক থাই এবং থাকসিনপন্থি পিপলস পাওয়ার পার্টিকে একইভাবে নিষিদ্ধ করেছিল আদালত। ইংলাক সিনাওয়াত্রা ছিলেন থাইল্যান্ডের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। একই সাথে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঠিক ১০০০ দিন দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। এরপর আন্দোলনের মুখে পার্লামেন্ট ভেঙ্গে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঘোষণা দেন। যেভাবে ইংলাকের বিদায়: থাইল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত গত বুধবার ইংলাক সিনাওয়াত্রার সাথে তার মন্ত্রিসভার নয়জন মন্ত্রীকে অপসারিত করে। ইংলাকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য জাতীয় সুরক্ষা পরিষদের প্রধান থাউইল প্লায়েনশ্রীকে বদলি করেছিলেন। আদালত আরও বলে, ২০১১ সালে অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে মাত্র চারদিনে এই বদলির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নিয়োগের কাগজপত্র ও তারিখের ক্ষেত্রেও অনিয়ম ধরা পড়ে। এরপরই আদালতে বিচারক চারুন ইন্তাচান ঘোষণা করেন, ‘ইংলাক আর থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারেন না। নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মেনেই সরকারি কর্মচারীদের বদলি করা উচিত।’ রায় ঘোষণার পর ইংলাক বিরোধীরা আদালত চত্বরে উল্লাসে ফেটে পড়ে। তাদের একজন নেতা, সামদিন, বলেন, ‘আজ আনন্দের দিন ঠিকই কিন্তু নির্বাচন সংস্কারের দাবি থেকে আমরা সরছি না। ১৪ মে আমরা এক বিরাট সভার আয়োজন করেছি।’ ইংলাক তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসাবে আমি জনগণের কল্যাণকেই ধ্যানজ্ঞান করেছি। আমি কখনও কোনও বেআইনি কাজ করিনি। আমি যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, গণতন্ত্রের পথেই চলব। দুঃখ একটাই, আমি আপনাদের আর সেবা করতে পারব না। এর কিছু পরেই বাণিজ্যমন্ত্রী এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী নিওয়াত্থামরং বুনসংফাইসান অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রীর কার্যভার গ্রহণ করেন। তার অন্তর্বর্তী সরকারের মূল কাজ হবে ২০ জুলাই সাধারণ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে শেষ করা। তবে থাইল্যান্ডের প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্র্যাট পার্টি এতেও সন্তুষ্ট নয়। তাদের দাবি নতুন প্রধানমন্ত্রী একসময় থাকসিনের প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। ইংলাকের সমর্থকরা বলেন, আদালতের এই সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের উপর আঘাত। তবে আমরা হিংসাশ্রয়ী আন্দোলনে যাব না। নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিব। থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইংলাকের অপসারণের পরেও বিরোধী দল নির্বাচনে যাবে কি-না তা এখনো স্পষ্ট নয়। যদি আগের মতো নির্বাচন বর্জন করে রাজপথে বিক্ষোভে ইন্ধন দিয়ে রক্তপাত ঘটায় তবে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ছাড়া আর বিকল্প থাকবে না। ঘুরে-ফিরে সেই অগণতান্ত্রিক শক্তির হাতেই ন্যস্ত হবে দেশটির শাসনভার। তারা এই পরিস্থিতিকে বলেছেন, গণতন্ত্রের আকাশে কালো মেঘের ছায়া।