এক সময় তিনি চা বিক্রি করতেন। কিন্তু এ নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। বরং তিনি ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, ভারতের ১৬তম লোকসভা নির্বাচনে হারলে তিনি আবার তার পুরানো পেশায় ফিরে যাবেন। সেই নরেন্দ্র মোদী এখন কেবল ভারতীয় জনতা দলের (বিজেপি) নেতাই নয়, দেশটির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী। তার মনে সর্বদা প্রধানমন্ত্রিত্বের আকাঙ্ক্ষাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। দলটির চেয়ে ব্যক্তি মোদীই এখন মানুষের কাছে বেশি পরিচিত হয়ে উঠছেন। তাই বিজেপি কিংবা মোদী যতোই সরকার গঠন কিংবা প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য আশাবাদী হোন না কেন, নির্বাচনের ফলাফল পাওয়ার পরই বোঝা যাবে পানি কোনদিকে গড়াচ্ছে। এমনকি বিজেপি সরকার গঠন করলেও মোদী প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। নির্বাচনের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম আল-জাজিরাকে একটি সাক্ষাত্কার দিয়েছেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-মার্কসবাদী (সিপিএম) পলিটব্যুরোর সদস্য সিতারাম ইয়েচুরি। তিন দশক ধরে দলটি পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে। তিনি বলেছেন— বিজেপি নয়, ১৬ মে’র পর তৃতীয় ফ্রন্টই বসবে লোকসভার চালকের আসনে। সিতারামের পুরো সাক্ষাত্কারটি ইত্তেফাকের পাঠকদের জন্য বাংলায় অনুবাদ করে তুলে ধরা হলো—
সিতারাম ইয়েচুরির মতে, কংগ্রেস কিংবা বিজেপি কেউই সরকার গঠনের মতো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। নির্বাচনের পর ভারতে একটি তৃতীয় ফ্রন্টের আবির্ভাব ঘটবে যারা টিকে থাকতে সমর্থ হবে। তার মতে, ভারতীয় জনতা পার্টি তথা মোদীকে মিডিয়া যেভাবে তুলে ধরেছে বাস্তবে সেটা নয়। গণমাধ্যম দেশের বাস্তব অবস্থা তুলে না ধরে কাল্পনিক ‘মোদী জোয়ার’ সৃষ্টি করেছে।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রধান ইস্যু কী এবং এই ইস্যু কি ২০০৯ সালের চেয়ে ভিন্ন মনে হয়?
সিতারাম ইয়েচুরি: মূলত একই। বর্তমানে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো জনগণের মধ্যে উদ্বেগ আছে যে ১৬ মে’র পর ভারতে যে সরকার গঠিত হবে সেই সরকার জনগণের দৈনন্দিন জীবনে শান্তি দিতে পারবে কিনা। কারণ তারা মূল্য বৃদ্ধি, অর্থনীতির শ্লথগতি এবং বেকারত্বের বোঝা বহন করছেন। সুতরাং এসব সমস্যা থেকে মুক্তির বিষয়টিই প্রধান আলোচ্য। সেদিক থেকে ২০০৯ সালের চেয়ে কিছুটা হলেও এবার পার্থক্য আছে। কারণ ওই সময় মানুষ এ বিষয়ে এতো সচেতন ছিলেন না। বড় পরিসরে বলতে গেলে, কংগ্রেস এবং বিজেপি কোনো দলই তাদের সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারবে না।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এবারের নির্বাচনটা প্রেসিডেন্সিয়াল ধাঁচের। আপনি কী মনে করেন এটা ইস্যুর চেয়ে ব্যক্তিগত বিষয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে ?
এটা সত্য নয়। কোনো রাজনৈতিক দলই নির্বাচনকে এগিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে না। কারণ আমি আমার ভ্রমণ থেকে এই অভিজ্ঞতা পেয়েছি যে, এবারের নির্বাচনে জাতীয় বিষয়ের চেয়ে স্থানীয় বিষয়কেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে এবং ভোটাররা প্রার্থী দেখে ভোট দিচ্ছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় এবং আঞ্চলিক দিকগুলোই প্রাধান্য পাচ্ছে।
এমনকি মনে হচ্ছে যে ভোটারদের মধ্যে গ্রামীণ এবং শহুরে এ রকম পার্থক্য তৈরি হয়েছে?
এক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে ধারালো অনুভূতি রয়েছে। গ্রামে মানুষ যেভাবে সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে চান, শহরের মানুষের মধ্যে সেই ভাবনাটা ঐ রকমভাবে গড়ে ওঠেনি। কারণ শহরের মানুষগুলো নব্য উদার নীতির সংস্কারের সুবিধা গ্রহণ করেছেন। এটা শহরে গরীবদের জন্যও সমান সত্য। এটা শহুরে মধ্যবিত্ত বিশেষ করে শহুরে উচ্চ মধ্যবিত্তের জন্য কার্যকরী নয়। অর্থাত্ ভারত ‘গরীবদের’ এবং ‘ধনীদের’ ভারত এই দুইভাগে বিভক্ত।
গণমাধ্যমের ভূমিকা সম্পর্কে আপনার চিন্তা ভাবনা কী? আপনি কী মনে করেন,এই নির্বাচনী মৌসুমে গণমাধ্যম লিটমাস পরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছে?
গোটা গণমাধ্যম যে বিষয়ের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করছে সেটাকে আমি বলবো একটি প্রান্তিক ইস্যু। আমার মানদণ্ডে এটা দেশের বাস্তব চিত্র নয়। হ্যাঁ, গণমাধ্যম মূল পয়েন্ট থেকে বিচ্যুত হয়েছে। গণমাধ্যম এবার যে ভূমিকা রাখছে সেই একই চিত্র আমরা ২০০৪ সালে দেখেছি। তখন বিজেপি’র ‘ইন্ডিয়া শাইনিং’ শীর্ষক নির্বাচনী প্রচারণার কারণে গণমাধ্যমগুলো বিভিন্ন মতামত জরিপে উল্লেখ করেছিল, প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ি এবং তার জোট এনডিএ ৩৫০ আসনে বিজয়ী হবে। তখন আমরা এর ফলাফলটা দেখেছিলাম। এবারও তাই।
২০০৪ সালে বামপন্থিরা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চার (ইউপিএ) আকার গড়তেই ভূমিকা রাখেননি সরকারের নীতি-নির্ধারণেও প্রভাব রেখেছিলেন। এবারের নির্বাচনের পর বামরা কী ধরনের ভূমিকা রাখার ছক আঁকছেন?
আমরা একই ধরনের ভূমিকা রাখার প্রত্যাশী। তবে পরিমাণগতভাবে হয়তো ততোটা বিস্তৃত হবে না। কিন্তু গুণগত দিক থেকে একই ভূমিকা হবে।
আপনি কী মনে করেন এখনো তৃতীয় ফ্রন্টই বিকল্প?
হ্যাঁ, আদর্শগত কিংবা ভাবগত দিক থেকে সেটাই। আমরা সেই ধরনের একটা বিকল্পের সন্ধান করছি এবং চলমান গুঞ্জন হয়তো বাস্তবে রূপ পাবে বলে আশা করি। তবে এটা নির্ভর করছে দলের সংখ্যার ওপর। আশা করছি ভোট গণনা শেষে তৃতীয় ফ্রন্টই চালকের আসনে বসবে।
এই ফ্রন্টে নেতৃত্ব দিবেন কে?
এটা জানা যাবে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর। যে দলটি বেশি আসন পাবে সেটির ওপর এটা নির্ভর করতে পারে।
এক্ষেত্রে আপনি কী আম আদমি পার্টির প্রসঙ্গ আনছেন?
এই দলটির নীতি এখনো অস্পষ্ট। এমনকি দলটি সমপ্রতি বলেছে, আমরা না বাম না ডান। এটা দলটির জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক যা মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আপনি কী মনে করেন, আম আদমি পার্টি বামপন্থিদের স্থান দখল করেছে?
দলটি কংগ্রেস এবং বিজেপি থেকে সমদূরত্ব বজায় রাখছে। বামপন্থিদের এক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবেই শক্ত অবস্থান আছে।
আপনি কী অনুভব করেন কমিউনিজমের সঙ্গে রোমান্টিক মানসিকতা সংযুক্ত হওয়ায় দলটি তার দীপ্তি হারিয়েছে?
না, এটা সত্য নয়। তারা মনে করেন, সারা বিশ্বেই একটা দুর্যোগ চলছে এবং এর চাকা চক্রাকারে ঘুরছে। সব স্বপ্ন হয়তো বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। আদর্শবাদ হয়তো ভিন্নভাবে ফিরে আসছে।
নরেন্দ্র মোদী সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?
তার সম্পর্কে যতোটা বলা হচ্ছে বাস্তবে ততোট নয়। আমি মনে করি না তার মধ্যে ব্যক্তিগত কোনো আবেদন আছে।
বিজেপির সফলতার চেয়ে কংগ্রেসের হারটা কী বড় মনে হয়? আঞ্চলিক দলগুলো কী সেই ধরনের দূরত্ব মনে করে?
আমি মনে করি, আঞ্চলিক দলগুলো একটু বেশিই মনে করে। যদি বিজেপি আঞ্চলিক শক্তি বেশি থাকে তাহলে বিজেপি শক্তিশালী হবে। কিন্তু আমি মনে রংধনু সমঝোতার পরিবর্তনই এক্ষেত্রে মুখ্য।
