মিসরে দেয়া হচ্ছে গণমৃত্যুদণ্ড। এতে সাক্ষী-সাবুদের খুব একটা প্রয়োজন পড়ছে না। সমালোচকরা বলছেন, রায় থাকছে পূর্ব নির্ধারিত। লোক দেখানো বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তা কেবল ঘোষণা করা হচ্ছে। কেউ কেউ এমনও বলছেন, আব্দেল ফাত্তাহ আল সিসির প্রেসিডেন্ট হওয়ার রাস্তা সুগম করা এবং পরবর্তীতে পথ চলা নির্বিঘ্ন করতেই মুসলিম ব্রাদারহুডকে নেতাশূন্য বানানোর অভিযানে নেমেছে সিসি অনুগতরা। সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও এ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নিরাপদ মনে করছে না তারা। তাই পরিকল্পনা আঁটা হয়েছে একের পর এক গণমৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার। যাতে ভয়ে এ সংগঠনের নাম পর্যন্ত কেউ উচ্চারণ না করে। মিসরে দ্বিতীয় দফায় ফাঁসির আদেশ দেয়া হল ৬৮৩ জনকে। দণ্ডপ্রাপ্তদের বেশিরভাগই মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতাকর্মী কিংবা সমর্থক। এর মধ্যে আছেন সংগঠনটির শীর্ষ নেতা মোহাম্মদ বাদি। অভিযোগ— গত ১৪ আগস্ট দক্ষিণাঞ্চলীয় আল মিনিয়া প্রদেশে একজন পুলিশ হত্যা এবং একটি থানায় হামলার সঙ্গে জড়িত থাকা। রায় শোনার পর আদালতের বাইরে অপেক্ষমান অনেক আত্মীয়-স্বজনই মূর্ছা গিয়েছিলেন। তারা কিছুতেই মানতে পারছেন না এ রায়। বলছেন, এ রায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একই আদালত পৃথক মামলায় গত মাসে ৫২৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। এভাবে গণহারে মৃত্যুদণ্ড দেয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে গোটা বিশ্ব। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এভাবে পাইকারি মৃত্যুদণ্ড দেয়ার সমালোচনা করে বলেছে, আসামিরা ন্যায় বিচার পাননি।
দ্বিতীয় মামলায় দেয়া বাদিসহ অন্যদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রথানুযায়ী এরই মধ্যে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে মিসরের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ মুফতির কাছে। কিন্তু তাঁর মতামত যে মানতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। আদালত চাইলে তাঁর মতামত উপেক্ষা করতে পারে। তবে ৬০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ থাকছে। আর যাদের অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছে, তারা আবেদন করতে পারবেন পুনর্বিচারের। ধারণা করা হচ্ছে, এতে করে শেষ পর্যন্ত হয়তো অনেককে ফাঁসির বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হবে। কিন্তু কেউই বেরোতে পারবেন না জেল থেকে। অর্থাত্ খালাস পাওয়ার সম্ভাবনা কারোরই নেই। উল্লেখিত দুটি মামলার বিচারকার্যের তুলনা চলে কেবল সামরিক ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে। বিশ্লেষকরা এর নাম দিয়েছেন ‘ঝুলন্ত বিচার’। অতি উত্সাহীরা যতটা সম্ভব তাড়াহুড়ো করেছেন বিচারকাজ শেষ করার। প্রয়োজনীয় সাক্ষী ও প্রমাণের বিষয়গুলো নাকি তারা অনেক ক্ষেত্রেই অপরিহার্য মনে করেননি। মামলা কোন দিকে যাচ্ছে তা বুঝে প্রায়ই অনুপস্থিত থাকতেন বিবাদী পক্ষের আইনজীবীরা। কিন্তু তাতেও বিচারকাজ দীর্ঘায়িত হয়নি। অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্য এবং সাংবাদিকদের সুযোগ ছিল না বিচারকর্ম চলার সময় উপস্থিত থাকার। তারপরেও বিচারক সাঈদ ইউসুফের দেয়া রায় দু’টির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন কায়রোর কোর্ট অফ আপিলের হাই জাজ আহমেদ আল-মেরাজি। তাঁর মতে- বিচার প্রক্রিয়া ছিল খুবই স্বচ্ছ এবং মিসরের বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রভাব ও হস্তক্ষেপমুক্ত থেকে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করছে। কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিবাদীপক্ষের একজন আইনজীবী ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকের মন্তব্য, ‘মিসরে সবকিছুই চলছে প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী। মামলায় কী ঘটতে যাচ্ছে তা তারা অনেক আগেই আন্দাজ করতে পারছিলেন। আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না এখানে। অভিযোগ গুরুতর হলেও সাক্ষী-প্রমাণ ছাড়া দোষী সাব্যস্ত করা যে অন্যায় সেটিই বুঝতে চাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।’
গত জুলাইয়ে মিসরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে এ বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত অস্ত্রধারী লোকদের হাতে মিসরে নিহত হয়েছে ৫৭ জন সাধারণ লোকসহ মোট ৪৯৬ জন। সরকারি উপাত্ত এমনই বলছে। এ কথাটি সত্য যে বেশিরভাগ সহিংসতাতেই মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতাকর্মীরা জড়িত। কিন্তু তাদের কতজন নিহত হয়েছে, সে তথ্যটি জানাতে রাজি নয় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে বিশ্লেষকদের দাবি, মুরসির সংক্ষিপ্ত শাসনামলে যে কিছুটা হলেও ক্ষোভ দানা বেঁধেছিল তা অস্বীকার করার উপায় নেই। নইলে তাঁকে এতো তাড়াতাড়ি বিদায় নিতে হতো না। মুসলিম ব্রাদারহুডের সহিংসতা যেমন আন্দোলনের ভাষা হতে পারে না, তেমনি এ দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উপর দমন-পীড়নও কাম্য নয়। নিষিদ্ধ ঘোষণা করা এবং সরকারের অন্যান্য কাজকর্ম দেখে মনে হচ্ছে, মুসলিম ব্রাদারহুড নামটিকেই তারা অতীত বানিয়ে ফেলতে চায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের জন্যই মিসরে আইনের শাসন কায়েম করাটা খুবই জরুরি। সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। শক্ত-সমর্থ বিচার বিভাগ সকল মিসরীয়রই কাম্য; কিন্তু সে আশা দুরাশাই থেকে যাচ্ছে। বিচার বিভাগকে অস্ত্র বানিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের সংস্কৃতি থেকে বেরোতে পারছে না দেশটি। ফাঁসির আদেশ শোনা মোহাম্মদ বাদি একটি কথা প্রায়ই বলতেন, ‘সিমিয়াতাউনা আকওয়া মিন আল রাসাস’। যার অর্থ— আমাদের শান্তিপ্রিয়তা বুলেটের চেয়েও শক্তিশালী। তাঁর দলের সব সমর্থক এ কথাটি মেনে চলে না আর ভবিষ্যতেও হয়তো মানবে না। আন্ডারগ্রাউন্ডের দল হয়েও তারা চালিয়ে যাবে দলীয় কর্মকাণ্ড। সে হিসেবে সামরিক পোশাক খুলে রাজনীতিতে নামা সিসি পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হলেও তাঁর অগ্রযাত্রা যে খুব একটা সুখকর হবে না তা নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায়।
