জিয়ার খুনি নিয়ে বাহাস

আপডেট : ১১ মে ২০১৪, ২৩:১৬
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খুনি কে? স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় ধরনের, বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কুশীলব কারা? রাজনীতির মাঠে আবারও উঠে এসেছে এই বিতর্ক। এবারের এই বিতর্কের সূচনা করেছেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নিজেই। সাবেক সেনাশাসক এইচএম এরশাদকে তিনি জিয়াউর রহমানের খুনি বলে সরাসরি অভিযুক্ত করেছেন। অভিযোগ অস্বীকার করে এরশাদ বলেছেন, তিনি খুনি নন। হত্যাকাণ্ডের সময় জিয়াউর রহমানের পাশের কক্ষে যিনি ছিলেন, তার দিকেই সন্দেহের তর্জনী তুলেছেন এরশাদ। তার (এরশাদের) এই ইঙ্গিতের জবাবে সেদিন জিয়ার পাশের কক্ষে থাকা অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, ‘এরশাদ একজন প্যাথলজিক্যাল মিথ্যাবাদী, এরশাদই যে জিয়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর বেঁচে থাকলে তা প্রকাশ পেত।’ জিয়া হত্যাকাণ্ড নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও সাবেক রাষ্ট্রপতি বি. চৌধুরী বনাম প্রাক্তন সেনাশাসক এরশাদের এই বাগ্যুদ্ধ রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রসঙ্গত, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তত্কালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ নেতা-কর্মীদের নামে ‘মিথ্যা’ মামলা এবং সারাদেশে গুম, খুন ও অপহরণের প্রতিবাদে দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসাবে গত ৪ মে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে কেন্দ ীয়ভাবে গণ-অনশন কর্মসূচিতে সংহতি জানাতে যান তিনি (খালেদা জিয়া)। সেখানে দেয়া বক্তব্যেই জিয়াউর রহমান ও সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যার জন্য এরশাদকে সরাসরি দায়ী করে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘এরশাদ মঞ্জুর ও জিয়াউর রহমানের খুনি। খুনি এরশাদের বিচার করতে হবে। তার বিচার করা হবে।’ খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যের পাঁচদিন পর, শনিবার রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে জাপার অঙ্গ সংগঠন জাতীয় যুব সংহতির সাধারণ সভায় জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলেন এরশাদ। খালেদা জিয়ার অভিযোগের জবাবে এরশাদ বলেন, ‘জিয়া হত্যা নিয়ে ব্লেম গেম চলছে। উনি (খালেদা জিয়া) বলেন-আমি খুনি। আমি খুনি নই। জিয়ার খুনের সময় বিচারপতি সাত্তার ক্ষমতায় ছিলেন। মঞ্জুরকে ধরতে পারলে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন। বিদ্রোহ দমনের জন্য আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন। আমি জানি জিয়ার খুনি কে? তিনি যখন মারা যান তখন তার পাশের কক্ষে কে ছিলেন। আপনি (খালেদা জিয়া) ২০ বছর তার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, কই আপনি তো তার বিচার করেননি।’ ইঙ্গিত করলেও এরশাদ তার বক্তব্যে কারও নাম উল্লেখ করেননি। তবে নাম না বললেও এরশাদ কার উদ্দেশে একথা বলেছেন তা স্পষ্ট জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ও সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর কাছে। গতকাল রবিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সরকার ও বিরোধী দলের যুগপত্ সদস্য (যা পৃথিবীতে ব্যতিক্রম) হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি আমার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।’ বিবৃতিতে বি. চৌধুরী বলেন, এরশাদ একজন কমপালসিভ ও প্যাথলজিক্যাল মিথ্যাবাদী। সত্ লোকের বিরুদ্ধে শুধু নিজ দলের লোকজনের সস্তা হাততালি পাওয়ার জন্য কতখানি নীচে নামা সম্ভব, এরশাদের উক্তি থেকে তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের সময়ের ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার বক্তব্য হচ্ছে: শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার দিন চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তার কক্ষের অপরদিকের কক্ষে আমি একা ছিলাম না। ওই কক্ষে আমার সঙ্গে অন্য বিছানায় তত্কালীন জনশক্তি প্রতিমন্ত্রী সিলেটের জনাব মহিবুল হাসানও ঘুমিয়েছিলেন। এছাড়া আমাদের পাশের কক্ষে ছিলেন আরও এক মন্ত্রী ড. আমিনা রহমান। তার পরের কক্ষে ছিলেন নিজাম চৌধুরী নামে বিএনপির এক শ্রমিক নেতা। সুতরাং পাশের ঘরে আমি একা ছিলাম না। এটাই সঠিক বক্তব্য। ওইসব ব্যক্তিদের কারো কথা এরশাদের স্মরণে নাই। যদিও আমি এবং মুহিবুল হাসান উভয়েই সরকার গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষ্য দিয়েছিলাম। ওই কমিটি তাদের তদন্তে ঘটনার সঙ্গে আমি বা মুহিবুল হাসানের কোনো সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি। সুতরাং এতদিন পর এরশাদ আনীত অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমাণ হয়।’ বি. চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমাদের প্রিয় নেতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের’ শাহাদতের পর এরশাদ নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আবদুস সাত্তারকে জোরপূর্বক ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেই প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। সুতরাং জিয়া হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ফলাফল লাভ করেছেন এরশাদ, অন্য কেউ নয়। এরশাদ পরবর্তী পর্যায়ে ১০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তখন আমার বিচার করার জন্য কোনো পদক্ষেপ নেননি কেন? তার চেয়েও পরে বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি (এরশাদ) নিজে ১০ বছর বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতার বিরুদ্ধে মামলা করেননি। এতে কী প্রমাণিত হয় না যে বি. চৌধুরী জিয়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন না।’ দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে বিদেশি সাংবাদিক লিফশুঁলেজর লেখার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বি. চৌধুরী বলেন, ‘মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের বিবরণীতেও স্পষ্ট বোঝা যায়, মঞ্জুরকে যারা হত্যা করেছে সেই চক্রের প্রথম নাম জেনারেল এরশাদের। কেন জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়েছিল, তার কারণ মাত্র একটি। আর তা হলো, জেনারেল মঞ্জুর বেঁচে থাকলে জিয়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এরশাদের সংশ্লিষ্টতা নগ্নভাবে প্রকাশ হয়ে যেত। ইনশাল্লাহ্ বিচার হলে জেনারেল মঞ্জুর ও জেনারেল জিয়া হত্যার ব্যাপারে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে বলে আমি আশাবাদী।’ সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এরশাদের হয়তো স্মরণে নেই, রাষ্ট্রপতি জিয়া নিহত হওয়ার পর এরশাদ আমাকেও টেলিফোন করেছিলেন, তার সঙ্গে কথা বলার জন্য। আমি তাকে স্পষ্টভাবে উত্তর দিয়েছিলাম যে, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ সম্পর্কে কোনো সরকারি কর্মচারীর সঙ্গে আলোচনা করব না।’