ওরা ১২ কিশোর। বয়স বার থেকে সতেরোর মধ্যে। পুলিশের খাতায় ওরা পেশাদার চোর আর মাদক বহনকারী। বয়সের চেয়েও বেশিবার ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে। হাজতবাসটাই ওদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে বিভিন্ন অপরাধে বারবার পুলিশের হাতে আটক হলেও তারা ছাড়া পেয়েছে কিশোর বিবেচনায়। কিন্তু চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহযোগিতায় এখন তাদের জীবনই পাল্টে গেছে। পাঁচ মাস আগেও তাদের হাতে ছিল ছুরি-ব্লেড। এখন সেই হাতে উঠেছে কলম ও বই-খাতা। কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে কেউ কেউ পরিণত হচ্ছে দক্ষ জনশক্তিতে।
যাদের কথা বলা হচ্ছে, তারা সবাই চট্টগ্রাম শহরের ভাসমান বাসিন্দা। এরা হলো— মিন্টু, জাহেদ, রবি আলম, রাসেল, নাজমুল, মিলন, সোহেল, শুক্কুর মিয়া, মনা, আলিম সাব্বির, আজিজ ও সুজন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপিলটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের এডিসি বাবুল আক্তার বলেন, এবার কিশোর অপরাধীকে নিয়ে সিএমপি পুলিশ ছিল মহাবিপাকে। ছোট হলেও তারা প্রত্যেকে ছিল ‘দক্ষ’ অপরাধী। সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র এদের অস্ত্র বহন থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতো। পাশাপাশি লাগেজ কেটে মালামাল চুরি করা, পথচারীদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়া, মহিলা রিকশা যাত্রীর ভ্যানিটি ব্যাগ কেড়ে নেয়া, চলন্ত ট্রাক থেকে পণ্য নামানো প্রভৃতি কাজে এরা ছিল সিদ্ধহস্ত। পুলিশ এদের বারবার গ্রেফতার করলেও শিশু বলে প্রতিবারই ছাড়া পেয়েছে। এ কারণে পুলিশও ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হয়ে আটকের পর তাদের দফায় দফায় পিটিয়েছে। পিটুনি খেয়ে তারা বার বারই বলেছে আর অপরাধে জড়াবে না। কিন্তু এটা ছিল পিটুনির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার অজুহাত মাত্র। তাদেরকে অপরাধ থেকে ফেরানোর জন্য পুলিশের সব ব্যবস্থাই যখন অকার্যকর হয়, তখন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরিবারের সহায়তায় পুলিশ এই ১২ কিশোরকে আটক রেখে ভাল খাবার, ভাল পোশাক দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে। ১০ দিনের মধ্যে তাদের মধ্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এরপর বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় তাদেরকে ভর্তি করা হয় স্কুল ও ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে। এদের মধ্যে মিন্টু, জাহেদ, নাজমুল, আজিজ, সুজন ও সাব্বিরকে ভর্তি করা হয় স্কুলে। আর (বয়সে যারা বড়) রবি আলম, রাসেল, মিলন, সোহেল, শুক্কুর মিয়া ও মনাকে ভর্তি করা হয় স্থানীয় ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে।
এডিসি আরো বলেন, পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় এসব শিশু-কিশোর এখন নতুন জীবনে ফিরে এসেছে। যে হাতে ছিল ছুরি-ব্লেড, সে হাত দিয়ে আঁকতে শিখেছে ছবি। কেউ কেউ ভোকেশনাল সেন্টারে প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে ইতিমধ্যে নিজেকে গড়ে তুলেছে।
১২ কিশোরের মধ্যে বয়সে সবার বড় মনা ও সোহেল। মনার বাবার নাম ফজলুর রহমান। বাসা হালিশহর চুনা ফ্যাক্টরীর মাঠের পাশে। সোহেল থাকে চট্টগ্রাম কোতওয়ালী থানা এলাকার বিআরটিসি এলাকার ১৪ জামতলায়। তার বাবার নাম আব্বাস মিয়া, মা বেবী বেগম।
সিএমপি’র এক কর্মকর্তার মাধ্যমে মোবাইল ফোনে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় মনা ও সোহেলের। তারা জানায়, বাবা-মা’র সঙ্গে বস্তিতেই তাদের বেড়ে ওঠা। বড় বড় অপরাধীরাই তাদেরকে অপরাধ জীবনে নামতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। আর চুরি-ছিনতাই করতে করতে বার বার পুলিশের হাতে ধরা খেয়েছে, আবার ছাড়া পেয়েছে। আবারও ফিরে গেছে সেই অপরাধ জগতে। সর্বশেষ সেই পুলিশই তাদের ভাল হবার পথ দেখিয়েছে। তারা আরো জানায়, ইতিমধ্যে তারা ভোকেশনাল সেন্টারে অনেক কাজ শিখেছে। আর কিছু দিন পরই তারা কোন কারখানা বা দোকানে কাজ করতে পারবে। মনা ও সোহেল আরো জানায়, কেউ তো এতদিন ভালোবাসা দেয়নি! শুধু মেরেছে, গাল মন্দ করেছে। নতুন জীবন পেয়ে তারা খুবই খুশি।
