সারাদেশে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) নিয়ে ভয়ঙ্কর ফাঁদ পেতেছে শক্তিশালী একটি প্রতারক চক্র। আর এ ফাঁদে পড়ে বিভ্রান্ত হচ্ছে পুলিশ, হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এ কারণে নিরপরাধ অনেককেই গ্রেফতারের শিকার হতে হচ্ছে। আবার অনেককে কারাগারে বন্দী জীবন কাটাতে হয়েছে। অথচ ওয়ারেন্টটি সঠিক কি না তা যাচাই করার দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু সেটি না করে হরহামেশাই ভুয়া ওয়ারেন্ট নিয়ে সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার করছে পুলিশ-এমন অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, একটি চক্র প্রতিপক্ষকে হয়রানি করতে আদালতের নাম ব্যবহার করে এ ধরনের ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা ডাকযোগে পাঠিয়ে দেয় সংশ্লিষ্ট মেট্রোপলিটন পুলিশ অথবা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে। এরপর ওই গ্রেফতারি পরোয়ানা যাচাই-বাছাই না করেই পাঠিয়ে দেয়া হয় সংশ্লিষ্ট থানায়। থানায় পৌঁছার পর আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পুলিশ আসামিকে গ্রেফতার করতে যায়। অথচ ভুক্তভোগী ব্যক্তি হয়তো মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানার ব্যাপারে আগাম কোন তথ্যই জানেন না। এক পর্যায়ে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। এভাবে নিরপরাধ ব্যক্তিরা পারিবারিক ও সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
পুলিশ সদর দফতরের অপরাধ শাখার সূত্র অনুযায়ী, গত বছর ঢাকাসহ সারাদেশে সহস্রাধিক ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা শনাক্ত হয়েছে। এসব ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা বিভিন্ন চক্র আর্থিক সুবিধা নিতে ও প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে তৈরি করেছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশন শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, একটি চক্র রয়েছে যারা এ ধরনের ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তৈরি করে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা আদায় করে। এ ধরনের চক্রের কয়েকজনকে ইতিমধ্যে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তবে পাঠানো গ্রেফতারি পরোয়ানাটি ভুয়া নাকি সঠিক তা যাচাই-বাছাই করা একটু কষ্টকর। অবশ্য এরকম যাচাই-বাছাই করতে গিয়েই অনেক গ্রেফতারি পরোয়ানা ভুয়া বলে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। তারপর ওই চক্রের কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের সদর দফতরসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার অভিযোগ বাক্সে এ ধরনের ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার অভিযোগ পড়ছে প্রায় প্রতিদিন। অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট দফতর তদন্ত করে এ ব্যাপারে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করছে।
সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক এডভোকেট শ.ম. রেজাউল করিম এ ব্যাপারে বলেন, ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তৈরি করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার অপরাধে সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল হতে পরে। এছাড়া পৃথক আইনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সরকারি কর্মচারীদের হয়রানি করার জন্য অভিযুক্তদের ৫ বছর সাজা দেয়ার বিধান রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের কথা:রাজধানীর মাতুয়াইল এলাকার শীতল ছায়া নামের বাড়ির চতুর্থ তলার বাসিন্দা ভুক্তভোগী বিপ্লব জানান, তার কাছে গত ৪ এপ্রিল যাত্রাবাড়ী থানার ওসি ফোন করে জানান যে তার নামে গাজীপুর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা এসেছে। গ্রেফতারি পরোয়ানা নম্বর-২৩/২০১০। ওসির ফোন পেয়ে বিপ্লব সশরীরে হাজির হন যাত্রাবাড়ী থানায়। গ্রেফতারি পরোয়ানার ব্যাপারে পুলিশের কাছে তিনি জানান যে তার বিরুদ্ধে কোন মামলা হয়েছে-এমন তথ্য তার জানা নাই। পরে ওসি’র পরামর্শে তিনি গাজীপুর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে সংশ্লিষ্ট মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানার কাগজ তুলে দেখেন, সেখানে তার নাম নেই। এজাহারে আসামির তালিকায়ও তার নাম নেই। এমনকি মামলার চার্জশিটেও বিপ্লবের নাম নেই। ২০১০ সালের ৫ আগষ্ট গাজীপুরের জয়দেবপুর থানায় দায়ের করা ওই মামলার বাদী দিলরুবা আক্তার। পরে বিপ্লব ওয়ারেন্টের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেতে ওই আদালতে একটি আবেদন করেন।
এ ঘটনার কিছুদিন পর বিপ্লবের নামে নারায়ণগঞ্জ চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নামে তৈরি করা আরো একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা আসে যাত্রাবাড়ী থানায়। বিপ্লব ঐ গ্রেফতারি পরোয়ানার স্মারক নম্বর নিয়ে ঐ আদালতে আবেদন করে জানতে পারেন, এটিও ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা। বিপ্লব বলেন, তার বিরুদ্ধে দুইটি ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পর সামাজিকভাবে তার সম্মানহানি ঘটেছে। প্রতিবেশী ও বন্ধুদের সামনে তিনি লজ্জায় যেতে পারছেন না।
৭০ বছরের বৃদ্ধ রফিকুল ইসলামকে গ্রেফতারের জন্য গত বছরের জুনে বাড্ডা থানা পুলিশ তার বাসায় অভিযান চালায়। এ সময় রফিকুল ইসলাম বাসায় না থাকায় গ্রেফতার থেকে রক্ষা পান। পরে রফিকুল ইসলাম থানায় যোগাযোগ করে জানতে পারেন, তার বিরুদ্ধে আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা হয়েছে। পুলিশ তাকে জানায়, আদাবরের শেখেরটেকের মোহাম্মদ আলীর মেয়ে বিউটি তার নামে মামলাটি করেছেন। পরে আদাবর থানা পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারে বিউটি নামের মেয়েটি যে ঠিকানা ব্যবহার করেছিল, সেখানে ওই নামের কেউ থাকে না। আগে কখনো ওই নামে কেউ ছিল না। পুলিশ নিশ্চিত হয়, মামলার বাদী ভুয়া।
