সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নয় বাংলাদেশির মৃত্যু

আপডেট : ১৩ মে ২০১৪, ২৩:০৩
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে এক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে ৯ বাংলাদেশি মারা গেছেন। এদের বেশিরভাগেরই বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। এ ঘটনায় আরো দুই ভারতীয় নাগরিকেরও মৃত্যু হয়েছে। সোমবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১০টার দিকে একটি সোফা তৈরির কারখানায় এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ঘটনার পর রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা হাসপাতালেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। অগ্নিকাণ্ডে হতাহতদের বিস্তারিত পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য দূতাবাস দ্রুত প্রেরণ করবে। নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে সাতজনের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। এরা হলেন-জেলার হোমনা উপজেলার চাঁন্দেরচর ইউনিয়নের চাঁন্দেরচর গ্রামের রমজান বেপারীর পুত্র সেলিম মিয়া (৩৫), একই গ্রামের ইসমাইল হোসেনের পুত্র বাহাউদ্দিন (২৬), আছাদপুর ইউনিয়নের কলাগাছিয়া গ্রামের আবদুল করিমের পুত্র মতিউর রহমান (৩৫), জেলার তিতাস উপজেলার ভিটিকান্দি ইউনিয়নের দুলারামপুর গ্রামের রুস্তম আলীর পুত্র জালাল (৩৫), কালিপুর গ্রামের হাবিবুর রহমানের পুত্র শাহ আলম (২৬), নারান্দিয়া ইউনিয়নের নারান্দিয়া গ্রামের জমসের আহম্মদের পুত্র নাজির হোসেন (২৫) এবং মেঘনা উপজেলার চন্দনপুর ইউনিয়নের শিবনগর গ্রামের নুরুল ইসলামের পুত্র আবদুল গাফ্ফার (২৫)। নিহত বাকি দুই জনের মধ্যে মোহাম্মদ আক্কাসের বাড়ি মাদারীপুরে এবং জাকির হোসেনের বাড়ি ফেনীতে। দূতাবাস সূত্র জানায়, রিয়াদের উপকণ্ঠে শিফা সানাইয়া এলাকার ঐ সোফা তৈরির কারখানার মালিক একজন বাংলাদেশি। ঐ কারখানার বেশিরভাগ শ্রমিকও বাংলাদেশি। ঘটনার সময় ১৩ জন বাংলাদেশি শ্রমিক কারখানায় ছিলেন। এর মধ্যে চারজন প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হন। সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহিদুল ইসলাম বলেন, নিহতদের শরীর এতটাই পুড়েছে যে কাউকেই চেনা যাচ্ছে না। তবে জীবিত শ্রমিকরা জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে নয়জনই বাংলাদেশি শ্রমিক। মরদেহগুলো বর্তমানে রিয়াদের সমোচি হাসপাতালে রাখা হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। তবে মরদেহগুলো কবে নাগাদ দেশে ফেরত আনা হবে সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছুই জানানো হয়নি। উল্লেখ্য, এর আগেও সৌদি আরব, বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশি শ্রমিকের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কুমিল্লায় সাত বাড়িতে শোকের মাতম কুমিল্লা প্রতিনিধি, দাউদকান্দি ও হোমনা সংবাদদাতা জানান, সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত কুমিল্লার ৭ জনের মধ্যে ৩ জনের বাড়ি তিতাস উপজেলায়, ৩ জনের হোমনায় এবং ১ জনের মেঘনা উপজেলায়। গতকাল মঙ্গলবার ভোর থেকে গণমাধ্যমে এ অগ্নিকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহতদের পরিবার সৌদি আরবে যোগাযোগ করে তাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিদেশের মাটিতে গিয়ে অকালে লাশ হওয়ার খবরে পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আত্মীয়-স্বজনসহ শত শত মানুষ ছুটে আসেন অসহায় পরিবারগুলোর পাশে। স্বজনদের কান্নায় এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে। পরিবারগুলোর দাবি, সরকার যেন তাদের সন্তানদের লাশ দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থা করে। এদিকে অগ্নিকাণ্ডের শিকার সৌদি আরবের রিয়াদের সিফা সানাইয়া এলাকার ‘হিলা সোফা ফ্যাক্টরী’র পরিচালক (দায়িত্বপ্রাপ্ত) ময়নাল জানান, ফ্যাক্টরীতে বাংলাদেশের প্রায় ১৩ জন কাজ করেন। এদের মধ্যে তার ভাই রাইজুদ্দিন ও বিল্লালও আছে। ঘটনার পর থেকে তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আরো জানান, ৬ মাসের ছুটিতে তিনি দেশে এসেছেন। তবে অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে তিনি কিছুই বলতে পারেন নি। ছেলেকে দেখা হলো না বাহাউদ্দিনের হোমনা উপজেলার নিহত বাহাউদ্দিনের ভাতিজা নূরে আলম বাবু হাউমাউ করে কেঁদে জানান, পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে বিয়ের ২ মাস পর ১৬ মাস আগে সৌদি আরব যান তার চাচা বাহাউদ্দিন। বিদেশে যাওয়ার পর একমাত্র পুত্র সন্তান আবদুল্লাহ (১৪ মাস) জন্মগ্রহণ করে। তাকে দেখার জন্য কয়েকবার দেশে ফেরার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেও আর্থিক অনটনের কারণে তার আর দেশে আসা হয়নি। সর্বশেষ ২ দিন আগে স্ত্রী শাহেনা বেগমের নিকট ছেলেকে দেখার আকুতি জানিয়ে ২ মাস পর দেশে আসার কথা জানালেও এখন তাকে ফিরতে হচ্ছে লাশ হয়ে। এদিকে স্বজনদের জড়িয়ে ধরে কান্নায় বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন উপজেলার আরেক নিহত শ্রমিক সেলিমের স্ত্রী তাসলিমা। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তার শাশুড়ি ও দুই সন্তান। নিহত অপর শ্রমিক মতিউরের চাচাতো ভাই ছাদেক মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, মতিউরের রাকিব (৬), মৃত্তিকা (৩) নামে দুই সন্তান রয়েছে। গত সোমবার সকালে সে তার স্ত্রী রশিদা বেগমের সাথে মোবাইল ফোনে সর্বশেষ কথা বলে। আগামী রমজানের ঈদে সে বাড়ি আসবে বলে জানিয়েছিল। তার অকাল মৃত্যুতে তারা এখন শুধুই চোখে অন্ধকার দেখছেন। বাড়ি ফেরা হলো না নাজিরের তিতাস উপজেলার দক্ষিণ নারান্দিয়া গ্রামের মৃত জমসের আলীর ছেলে নাজির বার বছর যাবত্ সৌদিতে চাকরিরত। অভাব অনটনের কারণে ১২ বছরের মধ্যে একবারও দেশে আসেনি নাজির। ৫ ভাইয়ের মধ্যে নাজির দ্বিতীয়। ছোট ভাই আজিজুল হক জানায়, সোমবার বিকাল ৫টায় ভাই ফোন করে বাড়ির সকলের খোঁজ খবর নেয় এবং আগামী ঈদে বাড়ি আসবে বলে জানায়। কিন্তু তার আর বাড়ি ফেরা হলো না। এখনও বাবার মুখ দেখেনি ঝুমুর উপজেলার দুলারামপুর চাঁনপুর গ্রামের হাজী রোস্তম আলীর ছেলে জালাল নিহত হওয়ায় বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তার স্ত্রী সখিনা বেগম। জালালের ৮ বছরের ছেলে সাজ্জাদ ও ৫ বছরের মেয়ের নাম ঝুমুর। জন্মের পর ঝুমুর তার বাবার মুখ দেখেনি বলে জানালেন সখিনা। তিনি বলেন, ‘সোমবার রাতেও ঝুমুর তার বাবার সাথে কথা বলেছে, বাবাকে বলেছে এ ঈদে বাড়ি আসতে। বাবাও বলেছে আসবে।’ এদিকে সন্তানের মৃত্যুর খবর শুনে বাবা রোস্তম আলী ও মা মিনারা বেগম পাগলপ্রায়। জালালের বোনের জামাই ডা. মো. রুহুল আমিন জানান, জালাল ৫ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। ৮ বছরের প্রবাস জীবনে প্রায় ৬ বছর আগে সে একবার বাড়িতে এসেছিল। হাতের মেহেদী শুকানোর আগেই বিধবা হলেন রুমি তিতাসের কালিপুর গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে শাহ আলম আড়াই মাস হয়েছে সৌদি আরবে যান। শাহ আলম বিদেশ যাওয়ার এক মাস পূর্বে বিয়ে করেন পাশের কাশিপুর গ্রামের রুমি আক্তারকে। সোমবার রাতে স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে মেনে নিতে পারছেন না রুমি। বোবাকান্না বুকে বেঁধে ছলছল চোখে সবার দিকে তাকিয়ে থাকেন। হাতের মেহেদী শুকানোর আগেই বিধবা হয়ে রুমি আক্তার এখন পাগলপ্রায়। বাবা হাবিবুর রহমানও ছেলেকে হারিয়ে বিছানায় সংজ্ঞাহীন।