কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার শিলাইদহে নানা আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৩তম জন্মজয়ন্তী উত্সব। ২৫ বৈশাখ শিলাইদহ কুঠিবাড়ি আঙিনায় তিন দিনব্যাপী উত্সব আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন কুঠিবাড়ি আঙিনার মূল মঞ্চে পরিবেশন করেন রবীন্দ্রসংগীত, নাটক, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্য। এছাড়া মূল আঙিনার বাইরে চলে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা। উত্সবের দ্বিতীয় দিনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী আখতার হোসেন ও সমাপনী দিনে কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুর রউফ আলোচনা পর্বে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন। কবিগুরু জন্মোত্সব ঘিরে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি আঙিনা বর্ণিল সাজে সজ্জিত হয়।
উল্লেখ্য, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ কুঠিবাড়ি। যা কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নে অবস্থিত। কোম্পানির শাসনামলের অনেক আগে থেকেই, পদ্মা ও গড়াই নদীর জলপ্রবাহের কারণে এখানে একটি গভীর জলাশয় সৃষ্টি হয়েছিল। স্থানীয় ভাষায় এই জলাশয়কে বলা হতো দহ। ইংরেজ শাসনামলে এই অঞ্চলে নীলচাষ শুরু হলে শেলি নামক জনৈক নীলকুঠিয়াল এই দহের পাড়ে একটি কুঠিবাড়ি তৈরি করেন। গোড়াতে এই কুঠিয়ালের নামে দহটি ‘শেলির দহ’ নামে পরিচিত হয়। ওই নামই কালক্রমে হয়ে ওঠে শিলেদা, শেলাইদহ, শিলাইদহ। এখনও পদ্মার দুই পাড়ের মানুষেরা এই স্থানটিকে শিলেদা বা শিলাইদ বলে থাকেন।
উত্তরাধিকার সূত্রে এই কুঠিবাড়ির মালিকানা পান দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ আসেন তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে। মাত্র কয়েকদিন পর তিনি কলকাতায় ফিরে যান। এরপর ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে এসেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সাথে।
১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ২৫ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ সদলবলে শিলাইদহে আসেন। এসময় তাঁর সাথে ছিল স্ত্রী মৃণালিনী দেবী, কন্যা বেলা, পুত্র রথীন্দ্রনাথ, মৃণালিনী দেবীর সহচরী ও বলেন্দ্রনাথ।
কবিগুরু দীর্ঘ ১০ বছর একটানা কুমারখালির শিলাইদহে কাটিয়েছেন। ৩০ বিঘা জমি নিয়ে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি আঙিনা। আড়াইতলা এ বাড়িটিতে রয়েছে ১৭টি কক্ষ। বাড়িটির কক্ষ ও বারান্দাজুড়ে প্রদর্শনীর জন্য রয়েছে কবির ব্যবহূত ১টি পালঙ্ক, লেখার টেবিল, ইজি চেয়ার, নদীতে চলাচলের দুটি বোট ‘চঞ্চল’-‘চপলা’, ৬ বিহারা ও ৮ বিহারার ২টি পালকি, লোহার সিন্দুক ১টি, খাজনা আদায়ের টেবিল ১টি, রোলার ১টি, আটকোনা টেবিল ১টি, গদি চেয়ার ২টি, সোফা ২টি, আলনা ১টি, কাঠের আলমিরা ৪টি, ফাইল কেবিনেট ১টি ঘাষকাটা যন্ত্র, পানি শোধন যন্ত্র ১টি, বিভিন্ন সময়ে কবিকে ঘিরে তোলা আলোকচিত্র, কবির নিজের আঁকা ছবি ইত্যাদি। এবার ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী শিলাইদহ পরিদর্শনে এসে কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত ২১টি আলোকচিত্র উপহার দিয়েছেন।
কুঠিবাড়িটির বাইরের দিক রেড অক্সাইড জাতীয় রঙের প্রলেপ ছিল। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে শতবর্ষী রং রেড অক্সাইডকে মুছে দিয়ে সাদা চুনকাম করা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদকে এভাবে পরিবর্তন করাকে অনেকে আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু তারপরেও এই কুঠিবাড়ি তার আগের লাল রং ফিরে পায়নি। অন্যান্যবার রবীন্দ্র জন্ম উত্সব উপলক্ষে নতুন করে রং করা হলেও এবার সিদ্ধান্তহীনতার কারণে তা হয়নি। বর্তমানে শিলাইদহের সৌন্দর্যমণ্ডিত কুঠিবাড়িটি জৌলুস হারিয়ে বিবর্ণ ও শ্রীহীন হয়ে পড়েছে।
পাকিস্তান আমলের শুরুর দিকে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি পরিত্যক্ত এবং অবহেলার সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। ১৯৫৩ সালের দিকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ৩২ বিঘা জমিসহ শুধুমাত্র কুঠিবাড়ির মূল আঙিনা সংরক্ষণের দায়িত্ব নেয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার বিশেষ যত্ন নিয়ে এই কুঠিবাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করছে। তবে বিশেষভাবে মূল কাচারীবাড়ি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে গড়া দি মহর্ষি দাতব্য চিকিত্সালয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সংরক্ষণের জন্য না নেওয়ায় বর্তমানে তা ধ্বংসের পথে। যে কাচারী বাড়িতে বসে জমিদারির খাজনা আদায় করেছেন রবীন্দ্রনাথ, যেখানে রয়েছে অসংখ্য স্মৃতি সেই কাচারী বাড়িটি সংস্কারপূর্বক সংরক্ষণের দাবি রবীন্দ্র ভক্তদের।
