উপমহাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের পাবনার স্মৃতিবিজড়িত বাড়িতে ‘সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা’ স্থাপনে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করার অনুমতি চেয়ে বাড়িটির দখলদার ইমাম গাজ্জালি ট্রাস্টের লিভ টু আপিল খারিজ করে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
রবিবার সকালে মহানায়িকার পৈতৃক বাড়িটি নিয়ে লিভ টু আপিল খারিজ করে দেন বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগ। এর ফলে ইমাম গাজ্জালি ট্রাস্টের কাছ থেকে দখলমুক্ত করে বাড়িটিতে সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা স্থাপনে আর কোনো বাধা রইল না। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা। ইমাম গাজ্জালি ট্রাস্টের পক্ষে ছিলেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী।
জানা যায়, পাবনা শহরের পৌর এলাকার গোপালপুর মহল্লার হেমসাগর লেনে জন্ম সুচিত্রা সেনের। এই বাড়িতে বাবা-মা ও ভাই বোনের সঙ্গে শৈশব-কৈশোর কাটে সুচিত্রা সেনের। তার বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন পাবনা পৌরসভার স্যানেটারি ইনস্পেক্টর। চাকরির সুবাদে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়ে হেমসাগর লেনে এই একতলা বাড়িতে বসবাস করতেন। করুণাময় দাশগুপ্তের মেয়ে সুচিত্রা সেন ওরফে রমা ১৯৪৬-৪৭ সালে পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস নাইনে পড়ার সময় কলকাতায় চলে যান। ১৯৫১ সালের মাঝামঝি সময়ে সুচিত্রা সেনের বাবা স্ব-পরিবারে কলকাতায় চলে যান। সে সময় জেলা প্রশাসন উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসনের জন্য সুচিত্রা সেনের পৈতৃক ভিটা গোপালপুর মৌজার এসএ ৯৯ খতিয়ানভুক্ত ৫৮৭ এসএ দাগের ০ দশমিক ২১২৫ একর বাড়িটি রিক্যুইজিশন করেন। এরপর থেকে বাড়িটিতে সরকারি বিভিন্ন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা বসবাস করতে থাকেন এবং সর্বশেষে ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট। ১৯৮৭ সালে এরশাদ সরকারের সময়ে স্থানীয় কতিপয় জামায়াত নেতা বাড়িটি অর্পিত সম্পত্তিতে পরিণত করে একসনা লিজ নিয়ে ‘ইমাম গাজ্জালী ইনস্টিটিউট’ নামের একটি কিন্ডার গার্টেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।
পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চ ইমাম গাজ্জালী ইনস্টিটিউটের নামে বাত্সরিক ইজারা দেওয়া হয়। এর পর বাত্সরিক টাকা পরিশোধ না করার কারণে ভূমি মন্ত্রনালয় ১৯৯৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রাজস্ব/ভিপি/৫৯৮ নং স্মারকে ইমাম গাজ্জালী ইনস্টিটিউটের নামে দেওয়া বাত্সরিক ইজারা বাতিল করে। বাত্সরিক ইজারা বাতিল না করার জন্য ইমাম গাজ্জালী ইনস্টিটিউটের পক্ষে আবেদন করলে সচিব ভূমি মন্ত্রণালয় বিধি মোতাবেক বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য জেলা প্রশাসক পাবনাকে নির্দেশ দেন। ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ বকেয়া পাওনা পরিশোধ করে ইজারা নবায়নের আবেদন করলে জেলা প্রশাসক নবায়নের আবেদন মঞ্জুর করেন। এ অবস্থায় স্থানীয় প্রগতিশীল সংগঠনগুলো সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়িটি দখলমুক্ত করে ‘সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা’ করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে ২০০৯ সালের ২২ জুন পাবনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বাড়িটির ইজারা নবায়ন স্থগিত করে সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার জন্য বাড়িটির দখল ছেড়ে দেওয়ার জন্য ইমাম গাজ্জালী ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষকে পত্র জারি করেন। ইমাম গাজ্জালী ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ বাড়িটির দখল ছেড়ে না দিয়ে ইজারা বলবত্ রাখার জন্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। ২০১০ সালের ৬ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রিট পিটিশন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থাগিতাদেশ বলবত্ রাখার আদেশ দেয়। ২০১১ সালের ২৬ জুলাই এ রিট খারিজ এবং বাড়িটি দখলমুক্ত করে সেখানে সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা স্থাপনের আদেশ দেয় হাইকোর্ট। এরপর হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের আবেদনের অনুমতি চেয়ে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দায়ের করে ইমাম গাজ্জালি ট্রাস্ট। গত রবিবার এ লিভ টু আপিল খারিজ করে দেওয়া হয়।
পাবনা মধ্য শহরের গোপালপুর মহল্লার হেমসাগর লেনে অবস্থিত বাংলা সিনেমার তথা উপমহাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের বাড়ি আইনি প্রক্রিয়ায় দখলমুক্ত হওয়ার খবরে স্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন সন্তোষ প্রকাশ করেছে। বাড়িটি স্থানীয় জামায়াত দুই যুগেরও বেশি সময় দখলে নিয়ে ইমাম গাজ্জালী ইনস্টিটিউট নামে একটা স্কুলের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল। এতদিন জেলার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ‘সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ’-এর ইচ্ছা ছিল, আইনি প্রক্রিয়ায় দখলমুক্ত করা সুচিত্রার পৈতৃক ভিটা। গতকাল মহামান্য আদালতের রায় অনুকূলে আসায় পাবনার মেয়ে হিসেবে সুচিত্রার বাড়ি এখন দখলমুক্ত করে আর বাধা নেই সুচিত্রা সংগ্রহশালা করার।
গত সরকারের আমল থেকেই সুচিত্রা সেনের পৈতৃক ভিটা জামায়াতের কবল থেকে উদ্ধার করে সেখানে সুচিত্রা আর্কাইভ বা সংগ্রহশালা করার জন্য স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জোরালো দাবি জানান। আন্দোলন সংগ্রামের এক পর্যায়ে ‘সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ’ নামের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি এম সাইদুল হক চুন্নুসহ প্রগতিশীল সাংস্কৃতিমনা ব্যক্তিরা গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে জেলা প্রশাসনের কাছে বাড়িটি দখলমুক্ত করার জন্য লিখিত আবেদন জানান।
পাবনাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ২২ জুন পাবনার অতিরিক্ত জেলা প্রাশসক (রাজস্ব) ইমাম গাজ্জালী ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের একসনা লিজ বাতিল করেন এবং ৮ জুলাই ২০০৯-এর মধ্যে অর্পিত সম্পত্তির দখল ছেড়ে দেওয়ার জন্য নোটিশ প্রদান করেন। নোটিশ পাওয়ার পর ইমাম গাজ্জালী ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা হাইকোর্টে লিজ বাতিলের বিরুদ্ধে আবেদন জানিয়ে রিট করেন।
পাবনা একুশে বই মেলা পরিষদের আহ্বায়ক জাকির হোসেন ইত্তেফাককে জানান, ২০১১ সালে হাইকোর্ট সেই রিট খারিজ করে দিলে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের এপিলেট ডিভিশনে আপিল করেন। মামলাটি গতকাল খারিজ হয়েছে। এখন সুচিত্রা সংগ্রহশালা করা হবে। পাবনা থিয়েটার ৭৭-এর সম্পাদক আবুল কাশেম বললেন, ‘এই রায় সাংস্কৃতিসেবীদের বড় অর্জন।’ সুচিত্রার বাড়ি সংলগ্ন প্রতিবেশী সিনিয়র আইনজীবী শফিকুল ইসলাম শিবলী জানান, ‘দীর্ঘসময় লাগলেও আইনি প্রক্রিয়ায় ঘটনার সমাধান হয়েছে। এখন উচিত, সবাই মিলে সুচিত্রাসংগ্রহশালা করে সুচিত্রাকে আরও সম্মানিত করা।’
রায় প্রসঙ্গে আলাপকালে ট্রাস্টি বোর্ডের সেক্রেটারি ও জেলা জামায়াতের প্রচার সেক্রেটারি আবিদ হাসান দুলাল এই প্রতিনিধিকে জানান, তারা কোনোভাবেই বাড়ি দখল করে ছিলেন না। গত প্রায় ২৫ বছর যাবত সরকারের নিয়ম মেনে ট্যাক্স দিয়ে সেখানে স্কুলের কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন। এখন কী করবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। রায়ের কপি হাতে এলে রিভিউ করার সুযোগ থাকলে করা হবে। না করার সুযোগ থাকলে ছেড়ে দেওয়া হবে। তিনি দাবি করেন, ২০০০ সালের ১৭ আগস্ট সুচিত্রা সেনের পরিবারের সদস্যরা পাবনাতে এসে স্কুলটি পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
তার কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করে পাবনা জেলা পরিষদের প্রশাসক এবং সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি এম. সাইদুল হক চুন্নু জানান, আমরা কোনো স্কুল উচ্ছেদ হোক তা চাই না। এই স্কুলের আধা কিলোমিটারের মধ্যে জামায়াতের ‘ইমাম গাজ্জালী স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ নামের আরও একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। খুব সহজেই জামায়াত এই স্কুলের কার্যক্রম ওই স্কুলের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারে। তা না করে শুধুমাত্র ভবনটি দখলে রাখার জন্য সেখানে এই স্কুলটি চালানো হচ্ছিল। তিনি আরও বলেন, এখন রায়ের কপি হাতে এলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক, পেশাজীবী সংগঠনের সাথে বসে বাড়িটিতে কী করা যায় ভাবা হবে। সরকারের কাছেও সহযোগিতা চাওয়া হবে। সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংক্ষরণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. রামদুলাল ভৌমিক বলেন, পাবনাবাসী তথা আমাদের র্দীঘদিনের দাবির ফসল আজ আমরা ঘরে তুললাম। আমরা আশা করি সরকার খুব দ্রুত বাড়িটি দখলে নিয়ে সেখানে সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংগ্রহশালা গড়ে তুলবে।
