এদেশের সিনেমাপ্রেমী বয়োজ্যেষ্ঠ দর্শকের কাছে ভীষণ প্রিয় এক নায়িকার নাম শবনম। এখনও সেসব দর্শক শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তাকে। শবনম এমন কিছু কাজ করে গেছেন যা তাকে অনন্তকাল দর্শকের মাঝে বাঁচিয়ে রাখবে। তার শৈল্পিক অভিনয় দিয়েই কোটি কোটি দর্শকের মন জয় করেছিলেন এবং সেই মনে এখনও শবনমের স্থলাভিষিক্ত আর কেউই হতে পারেননি। শুধু বাংলাদেশ নয়, পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তানেও তিনি যুগের পর যুগ সমান জনপ্রিয়তা নিয়ে ছবিতে নায়িকা হিসেবেই অভিনয় করে গেছেন। নিজের ছকে বাঁধা জীবন থেকে বেরিয়ে ব্যক্তিজীবনের অনেক কথা নিয়ে এই প্রথম তিনি খোলাখুলি কথা বলেছেন। লিখেছেন নূপুর বন্দোপাধ্যায়
এক যুগেরও বেশি সময় চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শক আপনাকে খুব মিস করছে, কেন এখন নতুন ছবিতে আপনাকে দেখা যায় না?
পাকিস্তান থেকে নিজ দেশে একেবারেই চলে আসি ১৯৯৮ সালে। আমি কিন্তু বাংলাদেশেরই মেয়ে, এটা অনেকেই জানেন না। পাকিস্তানের ছবিতে বেশি কাজ করেছি বলে অনেকেই মনে করেন আমি পাকিস্তানের। আবার আমি কিন্তু বিগত প্রায় ষোলো বছর যাবত ঢাকাতেই থাকছি। সেটাও অনেকেই জানেন না। ঢাকায় একেবারে চলে আসার পর চলচ্চিত্র নির্মাতা কাজী হায়াতের ‘আম্মাজান’ ছবিতে ১৯৯৯ সালে অভিনয় করি। এরপর কিন্তু আমি আজও ভালো মৌলিক গল্পের কোনো ছবি পাইনি। ভালো গল্প পাইনি বলেই শিল্পী হিসেবে আমার দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই কোনো ছবিতে অভিনয় করিনি। তার মানে এই নয়—আমি ভালো মৌলিক গল্প পেলে অভিনয় করব না।
অনেক বছর বিরতি নিয়ে যখন এদেশের চলচ্চিত্রে আবার কাজ শুরু করলেন ‘আম্মাজান’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্যদিয়ে, তখন সেই সময় আর এই সময়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য বিশেষভাবে চোখে পড়ত কি?
আসলে আমাদের সময়কার কথা তো বলে এখন আর কোনো লাভ নেই। বলতেও চাই না, কারণ বললে অনেকেই বিশ্বাসও করতে চাইবেন না। তখন তো সবার মাঝে এক ধরনের আত্মিক সম্পর্ক ছিল, যা ভাবাই যায় না এখন। সবার প্রতি সবার একধরনের শ্রদ্ধাবোধ ছিল, যা এই সময়ে একেবারেই অনুপস্থিত। শুটিং স্পটে দেরি করে আসাটা তো এখন এখানে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে একটা সত্য কথা না বললেই নয়, আমি যখন ‘আম্মাজান’ ছবির শুটিং করি, প্রথম দিন সকাল আটটায় আমি স্পটে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন মান্না এসেছিল দুপুর দুইটায়। পরে আমার আসার বিষয়টি যখন সে জানতে পারে, তখন খুব অনুশোচনা হয়েছিল তার এবং এর পরেরদিন থেকে যে সময় বেঁধে দেওয়া হতো সেই সময়ের পরে আসতে তাকে আমি দেখিনি। আসলে একজন শিল্পীই কিন্তু একটি ইউনিটের অনেক বড় অনুপ্রেরণা। শিল্পীই যদি সঠিক সময়ে স্পটে না আসে তাহলে কাজ করার অনুপ্রেরণাটা আসবে কোত্থেকে। আরেকটু বলতে চাই ‘আম্মাজান’ ছবিতে মান্না এতটাই ভালো অভিনয় করেছিল যে, মনে হয়েছিল এই চরিত্রটিতেই অভিনয়ের জন্য মান্নার জন্ম হয়েছিল।
চলচ্চিত্রের সাথে আপনার সম্পৃক্ততার শুরুর কথা একটু জানতে চাই।
চলচ্চিত্রে আসার অনেক আগে থেকেই আমি নাচের সাথে জড়িত ছিলাম। বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে আমি নাচ শিখতাম। এহতেশাম পরিচালিত ‘এদেশ তোমার আমার’ ছবিতে তখন একটি গানে বেশ কয়েকজন নাচের মেয়ের দরকার হয়ে পড়ে। তখন আমাদের বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকেই কয়েকজনকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই দলে আমিও ছিলাম। এরপর ‘রাজধানীর বুকে’ ছবিতে আমি একটি একক নৃত্যে অংশগ্রহণ করি। তার পরপরই এহতেশাম আমাকে ও রহমানকে নিয়ে শুরু করেন ‘হারানো দিন’ ছবিটি। এরপর একে একে অনেক ছবিতে কাজ করলাম।
তারপর তো অনেক উর্দু ছবিতে আপনি অভিনয় করেছিলেন, প্রথম দিকে কি উর্দু ছবিতে কাজ করতে অসুবিধা হতো?
অবশ্যই হয়েছিল। কারণ উর্দু তো আমার ভাষা ছিল না। এই ভাষাটিকে আয়ত্ত করার একটা বিষয় ছিল। এফডিসির একজন সাউন্ড রেকর্ডিস্ট ছিলেন মোহসীন, তিনি এবং সুরুর বারা বাংকেভীর সহযোগিতায় আমি উর্দু ভাষা আয়ত্ত করতে পেরেছিলাম। যে কারণে পরে আর তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি। অনায়াসে কাজ করে গেছি একের পর এক উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রে যখন আমার শুরু তখন তো রহমান ছাড়া আর কোনো নায়কই ছিল না। তাই চয়েজের কোনো অপশনও ছিল না। তাই সে সময় যত ছবিতে কাজ করেছি, আমি আর রহমানই ছিলাম জুটি।
আপনার স্বামী রবিন ঘোষ এই উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক, তারসাথে পরিচয় এবং বিয়ে সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলাম।
এহেতশামের ‘হারানো দিন’ ছবির কাজ করতে গিয়েই তার সাথে আমার পরিচয়। রিহার্সেলের সময় দেখা হতো আমাদের। তাছাড়া আমাদের উভয় পরিবারের মধ্যে পারিবারিক বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্ক ছিল। যে কারণে আমাদের মাঝে সম্পর্কের একটা সুযোগও তৈরি হয়ে যায়। ভালোলাগা থেকেই উভয় পরিবারের সম্মতিতে ১৯৬৫ সালে আমরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। সেই থেকে আজও দুজন সুখে দুঃখে একসাথেই বাস করছি। আমাদের একমাত্র ছেলে রনি ঘোষ দেশের বাইরে থাকে।
এখানে কিংবা ওখানে কী উর্দু ভাষাতেই অভিনয় করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন?
নিজের ভাষায় কথা বলার মতো ভালোলাগা কী আর অন্য কোনো ভাষায় হতে পারে? পারে না। উর্দু ভাষাতে অভিনয় করেছি আসলে প্রফেশনালিজমের কারণে। বাংলা ভাষার ছবিতেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম।
ওয়াহিদ মুরাদের ছবিতে আপনি প্রথম অভিনয় করেছিলেন?
ওয়াহিদ মুরাদের নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা ছিল। তার প্রযোজিত ছবিতেই আমি প্রথম কাজ করার সুযোগ পাই। ছবিটির নাম ‘সামান্দার’। এই ছবিতে আমার নায়কও ছিলেন ওয়াহিদ মুরাদ। নাদিমের সাথে আমি সর্বপ্রথম জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করি সুরুর বারা বাংকেভী পরিচালিত ‘তুম মেরে হো’ ছবিতে। তার সাথেই সবচেয়ে বেশি ছবিতে আমি জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করেছি।
কোন নায়ক আপনার চোখে সেরা?
আসলে পাকিস্তানে আমি অনেক নায়কের বিপরীতেই নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছি। প্রত্যেকেই নিজের অবস্থানে থেকে বেশ ভালো ছিলেন। যেমন বলা যায় রোমান্টিক নায়ক হিসেবে ওয়াহিদ মুরাদ ছিলেন অনন্য। আবার অন্যদিকে মোহাম্মদ আলী অ্যাকশন এবং ড্রামাতে ছিলেন অসাধারণ। তবে নাদিমও একজন অসাধারণ নায়ক। তার সাথেই আমার সবচেয়ে বেশি কাজ করা হয়েছে। তার সাথে পারিবারিক একটা বন্ধুত্ব ছিল আমাদের, কারণ ছবির জগতে কিন্তু আমার এহতেশামের হাত ধরেই আসা। আবার এহতেশামের মেয়ে ফারজানাকেই বিয়ে করেছেন নাদিম। সেই হিসেব পাকিস্তানে আমাদের বন্ধনটা ছিল অন্যরকম।
পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘নিগার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছিলেন আপনি ‘চান্দা’ ছবিতে পার্শ্ব-চরিত্রে অভিনয় করেই। এরপর আর কতবার পেয়েছেন এই অ্যাওয়ার্ডটি?
‘চান্দা’ ছবিতে অভিনয় করে সর্বপ্রথম পার্শ্ব-চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘নিগার অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করি। তবে ১৯৬৫ সালে একজন নায়িকা হিসেবে সর্বপ্রথম এই অ্যাওয়ার্ড লাভ করি ‘তালাশ’ ছবিতে অভিনয় করে। মোস্তাফিজ পরিচালিত এই ছবিতে আমার বিপরীতে অভিনয় করেন নায়ক রহমান। এরপর ১৯৭১ সালে ‘দোস্তি’, ১৯৭৩ সালে ‘আনমোল’ , ১৯৭৪ সালে ‘দিল লাগি’, ১৯৭৫ সালে ‘জিনাত’, ১৯৭৭ সালে ‘আয়না’, ১৯৭৯ সালে ‘পাকিজা’, ১৯৮০ সালে ‘হামদোনো’, ১৯৮১ সালে ‘কোরবানি’, ১৯৮৩ সালে ‘কাবি আল বিদা না কেহনা’ ও ১৯৮৫ সালে ‘নারাজ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য এই সম্মাননা লাভ করি। নিগার অ্যাওয়ার্ড টানা ১৩ বছর আমি পেয়েছি, যা পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত রেকর্ডই বলা চলে। পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলাম দুটি ছবিতে অভিনয়ের জন্য। হাসান আজগারী পরিচালিত ‘দুরিয়া’ ও পারভেজ মালিক পরিচালিত ‘গোমনাম’-এর জন্য।
‘নাচের পুতুল’ ছবির বিখ্যাত গানটি দিয়েই শেষ করতে চাচ্ছি
‘নাচের পুতুল’ ছবির ‘আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন কপোলের কালো তিল পড়বে চোখে’ গানটি এখনও অনেক শ্রোতা-দর্শকের কাছে অনেক পছন্দের। এই ছবিতে আমার বিপরীতে ছিলেন নায়ক রাজ্জাক। ছবিটির পরিচালক ছিলেন অশোক ঘোষ। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার পরিচালিত ‘সন্ধি’ ছবির একটা চিঠি লিখে দাও তুমি সবারে জানাও, আসামি হয়েছে স্বামী চোখে দেখে যাও’ গানটিও বেশ শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। এই গানে লিপসিং করেছিলাম আমি ও রাজ্জাক। ‘নাচের পুতুল’, ‘সন্ধি’ ছাড়া ঢাকার ‘সন্দেহ’, ‘কারণ’, ‘সহধর্মিণী’, ‘শর্ত’, ‘যোগাযোগ’, ‘জুলি’, ‘বশিরা’, ‘দিল’সহ আরও বেশ কিছু ছবিতে
অভিনয় করি। মূলত পরবর্তী সময়কালে ঢাকার যতগুলো ছবিতেই আমি অভিনয় করেছি তার সবগুলোই ছিল ব্যবসাসফল।
