বিভাজন নয়, হোক স্বপ্ন সম্প্রসারণ

আপডেট : ১৪ মে ২০১৪, ২০:০৮
মাত্র কিছুদিন আগে এর আর রহমানের কনসার্টকে কেন্দ্র করে মাইলস ও এলআরবির নতুন দূরত্ব তৈরি হলো। বিষয়টিকে অভিমান, দ্বন্দ্ব, ন্যায়-অন্যায় না বলে দূরত্ব বলাটাই সঠিক। যা রকপ্রিয় তরুণের জন্য খুবই মন খারাপের খবর। ওই ঘটনার কিছুদিন বাদেই বিভিন্ন মিডিয়া হাউজে পৌঁছল এলআরবির প্যাডে প্রেস রিলিজ, বামবার সাথে তাদের আর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অথচ বিষয়টি বামবা বা কোনো সংগঠনিক দ্বন্দ্ব বা ভুল বোঝাবুঝি ছিল না! সেখানে মাইলসের আক্ষেপ ছিল—আয়োজক ও আগের ব্যান্ডদল কেন তাদের মঞ্চ ছেড়ে দিল না সময়মতো। আয়োজকরা কেন এই অপমান করল। কিন্তু দুটি শীর্ষ দলের একটি কনসার্ট নিয়ে ভুল বোঝাবুঝিতে বামবা থেকে পদত্যাগ করল দেশ সেরা একটি ব্যান্ড। এর একটিই মাত্র প্রচ্ছন্ন যুক্তি থাকতে পারে, তা হলো বামবার সভাপতি হামিন আহমেদ। কিন্তু তিনি তো সংগঠনের মালিক নন। তিনি সংগঠনের একজন সভাপতি। একটি ঘটনার সূত্র ধরে তার সমাধান বামবা থেকেই হতে পারত। কিন্তু তা না করে সরে গেলেন তিনি। ক্ষতি হলো মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির। ব্যক্তিগত এইসব অভিমান আর দ্বন্দ্ব সংকটের গল্পই যেন শুধু জমা পড়ে বারবার সংগঠন প্রসঙ্গ এলেই। যা কোনো সুখবর তৈরি করে না। এমনিতেই নানা সংকটে সংগঠনগুলোর কোনো কার্যকরী ভিত্তি নেই। একাধিক ইন্টারভিউ নেওয়ার সময় বা কথোপকথনে হামিন আহমেদ বলেছিলেন, ‘আমাদের আরও একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। শিল্পীদের রয়্যালিটি, ইন্টালেকচুয়াল কপিরাইট, প্রকাশক-শিল্পী সম্পর্ক ইত্যাদি নানা বিষয়ে শতাধিক টকশোতে কথা কপচানো হয়ে গেছে। বরং এখন কার্যকরী উদ্যোগের সময়। ঠিক সে সময় ইতিবাচক স্বপ্ন নিয়ে আরও একটি সংগঠনের যাত্রা। সকল সংগঠনেরই চাহিদা যেহেতু শিল্পীদের আর্থিক ও সামাজিক সম্মানের উন্নয়ন। তাই সে আশায় আমরা স্বপ্ন দেখতেই পারি।’ আরও একটি সংগঠন ও স্বপ্নের সম্প্রসারণ এসএমবি (সোসাইটি অব মিউজিক্যাল ব্যান্ডস বাংলাদেশ) নামের তরুণ ব্যান্ডদলের আরও একটি সংগঠন সম্প্রতি আত্মপ্রকাশ করল। সভাপতি ব্ল্যাক ব্যান্ডের প্রখ্যাত ড্রামার টনি এবং সাধারণ সম্পাদক আর্টসেলের প্রখ্যাত গিটারিস্ট এরশাদ। বলা বাহুল্য আমাদের নব্বই দশকের পর থেকে ব্যান্ড মিউজিকের যে সম্প্রসারণ ঘটেছে তাতে শেষ তারকা ব্যান্ড বলতে তারাই রয়েছেন। কিন্তু এরপর স্তিমিত ব্যান্ড বা তরুণেরা মিউজিক্যাল লুপ বেজড সাউন্ড আর কতিপয় নকলবাজ সুরকারদের সুরে আচ্ছন্ন হতে থাকল ইন্ডাস্ট্রি। প্রসঙ্গ সেটিও নয় আজকের লেখার। প্রসঙ্গ এর ভেতরে আরও একটি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? এমন প্রশ্ন নতুন সংগঠন এসএমবির সভাপতি টনিকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলল, ‘দেখুন আমাদের পথ যেহেতু এক। তাই এখানে দ্বন্দ্বের কোনো প্রশ্ন নেই। বরং আমরা তরুণদের ভেতরে একধরনের দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল। পারস্পরিকভাবে আমরা বন্ধু হলেও দেখা নেই, কথা নেই। কোনো পরিকল্পনা নেই। এ কারণেই আগে আমরা ঠিক করলাম অন্তত দেখা হোক। কারণ সিনিয়ররা করছেন তাদের মতো করে। আমরা আমাদের মতো করে অন্তত এগিয়ে যাই। তাদের সহায়ক হিসেবে কাজ করি। আর অনেক সময় তো পেরুলো। বামবা বা কোনো সংগঠনের সাথে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। বরং এটা একটি সহায়ক শক্তি। তাই এলসিএস বা প্রকাশকদের এমআইবির সাথে এই তরুণ দলগুলোর সম্প্রীতি থাকবে এটুকুনই অন্তত প্রত্যাশার ঘরে রাখা যায়।’ বিভাজন নয়, স্বপ্ন সম্প্রসারণ নতুন এই ব্যান্ড মিউজিকের প্লাটফর্মের মূল উদ্দেশ্য যদি সামগ্রিক হয়। তবে অবশ্যই সম্মিলিতভাবেই কাজটি এগিয়ে নিতে হবে। ধরা যাক, শিল্পীদের মেধাস্বত্ব নিয়ে দাবি তুলতে হলে সেটিও বলতে হবে দেশের সামগ্রিক শিল্পীদের নিয়েই। তাই নতুন এই সংগঠনকে বিভাজন বলে কোনো লাভ নেই। বরং স্বপ্ন বা দাবির জায়গা থেকে আরও একটি পথ সম্প্রসারিত হোক সেটিই কাম্য। কিন্তু পুরোনো জের ধরে অনেকেই আবার বলছেন, ‘নিজেদের ব্যান্ডদলের ক্ষেত্রেই যারা একসাথে ৫-৬ জন থাকতে পারেন না দীর্ঘদিন, তারা কীভাবে এত বড় সংগঠনে একাত্ম হয়ে থাকবেন?’ প্রশ্নটা প্রকট রহস্য তৈরি করে বটে। একই সাথে এর যুক্তিও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। কিন্তু টনি-এরশাদেরা একাত্ম হয়ে নিজেদের ইভেন্ট ফার্ম হিসেবে সংগঠনকে ব্যবহার না করে সামগ্রিকভাবে কাজ করলেই তা সার্থকতা পাবে। আমরা জানি, যুগে যুগে তরুণরাই ভালো উদাহরণ তৈরি করে। তাই একই মঞ্চে বা একই রাস্তায় একই দাবিতে যৌথ ব্যানার হাতে বামবা, এলসিএস, এমআইবি , আরওয়াইএমবি, বা সদ্য প্রতিষ্ঠা পাওয়া এসএমবি দাঁড়িয়ে সমস্বরে যেদিন যে দাবি তুলবে, সেটি প্রতিষ্ঠা না পেয়ে যায় না। কিন্তু এই পারস্পরিক বিভেদ বা দূরত্ব বা ভাবনার গতিপথকে এক করার দায়িত্ব নিতে হবে তরুণদেরকেই। পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ... মিউজিক বা শোবিজে সাধারণত সিনিয়র-জুনিয়রদের একটি বিষয়েই খুব দ্বন্দ্বের জায়গা তৈরি হয়, তা হলো পারস্পরিক অসম্মান। এদেশের ব্যান্ড মিউজিকের শীর্ষ সংগঠন বামবার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাকসুদুল হকের কাছে তরুণদের এই নতুন সংগঠন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি কী বলব। বিষয়টি নিয়ে আমি কোনো কিছুই অবহিত নই। গতকালকেও আমার সাথে টনির দেখা হলো। কিছুই তো বলল না আমাকে। আমি অবশ্যই চাই ওরা ভালো করুক। নিজেদের সত্ উদ্যোগগুলোকে প্রতিষ্ঠা করুক এটাই চাই। কিন্তু অন্তত আমাদের জানাতে পারত। বড়দের সাথে শেয়ার করলে তো কোনো দোষের কিছু নেই।’ ঠিক একইভাবে নতুন এই সংগঠন নিয়ে মতামত শুনতে চাইলে বামবার বর্তমান সভাপতি হামিন আহমেদও একই কথা বলেন। তার ভাষ্যে, ‘সংগঠন অনেক হতেই পারে। কিন্তু মূল লক্ষ্যে আমাদের সকলের এগোতে হবে। আর নতুন এ সংগঠনের বিষয়ে আমাদেরকে জানানো হয়নি। বা সেই সৌজন্যতাটুকুও রাখা হয়নি তাই এ নিয়ে কী বলব। শুধু এটুকু বলব বামবা থেকে কিছু ব্যান্ডদল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আমার প্রশ্ন ওরা যেন কারো দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে কিছু করে। কারণ এমনিতেই আমরা অনেক আলোচনা, চড়াই-উত্রাই করে একটা পথ তৈরি করেছি। নিজেদের আত্মসম্মান টিকিয়ে রাখার এই সংগ্রামে পেছন থেকে কারো উস্কানি আছে কি না, সেটিও বামবা খতিয়ে দেখবে। তবে ভালো উদ্যোগে যেকোনো পরামর্শে আমাদের কাছে এলে আমরা অবশ্যই শুভকামনাই জানাব। দুঃখের বিষয় হলো ওরা কেউই আমাদের কাউকে কোনো কিছু জানায়নি।’ এবারে খানিক ব্যান্ড অ্যাসোসিয়েশনের তরুণ কণ্ঠশিল্পীদের সংগঠন আরওয়াইএমবির উদ্যোক্তা কণ্ঠশিল্পী আসিফের কাছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সংগঠন তৈরি করা যায় একটা-দুটি প্রেস কনফারেন্স করলেই। কিন্তু নির্দিষ্ট লক্ষ্যে টিকিয়ে রাখাটাই সবচেয়ে কষ্টের। আমি মনে করি সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই এসএমবিও এগোবে।’ আমাদেরও প্রত্যাশা একই। কারণ শুরুর সেই গল্প যেন নতুন করে আবার তৈরি না হয়। বাংলাদেশি রকপ্রিয় তরুণ সবসময় যেকোনো কনসার্টে সাড়া দিয়েছে নিজ প্রাণের উদ্যোগে। সেই ভালোবাসার মূল্যায়ন দিতে হবে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত শক্ত করে এবং একই সাথে সিনিয়রদের সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধটিও রাখতে হবে সবসময়।