এক মুঠ মাটি

আপডেট : ১৫ মে ২০১৪, ২০:৩০
বয়সের তিনকাল পার, উপরন্তু মানুষটা পাড়াগাঁবাসী, পুরোনো ঘটনার ছুটকো খোঁজ তাঁর স্মরণে থাকলেও থাকতে পারে ভেবে রিপন ফের জিজ্ঞাসা করে—‘ওই যুদ্ধের কথা যখন মনে আছে, তাহলে তাঁর লাশ কবর দেওয়া হয়েছিল কোথায়? মনে পড়ে আপনার?’ আগ্রহের স্বর থেকে প্রশ্ন খুলে আসে, আর তখুনি পাশের বটগাছের শুকনো একটা পাতা ওপর থেকে খসে তার পায়ের কাছে পড়ে। ওপরমুখে নজর টেনে আনে রিপন। শীতের সময় ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। গাছ-গাছালির ডালপালা হারানোর বেদনায় এখনো নিঃস্ব। বয়স্কের থেকে কোনো উত্তর আসে না। মাত্র হাত তিন দূরত্বে বসা ক্ষয়ধরা নির্জীব মানুষটা মাথা নিচু রেখে নিজের মধ্যে ডুবেই আছেন। হয়তো বেয়াল্লিশ বছর আগের বিগত স্মৃতি তিনি খোঁড়াখুঁড়ি করছেন—ঘটনার কোনো টুকরো কিছু মেলে কি না। পায়া নড়বড়ে বেঞ্চটার গায়ে কাত হয়ে আছে তাঁর বাঁশের লাঠিটা। চায়ের ছাপড়ার আউলা চেহারার জোয়ান ভেতরে খুটখাট করছে। তার মুখ দেখে সাফ বোঝা যায়—আদৌ সে ভালো নেই। এই মধ্য-দুপুরে সারা গাঁয়ের ওপর যখন মোলায়েম তাপ, মানুষ ক্ষেত-খামারে তখন নির্দিষ্ট কাজ খারিজ করে কেউই এখানে আসে না। মাটির বুকে খুরপি-কোদাল চালানো বা গাছের যত্ন-আত্তি, গোড়ায় পানি ঢালার এখনই তো উপযুক্ত বেলা। খাটুয়ে হাত অলস রেখে চায়ের ছাপড়ায় গল্প-গুজবে মশগুল হওয়ার ফুরসত কই! দূর কোন্ মুল্লুকের মানুষ সে, বাসে চেপে খানিকটা হেঁটে এসে রিপন দু’দফা চা খেয়ে নিজের গরজে ঠায় বসে আছে। পয়লা হাঁটতে হাঁটতে সাইনবোর্ড দেখে সন্তোষপুর স্কুলে গিয়ে হতাশ—স্কুল বন্ধ। খুব যে তন্ন তন্ন ধারালো চাহনি রেখে আশপাশ সে দেখছে তাও না। তার দরকার বয়সী মানুষ, যে এলাকার মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানে, যে বলতে পারবে আক্রান্ত গাঁয়ের প্রতিরোধের বীরত্বগাথা। কিন্তু তাকে অচেনা দেখে কাজের সময়ে কাজের মানুষ কে এগিয়ে এসে গায়ে পড়ে কথা বলবে—মোটেও না। এখন বক্তা একজনই, ওই চায়ের ছাপড়ার যুবক। তার মুখের ভঙ্গি, স্বরের আওয়াজের ওঠাপড়া ধরার চেষ্টা করছে রিপন। তার ছাড়া ছাড়া কথা গিঁট দিয়ে সে বুঝেছে—এই বুড়ো মানুষটা নাকি আপদ গোছের। রোজ সকাল ৯টা-১০টার দিকে লাঠিতে ভর রেখে পথের একপাশ ধরে ঠুকঠুক করে হেঁটে আসে সে। দুপুর ফুরিয়ে গেলেও এখানে একাই বসে থাকে—উঠতে চায় না। তখন ছাপড়ার যুবককে বিরক্তির কোলাহল চালু করতেই হয়। ভাঙচুর বৃত্তান্ত থেকে জানা যায়, বুড়ো তার কাহিল কাঠামো বেঞ্চে ফেলে পাশের মানুষের মুখে তার ঘোলা দৃষ্টি ধরে রেখে চেনা-অচেনা যেই হোক খুবই আত্মীয়স্বরে তার কাছে সে চা-বিস্কুট খেতে চাইবে। কেউ কেউ বুড়োকে দেখে ছাপড়ার সামনে থেকে তাই চটজলদি কেটে পড়ে। খদ্দের এই বাজে বুড়োর কারণে চলে যায় দেখে যুবকের কাছে সে বিরক্তিকর মনুষ্যি। তাহলে যখন সে চরম নাখোশ, বুড়োকে তাড়িয়ে দিলেই পারে। প্রশ্নটা রিপনের মধ্যে জেগে উঠলেও কোনো কিছু জানার ইচ্ছা রিপনের মধ্যে ক্রিয়া করে না। সে নিজেই এখানে আগন্তুক। অঞ্চল বলো, মানুষ বলো, পথঘাট সব তার পয়লা দেখা। শোনা কথার পথ-নির্দেশে বাস থেকে নেমে আধঘণ্টার মতো উত্তরে হাঁটতে হাঁটতে ডানপাশে একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প সন্তোষপুর স্কুলটা সহজেই সনাক্ত করে সে। কিন্তু শহীদ বাবার কবর খুঁজে বের করার অস্থিরতার তোড়ে রওনার সময় তার মাথায় আসেনি যে আজ সাপ্তাহিক ছুটি—স্কুল বন্ধ। গ্রাম-গঞ্জের স্কুলে তালা মানে এমন বিরল খাঁখাঁ অবস্থা যেন কেউ কোনোকালে এখানে আসেনি, স্কুলটা যেন অনেকদিনের পরিত্যক্ত একটা টিনের পুরোনো দোচালা। এই স্কুলের আশপাশে, কি পুকুর পাড়ে কিংবা পেছনের ঝোপঝাড়ের মধ্যে কোথাও তার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাবা আতাহার আলীর কবর। আজ বাসি হয়ে যাওয়া এই তথ্য সে পেয়েছিল তার মায়ের মুখে তাও সে এসএসসি পাস করার পর। কেন যে মা আরো আগে বলেনি তার কারণ কস্মিনকালেও সে ধরতে পারেনি। হয়তো ছেলে অভাবের পায়ে ঘুরেফিরে নিদারুণ কষ্টে-সৃষ্টে স্কুল পাঠ সাঙ্গ করে সাবালক হয়েছে—এখন বাবার গৌরবময় মৃত্যুর কথা তার বোধ-অনুভূতিতে জমা রাখা যায়। রিপনের মা স্বামীর সাহসী মৃত্যুর খবর পেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ শেষের বত্রিশ দিনের মাথায়। ভাসারহাটের খুলে ফেলা কাঠের পুলের এপাশে ওপাশে মুখোমুখি এক যুদ্ধে শত্রুর গুলি এসে আতাহার আলীর মাথার খুলি উপড়ে দেয়। আতাহার আলীর এই শহীদী মৃত্যুর ঘটনা প্রায় পাঁচ মাস পর মুখ থেকে মুখে মাইল মাইল পাড়ি দিয়ে আসার কারণে যথাযথ সংবাদ কেউ বলতে পারেনি। যুদ্ধ শেষ, যে-যার ভিটেমাটি ও স্বজনের কাছে ছুটতে ব্যস্ত থাকায় সার কথার জানাজানি থেকে রিপনরা বঞ্চিত থেকে গেছে। ওই যুদ্ধের শরিক এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে প্রতিবেশী বা নিকট গ্রামমনুষ্যি কেউ ছিল না বলে বিভিন্ন ঠোঁট হয়ে যেটুকু খবর পৌঁছায়, তার মধ্যে কবরের নির্দিষ্ট জায়গার কোনো বার্তা ছিল না। রিপনের বয়স তখন মাত্র তিন বছর। আশ্চর্য, তার বাবার কবর, কি তাঁর মাকে নিয়ে স্বামীর কবর দেখানোর, খোঁজার কোনো উদ্যোগ কোনো আগ্রহ চাচা-মামারা নেয়নি। উভয় পরিবার এমন নীরব থেকেছে যে আতাহার আলী মরে যেন মহাঅন্যায় করেছে। তাঁর বিধবা বউ ও শিশু সন্তানের জন্য উপেক্ষাই হচ্ছে একমাত্র ব্যবহার। প্রায় প্রতিদিনই তার মাকে ছেলের সামনে পরিবারের কুটিল ঠোঁটের ঠেসবাক্যে জর্জর হতে হয়েছে। মায়ের নিঃশব্দ কান্না, শুকনো মেঘমুখ, বুকের খাঁচা ছুঁয়ে আসা লম্বা হুতাশ দেখে দেখে ভেতরের রক্তক্ষরণে ওই বয়স থেকে রিপন হয়ে ওঠে নিরেট পাথর। কোনো কোনো রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মাঠ ভেঙে আসা দস্যি বাতাসে ঘরের বেড়ার ফুটোয় গোঁজা সুপারি গাছের শুকনো পাতার হালকা শব্দও মনে হতো মায়ের জীবন্ত দীর্ঘশ্বাসের মতো। তার মায়েরই নাকি দোষ—কেন স্বামীকে সে আগলে রাখতে পারেনি। কি দরকার একটা জোয়ান-পুরুষের সাধ-আহ্লাদ ঘরসংসার ফেলে দেশ স্বাধীনের যুদ্ধে যাবার! ঘরের খেয়ে বনের মোষে কিল-চড় যারা মারে তারাই পারে যথেচ্ছ গোলাবারুদ ফুটাতে। তা না, আতাহার আলী চাষের জমিন, ফলের বাগান, মাছের পুকুর তুচ্ছ মনে করে যুদ্ধে চলে গেল! সে কিনা কোন আঘাটায় নিজের বাড়ি থেকে অনেক অনেক দূরে এক বৃষ্টির দুপুরে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে শরীরে গুলি নিয়ে পৃথিবী খারিজ করে গেল! এ কেমন নসিব! আরে, একটা যোগ্য মরদকে তার বউ যদি আটকাতে না পারে তবে ওই নারী সংসারে ষোলআনা অচল। দেশ স্বাধীনের পর শ্বশুরের ভিটেতে মাটির হাঁড়ির হেয় ভাঙা টুকরো হয়েও বুকে নাবালক ছেলে জড়িয়ে মা তার থাকতে পারেনি। আহা মা, ছোটখাটো গড়নের ফরসা গোলগাল মুখের মা, কেমনে শুকিয়ে সামান্য চিকন লতা; আর তার চেহারার শ্রীশোভা ক্ষয় হয়ে গেল। ওই তো তার মা চরম ঠান্ডা, কখনো কুয়াশাময় ভোরে ভাইয়ের সংসার ঝাঁট দিচ্ছে। উঠোনজুড়ে পড়ে থাকা শুকনো পাতা কুড়োচ্ছে। উনুনের ছাই তুলে ফেলে আসছে পেছনের বাগানের আবর্জনার গাদায়। পুকুরের ভাঙা ঘাটে নেমে হিম পানিতে গতরাতের ডাঁই করা এঁটো হাঁড়িপাতিল থালা-গ্লাস ধুয়ে ঝকঝকে তার করা চাই, নচেত্ মন ওঠে না। এই মন কি তার? নাকি পরের সংসারের মন দখলের জোর মেহনত? সে দেখেছে, মা তার কখনো খড়কুটো, কখনো তুষ গনগনে আগুনে ফেলে ধান সিদ্ধ করছে। ধোঁয়া ওঠা ওই ধান রোদে মেলে, একাই আবার পড়ন্ত বেলায় কুড়িয়ে ঢিপি করে তার ওপর হোগলা বিছিয়ে ঢেকে রাখছে। মা এখন কোথায়, তার চোখ আঁতিপাঁতি খুঁজছে। মা কোথায় এখন? উত্তরের ক্ষেতে পায়ের নিচে শক্ত মাটির ঢেলার ব্যথা সহে শাক-লতাপাতা তুলছে—দুপুরে রান্না হবে। ওই শাক কচু-ঘেচু সিদ্ধ, ঝরে পড়া তেঁতুলের টক খেয়েই সে আর মা তো পেট শাসনে রাখছে। মায়ের হাতের প্রতিটি আঙুলের ডগা ফাটা আর খরখরে। কোনো কোনো রাতে তার কোলের মধ্যে কুণ্ডুলি পাকিয়ে শোয়ার পর হাত মায়ের আঙুল স্পর্শ করেছে। তখন বোঝেনি, আজ সে চোখ বুজে পরিষ্কার ধরতে পারে—একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর যে মর্যাদা নিয়ে স্বাধীন দেশে বেঁচে থাকার কথা ছিল, তার কিছুই সে পায়নি। পুরোনো জ্যালজেলে কাপড়ের আড়ালে কখনো কখনো তার মায়ের আকারই সে খুঁজে পায়নি। আচ্ছা, মায়ের পরনের কাপড়ে রঙ কই! তৈরির সময়ও কি রঙ ছিল না? নচেত্ কোনো রঙই ওই কাপড়ে কেন সে দেখেনি? দেখো, সেই মা’র রেখে যাওয়া শেষ ইচ্ছার মূল্য দিতে এই অচেনা অপরিচিত বিভূঁইয়ে সে ছুটে এসেছে। —‘বাবাজি।’ আধফোটা ডাকের প্রভাবে রিপনের মাথা থেকে মা তার নেমে যায়। প্রৌঢ়র হিজিবিজি আঁকাবুকির মুখের পাতলা মাংস তিরতির কাঁপছে। সামান্য সাদা চুলের বয়সী মাথাও নড়ছে। —‘মন ডা তো সেই কবে থেইকে ঘোলা হইয়ে আছে। কিছু ধরতি পারি না।’ এই অব্দি বলেই তার দম বুঝি ফুরিয়ে যায়। আবার শ্বাস টেনে নিজেকে ফিরে পেতে কসরত করতে করতে সে প্রশ্ন রাখে—‘ফের কও দেহি, কোথাকার যুইদ্ধ?’ রিপনকে নতুন করে ফের শুরু করতে হয়। সন্তোষপুর স্কুলে মুক্তিবাহিনীর বড় একটা ক্যাম্প ছিল। এখান থেকে ক্যাম্প লিডার, সম্ভবত তাঁর নাম ছিল ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলাম, তিনি আশপাশের যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। তাঁর পাঠানো মুক্তিযোদ্ধাদের একটা গ্রুপের সঙ্গে ভাসায় ঘোরতর যুদ্ধ হয়েছিল। ওই সময় বৃষ্টি হচ্ছিল। আতাহার নামের লম্বা মজবুত শরীরের এক মুক্তিযোদ্ধা ওই যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর লাশ মুক্তিযোদ্ধারা নিয়ে এসেছিল। এই স্কুলের আশপাশে কোথাও তাঁকে কবর দেওয়া হয়। ওই কবরের খোঁজ এই তল্লাটের কেউ দিতে পারে কি-না। —‘কবর! কী যে কন? এতদিনে তার দাগ-নিশানা!’ ছাপড়ার যুবক রিপনের খোঁজার বিষয় নিয়ে আপনা থেকে যেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত রায় দেয়। পরমুহূর্তে আবার সে কথা চালু করে—‘এই গেরামের যারা যুইদ্ধ করিছিল তারা কি আর আছে? তাগো চেইলেপেলেরা অতো আগের যুইদ্ধ-ফুদ্ধ নিয়ে ভাবে না। লড়াইর কথাই কেউ যহন জানতি চায় না, তহন কোথায় কার কবর হইছিল কেউ কি মনে রাহিছে?’ যুবকের বয়ানে ধরা পড়ে—একাত্তরের পুরোনো ঘটনার ওপর এখন যথেষ্ট ধুলোময়লা-শ্যাওলা জমেছে, ওর কোনো মূল্য নেই। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যুবকের অতি সাধারণ মনোভাব, কবেকার ঘটনা, খানিকটা চাপা তাচ্ছিল্যতা রিপনের মধ্যে কোনো উষ্মার উদ্রেক বা মেজাজ খারাপের প্রতিক্রিয়া হয় না। কি শহরে, কি রাজধানীতে মুক্তিযুদ্ধকে একাত্তরের গণ্ডগোল বলতে পারলে দূরের এই সাদামাটা হেলা অনাদরের পাড়াগাঁয় প্রতিদিনের আটপৌরে বাঁচামরায় আয়ু খরচ করা মানুষের কাছে এতদিন পর মুক্তিযুদ্ধ মূল্য পাবে কেন? এদের কাছে স্বাধীনতা তো কোনো সুফল, কোনো পরিণতি কিংবা আশার ভবিষ্যত্ পৌঁছে দিতে পারেনি। এদের আর দোষ কী! প্রৌঢ় শিরা ওঠা সরু কাঁপা হাত বাড়িয়ে তাঁর লাঠিটা টেনে নেন। এখন কি তিনি চলে যাবেন? না, লাঠি সামনে ধরে ঝুঁকে তিনি শরীরের ভর রাখেন। ভাবনার মধ্যে ডুব দিতে দিতে গভীরে পৌঁছানোর আগেই কিছু একটার সন্ধান পেয়ে যেন ভুস করে তিনি ভেসে ওঠেন—‘মনে কচ্ছে, ওই ভাসার যুইদ্ধে কচুয়া থানাদে আসা রাজাকারগো সঙ্গে হইছিল। ওই যুইদ্ধে তো তিনজন মরিছিল। হ্যাঁ, তাগো লাশ এহানে আনা হইছিল, কিন্তু কবর—।’ বলে, বুড়োর থুতনি ঝুলে পড়ে। আবার ধীরে ধীরে তিনি নীরব হয়ে যান। রিপন তাঁর মুখের খাঁজ দেখে বোঝে—বয়সের চাপে এই বুড়ো মানুষটা স্মৃতি খনন করতে করতে হঠাত্ খেই হারিয়ে ফেলছেন। কুড়িয়ে নিজের স্মরণের মধ্য থেকে যা এনেছিলেন তার পরের অংশ এখন ছিঁড়ে গেছে। —‘আচ্ছা, এই অঞ্চলের কোনো বয়স্ক মানুষের কাছে তো এ নিয়ে খবর থাকতে পারে। ওই সময়ের কোনো মুক্তিযোদ্ধাও বেঁচে থাকতে পারেন। স্কুলের পুরোনো শিক্ষক, তিনিও বলতে পারবেন।’ কূল-কিনারাশূন্য অথৈ পানিতে রিপন যেন প্রাণপণে সাঁতার কাটছে। কোনো এক ফালি ডাঙায় কোনোক্রমে যদি পৌঁছানো যায়। তার কণ্ঠের খাঁজে এখন তীব্র ব্যাকুলতা। কানের কাছে হাতের ছাউনি তুলে বুড়ো রিপনের কথা ধরার চেষ্টা করেন। শুনে খানিকক্ষণ থম মেরে থাকেন তিনি। পট করে চোখের ঢাকনা বুজিয়ে ঘাড়ে চাপ রেখে তিনি চিবুক উঁচু করেন। এবার আস্তে-সুস্থে তিনি ডান হাতের চারটা আঙুল দেখান। পরে হাতটা বুঝি খসে পড়ে। এর অর্থ কী? আঙুল দেখানোর উদ্দেশ্য ধরতে গেলে রিপনের দুই ভুরুর মধ্যজমিনে ভাঁজ পড়ে। চোখ-মুখ থেকে নিজের অবুঝ ভাব লুকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ছাপড়ার যুবকের দিকে সে দৃষ্টি ফেরায়। যুবক বুড়ো মানুষটির আঙুল দেখানো কি লক্ষ করেছে? বিস্কুট রাখা কাচের বোয়েমের মুখটা এক টুকরো কাপড় দিয়ে মুছতে মুছতে ছাপড়া থেকে যুবক নিরাশ জবাব পাঠায়—‘বলতি পারতো এমন ছিল চাইরজন। এহন তারা নেই। মাইনে বাঁইচে নেই।’ রিপনের মধ্যে ধস নামলে একটা জখম বোধ সে টের পায়। নাগালের কাছাকাছি, ইস, সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আসার পর আলোর আভা যেন মুহূর্তে মুছে গেল। মায়ের মৃত্যুসংবাদ এমন একসময় রিপন পায় যখন শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশে লোকে লোকারণ্য—রাস্তার চারমাথা ছাড়িয়ে অনেকদূর অব্দি প্রতি ইঞ্চি, ফুটপাতও মানুষে সয়লাব। সমস্বরে জয়বাংলা শ্লোগানের আওয়াজ আশপাশের বিল্ডিংয়ের দরজা-জানালা-ছাদ-কার্নিশ ধরে গাছগাছালির ডালপাতা ছুঁয়ে আরো উঁচুতে উপুড় নীল আকাশেরও খণ্ডাংশ যেন স্পর্শ করেছে। রিপন পিজি হাসপাতালের সামনের জনজটে নিজেকে ধরে রেখেছিল। পকেটের মোবাইল ফোনটা হঠাত্ বেজে উঠলে দেখে, ছোটমামার কল। কোনো কিছু গোপন না করে তিনি রিপনকে সাফ জানিয়ে দেন—এখুনি তোকে ঢাকা থেকে রওনা দিতে হবে। তোর মা আর নেই। শুনে মোবাইল ফোনটা মুঠোয় সে চেপে ধরে। আপাদমস্তক সামান্য কেঁপে ওঠে। বুকের ভেতর হিম ভেঙে আসছে। ক্রমশ মনে হয়, মাথার খুলির নিচে আদৌ কোনো কলকবজা নেই—দারুণ ফাঁকা। জাগরণ মঞ্চ থেকে নতুন শ্লোগান শুরু হলে রিপন নিজের বিবেচনাশূন্য নিষ্ক্রিয় ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারে। মা নেই, আশ্চর্য হাহাকারের কোনো চাপ নেই, দুঃখের মোটা-চিকন তারে টোকা পড়ছে না, শোকের কোনো বাষ্প তার মধ্যে ক্রিয়া করছে না। মোবাইল ফোনে অফিসের বসকে তখুনি পাওয়া গেল। অসময়ে ফোন পেয়ে বসের বিস্ময় প্রস্তুত হওয়ার আগেই মায়ের মৃত্যুসংবাদ রিপন বলে যায়। বস তাকে দ্রুত বাড়ি যাওয়ার পরামর্শ দেন, ছুটি নিয়ে ভাবতে হবে না, টাকার প্রয়োজন হলে সে যেন জানায়। কিন্তু শাহবাগের ভিড় থেকে বেরিয়ে আসতে বেশ সময় গেল। রিকশা পাওয়া দুষ্কর। চামেলীবাগের একা থাকা এক রুমের বাসা থেকে জামাকাপড়ের ব্যাগ নিয়ে সায়েদাবাদে এসে সে যখন বাস ধরে, বেলা তখন শেষ। দোকানপাট, রাস্তায়, গাড়িতে আলো জ্বলে উঠেছে। শুরু ব্রেক জার্নি। মাওয়া আসতে এক ঘণ্টার বদলে দু’ঘণ্টা গেল—রাস্তায় চরম বিশৃঙ্খলা। এখান থেকে স্পিডবোটে পদ্মা পাড়ি দিয়ে কেওড়াকান্দি, আবার বাসে চড়ে দক্ষিণের উদ্দেশে মাইল মাইল পাড়ি। পুরো রাত গেল বাসে। মায়ের মুখটা উদয় হলে চলন্ত বাসের ঝাঁকুনিতে বারবার এলোমেলো হয়ে যায়। তার চেহারা কিছুতেই গঠিত হয় না। মায়ের সদ্য কবরের সামনে সে যখন এসে দাঁড়ায় তখন রোদজ্বলা দুপুর তার শরীর জুড়ে দাহ দান করে। মা বেঁচে থাকতে ছেলের ওপর অগাধ আস্থা রেখে কণ্ঠে আলাদা জোর তার একটাই দাবি ছিল—সে মারা গেলে রিপন যেভাবেই হোক বাপের কবর খুঁজে সেখানের একমুঠ মাটি এনে তাঁর কবরের ওপর যেন বিছিয়ে দেয়, তাহলে মরেও তার চিরশান্তি। আরেকটা দাবি ছিল তার। অনেকবার বললেও পুত্রের বউয়ের মুখ দেখার সাধ পূরণ করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ রিপন দেখায়নি। মামা-মামী, চাচা-চাচী কেউই কখনো তাঁকে মানুষ ভাবেনি, সমাজ-সংসারে সে যেন একটা আস্ত আপদ, ফালতু প্রাণী, আর তার মা বুঝি চিরদিনের দাসী। যার মা অল্পবয়সে একটা শিশু সন্তান নিয়ে দেশের জন্য বিধবা হয়ে জীবনের সব শাঁস-আঁশ-আয়ু পরের সংসারে ব্যয় করে গেছে সেখানে বিয়ে করার কোনো স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা-কামনা রিপনের মনের গোপন কুঠুরিতে জাগেনি। হতে পারে এটা তার জেদ, তার এই নিরর্থক সিদ্ধান্ত কেবল মায়ের কষ্টের সঙ্গে কষ্ট যোগ করেছে, আর কাউকে তো ক্ষত-বিক্ষত করেনি। ভালোই, মাটির আড়ালে গিয়ে মা তাঁর জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে চিরমুক্তি পেয়েছেন। মায়ের এই মৃত্যুর পর দাদা-নানা, কি চাচা-মামা বাড়ির সঙ্গে তার নামমাত্র সম্পর্কেরও মরণ হলো। এখন সে ঝাড়া হাত-পা। শুধু বাপের কবরটা খুঁজে পেলে একমুঠ মাটি তুলে এনে মায়ের কবরের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে সে নিজস্ব দূরের ডেরায় ফিরে চলে যাবে। তার জন্মই বুঝি হারিয়ে যাবার জন্য। মাস ছয় আগে যখন সে গ্রামে মা’র আঁচলের তলে চোখ ভরে ঘুমানোর জন্য আসে তখন খেয়াল করেছে, মা একই কথা বিরতি দিয়ে দিয়ে বারবার বলছেন। তখুনি সন্দেহ হয়, মা মাথার ধার আর ধরে রাখতে পারছেন না। দৃষ্টিশক্তিও বুঝি ক্ষয় হয়ে গেছে। ছেলের গা-হাত-মাথা অনেকটা হাতড়ে হাতড়ে ধরছেন। আহা, বাপ আমার, তুই যেন কাবু হইয়ে গেছিস। তোর কাজ কি খুব বেশি? খাওয়ার সময় পাস না? ওই যেন শব্দটা ধরে রিপন অনুমান করে, মা তাকে আবছা আবছা দেখছেন। সাংঘাতিক ঘায়েল হয়ে পড়া মানসিক আঘাত, শরীরের ভেতরের আঁটি, তারও নরম অংশ অষ্টপ্রহর খাটুনির কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এখন রিপন নিজেই চরম এক অস্পষ্টতার মধ্যে আছে। মায়ের শেষ ইচ্ছার ফয়সালা সে কেমনে করে? একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর স্বামীর কবরের মাটি চাওয়া কি দুর্লভ কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা? দেশ না, সরকার না, কারো কাছে না, একমাত্র নিজস্ব সন্তানের কাছে কথায় কথায় জীবনের একটা দাবি গচ্ছিত রেখে গেছেন; আর তা পূরণ করার দায়িত্ব রিপনেরই। —‘তোমার বয়স কত বাজান?’ নিজের মৌন ভাবের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বুড়োর হঠাত্ বয়স জানার আগ্রহে রিপন বোঝে, এই মানুষটা তাঁকে নিয়ে এখন খোঁড়াখুঁড়ি করে সময় কাটাতে চান, কিংবা চায়ের ছাপড়ায় বসার পর এতক্ষণে মুখর হওয়ার চাপ সে টের পাচ্ছে। তার বয়সের সঙ্গে কবরের বয়সের সম্পর্ক কী? মানুষ বুড়ো হলে কি তার ধ্যান-ধারণা, গোনাগাথা, কি কথাবার্তা সব জটিল হয়ে যায়? রিপন চায় না অজানা এক এলাকায় এসে অস্বস্তিতে মাখামাখি হতে। তার বয়সের হিসাব খুব সোজা—দেশ স্বাধীন হয়েছে বিয়াল্লিশ বছর, তার তিন বছর আগে জন্ম, তাহলে পঁয়তাল্লিশ। এর জন্য মাথা ঘামানোর দরকার হচ্ছে না। মা একবার নিরিবিলি পুকুরপাড়ের একটা নারকেল গাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে খোলা উত্তরের দিগন্তে দৃষ্টি উড়িয়ে বলেছিলেন, যেবার খুব বৃষ্টি হয়েছিল, ওই যে মাঠ ক্ষেত-জমি চলে গেল পানির নিচে, ফসল মরে যায়, ঘরে ঘরে কষ্ট, অলস থাকতে থাকতে মানুষের হাত-পা প্রায় অচল, ওই খারাপ সময়ে তোর জন্ম। হায়রে, খারাপ সময়ে জন্ম! বলা যায়, দুধের বয়সে বাপ হারানো, মা’র স্বপ্ন-সাধ সংসার-সুখ সব নস্যাত্ হলো—এ কি তাঁর ওই দুঃসময়ে জন্মের কারণে। না, বয়স্কের কাছে তার বয়সের হিসাব দিতে ইচ্ছে হয় না। এখন হালকা শীতের ঋতু, গাছের ফাঁক-ফোকর দিয়ে চুঁইয়ে পড়া মিষ্টিমিষ্টি টুকরো রোদ গায়ে নিয়ে বসে থাকতেই বেশ আরাম। কিন্তু কতক্ষণ? যুবক নিশ্চয় ছাপড়া বন্ধ করে খেতে যাবে। এই বুড়ো মানুষটাও তাঁর অকেজো কাঠি কাঠামো নিয়ে খুটখুট করে ফিরে যাবেন। কবরের সন্ধানের নামে একা এখানে কি সে বসে থাকবে? না, তার অনুমান মিথ্যে করে ছাপড়ার যুবক বাইরে এসে একটা দা দিয়ে শুকনো ডাল কেটে ছোট করতে থাকে। চায়ের চুল্লির জ্বালানি। রিপন নিজের ওপরই এবার বিরক্ত হয়। হুট করে একটা ঘোরের মধ্যে আনখা সম্বন্ধশূন্য ভূমিতে চলে আসা তার ঠিক হয়নি। এখন উচিত দক্ষিণমুখি দে-পাড়ার উদ্দেশে ফের রওনা দেওয়া। ওখান থেকে বাসে উঠে ফিরে যাওয়া। উপযুক্ত খোঁজ-খবর নিয়েই বাপের কবরের সন্ধানে তার আসা উচিত ছিল। মায়ের হঠাত্ মৃত্যু কি তার বুদ্ধি-বিবেচনায় গোলমাল করেছে? আন্দাজে নেমে পড়া মানে অন্ধকারে পথ হাতড়ানো। আরে, এত বছর পর মুক্তিযুদ্ধেরই স্মৃতি নিজের ভেতর কজন ধরে রেখেছেন? মুক্তিযোদ্ধা এখনো যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁরাও যুদ্ধের স্মৃতি ভুলে থাকতে পারলে বাঁচেন। কোথাও তাঁদের দাম নেই। শয়তান ট্যাটন আর মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধীদের প্রবল প্রতাপের সামনে নিজেদের গায়েব করে দিয়ে তাঁরা উদ্ধার চান। গাছের শুকনো চিকন ডাল যুবক এবার তার থ্যাবড়া পায়ের নিচে চেপে মুটমুট শব্দে ভাঙতে ভাঙতে রিপনের কাছে জিজ্ঞাসা রাখে, ‘তা আপনি যার কবর খুঁজতিছেন সে কী হয় আপনার?’ প্রশ্নটা বুঝি ন্যায্যতার অধিকার নিয়ে ছাপড়ার সামনে কয়েকপ্রস্থ জায়গা থেকে আশপাশে, পথের ওপাশের গাছগাছালি ঘন ঝোপ, তার পেছনের সরু খাল, এপাশে নির্জন সন্তোষপুর স্কুলের মাঠের ওপর দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে উড়ে যায়। শীতকালের ফ্যাকাসে সবুজ আর মরা পাতাদের মৌসুম আক্রান্ত এই পাড়াগাঁ তার বুকের মধ্যে শ্রীহীন বারোয়ারি স্কুল, এই স্কুলে একাত্তরের যুদ্ধদিনে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প যে ইতিহাস ধরে আছে তা এখুনি ধুলোবালি মুছে হয়তো প্রশ্ন রাখবে—এতদিন ওই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সনাক্তহীন যে কবর খুঁজছো সে কী হয় তোমার? রিপন দারুণ অসহায় বোধ করে। ভেতরটা তার বুজে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কী জবাব দেবে সে? বুকের খুব গভীরের আকুতি মাখানো তার চাওয়া শোনার পর ছাপড়ার এই জোয়ান তিনকাল পার হওয়া এই বুড়ো মানুষটা যদি ক্ষেপে যায়, ধারালো বিদ্রূপে তাকে ঝাঁজরা করে দেয়—ব্যাটা, এতগুলো বছর পর এসেছ বাপের কবরের সন্ধানে? একমাত্র সন্তান? তা এই সন্তান এতদিন কী করেছে? আকস্মিক এক বোধোদয়ে রিপন সহসা উঠে দাঁড়ায়। উত্তেজনার তোড়ে তার আপদমস্তকে ঝাঁ ঝিন ঝিন শিহরণ বয়ে যায়। বিয়াল্লিশ বছর পর তার বাবার কবরের দরকার কী? একাত্তরে সারাদেশ শহীদের রক্তে ভিজেছে, এই শহীদদের রক্তে মাটি আরো উর্বর হয়েছে। এদেশের ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়েই তো লাখ-লাখ কবর। তার মায়ের কবরের ওপর ছড়িয়ে দিতে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে এক মুঠ মাটি তুলে দিলেই তো হয়, সব শহীদ তো তার আত্মীয়।