ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে দুইদিন দুইরাত

আপডেট : ১৫ মে ২০১৪, ২০:৩১
আমি দাঁড়িয়ে আছি জয়নুলের ছবির সংগ্রহশালা ঘিরে ব্রহ্মপুত্রের একেবারে তীরে। জয়নুলের ছবির সংগ্রহশালা উদ্বোধন করেছিলেন একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সামান্য আগে দেখে এসেছি জয়নুলের চমত্কার ছবির সংগ্রহশালা। কিন্তু এখন চোখের সামনে বিরান মরুভূমি। নদে পানি নেই। বৈশাখ মাসে পার হয় গরু—হাঁটুজল থাকে—কবিতার সেই নির্মম সূত্র চোখের সামনে। ইতিহাসখ্যাত একটি নদ এভাবে মরে যাবে? ভাবতেই পারছিলাম না। হতবাক হয়ে শুকনো, হাঁটুজলের ও কম জলের ভেতর দিয়ে মানুষের চলাচল দেখছি। হঠাত্ পেছনে কারো স্পর্শ পেয়ে তাকাই। বিষণ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। বললেন—দেখেছ, আমার ব্রহ্মপুত্রটাকে ওরা মেরে ফেলছে। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই তিনি চলে গেলেন। আমি আহত পাখির মতো তাকিয়ে আছি মৃত ব্রহ্মপুত্রের দিকে। অনেক দিনের ইচ্ছে—ময়মনসিংহ দেখব। কিন্তু কোনো উপলক্ষ পাচ্ছিলাম না। এবার সেই উপলক্ষ করে দিল সাহিত্য পত্রিকা—‘সাহিত্য বাজার’। ‘সাহিত্য বাজারে’র সাত বছর পূর্তিতে ময়মনসিংহ শহরে সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করেছে পত্রিকার সম্পাদক আরিফ হোসেন । সঙ্গে ছিলেন স্বাধীন চৌধুরী। ময়মনসিংহের তরুণ তুর্কি সাহিত্যকর্মী। সন্মেলন ছিল তিন দিনের। এপ্রিলের ২৪, ২৫ এবং ২৬ তারিখ যথাক্রমে বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার। ছোটগল্পের ওপর আলোচনা ছিল শেষ দিন, অর্থাত্ শনিবার বিকেলে। আমাকে আয়োজক কর্তৃপক্ষ শনিবারের ছোটগল্পের ওপর আলোচনার সুযোগ রেখেছিল। আমি শুক্রবারই হাজির হলাম ময়মমসিংহে, দুপুরে। ইচ্ছে—ময়মনসিংহ শহরকে চোখে দেখব। এখানে জন্মেছেন সাংবাদিক পথিকৃত্ আবুল কালাম শামসুদ্দীন, যিনি ছিলেন অবিভক্ত বঙ্গের রাজধানী কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদের সম্পাদক। জন্মেছেন আয়না ও ফুডকনফারেন্স গল্পের জনক—রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ, এই সময়ের ধীমান ও সাহসী মানুষ—‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু দর্শন’ গ্রন্থের স্রষ্টা অধ্যাপক যতীন সরকার। ময়মনসিংহে আরো আছে প্রাচীন জমিদারদের একটা বুনিয়াদি গোড়াপত্তন। বাস থেকে নেমেই আরিফকে ফোন দিলাম। বলল, রিকশায় চলে আসেন কাচারিঘাটে। এখানে হিমু আড্ডা নামে একটি হোটেল আছে। আমরা এখানে আছি। একটা রিকশা নিয়ে প্রায় বিশ মিনিট পর হাজির হলাম কাচারিঘাটে। উঠলাম হিমু আড্ডায়। হোটেলের বয় বেয়াড়া পরে আছে হলুদ রঙের গেঞ্জি। হোটেলের রঙও হলুদ। হোটেলের বাইরে নদের পাড়ে রাখা প্লাস্টিকের চেয়ারগুলোও হুলুদ। অমর কথাকার হুমায়ূন আহমেদের হিমু এখানে তীব্রভাবে উপস্থিত। হোটেলে পেলাম কবি রওশন ঝুনু, স্বাধীন চৌধুরী আর স্থানীয় সংবাদকর্মী আলপনাকে। পেটে খিদে ছিল, তৃপ্তির সঙ্গে খেয়ে নিলাম। খেয়ে আরিফ আর স্বাধীনের সঙ্গে অলস পায়ে মরা ব্রহ্মপুত্রের পার ধরে হাঁটতে হাঁটতে অলিগলি পার হয়ে পৌঁছুলাম শিল্পকলা একাডেমিতে। সেখানেই চলছে উত্সব আয়োজন। চমত্কার করে সাজানো হয়েছে বইয়ের দোকান। ছিমছাম শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। আমি আশ্রয় নিলাম একাডেমির তিনতলার একটি রুমে। ছোট্ট ব্যাগটা রেখে বসলাম মিলায়নায়তনে। শুরু হয়েছে বিকেলের কবিতা বিষয়ক আলোচনা। আলোচনা করছেন কবি কাজী নাসির মামুন, কবি সুহূদ জাহাঙ্গীর, প্রবন্ধকার আল মাকসুদসহ আরো অনেকে। চলছে কবিতা পাঠ। আমি ফোন করলাম জসীম ভাইকে। বিশিষ্ট ছড়াকার সরকার জসীম। আমাকে তিনি খুব পছন্দ করেন। জসীম ভাই এলে, তাকে বললাম আগামীকাল আমি পুরো ময়মনসিংহ ঘুরে দেখতে চাই। তিনি বললেন—সকালে আমার হোটেল ইশা খা’য় এসো। আমি যেতে না পারলেও আমার নাতি ফাহিম তোমার সঙ্গে যাবে। সাহিত্যের নতুন অভিযাত্রী ফাহিম হাসিখুশি মানুষ। মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। আলোচনা কবিতা পাঠ শেষে আমরা খেতে বের হলাম রাত এগারোটার দিকে। মফস্বলের একটা হাওয়া আছে ময়মনসিংহে। সঙ্গে আছে স্নিগ্ধ পরিকাঠামোও। এত রাতেও শহরের হোটেল খোলা। সঙ্গে নতুন যুক্ত হয়েছেন আলী ইদ্রিস। অধ্যাপক মানুষ। কিন্তু প্রাণখোলা। ডিম ভাজা গরম পরোটা আমরা খেয়ে উঠতে না উঠতেই ঢাকা থেকে এসে যুক্ত হয়েছেন বিশিষ্ট টিভি সাংবাদিক নজরুল কবীর। ও আমাকে দেখে একটু চমকে গেছে। যা-ই হোক—শুরু হলো একটি অভিসারি রাত্রির ঘটনা। আমরা খাওয়া দাওয়া সেরে রুমে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে বের হলাম রাতের ময়মনসিংহ শহর দেখতে। আমরা যখন বের হই শিল্পকলা একাডেমি থেকে, তখন রাত দেড়টা। নজরুল কবীর যেখানেই যায়, সবার দ্বায়িত্ব ওর কাঁধে তুলে নেয়। এ যাত্রায়ও তা-ই হলো। আমি, নজরুল কবীর, আরিফ হোসেন, স্বাধীন চৌধুরী। রিকাশায় গেলাম আবার হোটেলে, চা খেলাম। চা খেয়ে রেলওয়ে স্টেশনে গেলাম। রেলস্টেশন চিরকাল আমার ভালো লাগে। মনে হয় মানুষের শেষ ঠিকানা রেলস্টেশন। কত মানুষ—কত ঘটনা। আমরা স্টেশনে ঢুকতে না ঢুকতেই আজগরের মতো প্রবেশ করলো ‘হাওড়’ ট্রেনটি। অনেকক্ষণ স্টেশনে থেকে রিকশায় যাত্রা শুরু করলাম। নজরুল আর স্বাধীনের রিকশা সামনে। আমার আর আরিফের রিকশা পেছনে। নজরুলের নানাবাড়ি ময়মনসিংহ। এখানের সবকিছু ওর নখদর্পণে। যেতে যেতে ও বলল—এই যে গুদামগুলো দেখছিস, এগুলো ছিল এক সময়ে পাটের গুদাম। এখান থেকে ট্রেনে চেপে এই পাট যেত নানা শিল্পকারখনায়। তাকিয়ে দেখি রাজ্যের অন্ধকার আর কালের ধ্বংসস্তূপের মতো গুদামগুলো কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে। রিকশা চলছে, যেতে যেতে রিকশা থামল একটা পুরোনো জমিদার বাড়ির সামনে। নজরুল বলল—এই অঞ্চলে পুরোনো জমিদার বাড়ি। যে বাড়িটার ভেতরের অবকাঠামো তৈরি হয়েছে কাঠ দিয়ে। ভোরের আজানের সময়ে ফিরে এলাম শিল্পকলায়। সকালে উঠে নাস্তা সেরে গেলাম জসীম ভাইয়ের ইসা খা হোটেলে। আগে থেকেই উপস্থিত ফাহিম। জসীম ভাইয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে গেলাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিরাট এলাকা জুড়ে ক্যাম্পাস। ছায়া সুনিবিড় সুন্দর ক্যাম্পাস। টিকেট কেটে ঢুকলাম বোটানিক্যাল গার্ডেনে। নানা প্রকারের ফলদ আর ঔষধি গাছের বিপুল সমাহার। হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম ব্রহ্মপুত্রের দিকে। দারুণ লাগল—জয়নুল সংগ্রহশালা আর তিন-চার কিলোমিটার দূরে বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্রে কোমর সমান পানির প্রবাহ দেখে। জেলেরা মাছ ধরছে। কেউ সাঁতার কাটছে। তীরে বাঁধা অনেকগুলো বড় বড় নৌকা। জসীম ভাই বললেন—এই সুন্দর দৃশ্যই জয়নুলকে শিল্পী বানিয়েছে। সেখান থেকে গেলাম শত বর্ষের পুরোনো আনন্দমোহন কলেজ ক্যাস্পাসে। গেট দিয়ে ঢুকতেই কবি শামীম সিদ্দিকীর সঙ্গে উদ্দাম মোলাকাত। বুঝে গেলাম মেলা জমে যাবে আরো। বেশ অনেকক্ষণ আড্ডা দিলাম কলেজের পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে। পুকুরের একেবারে লাগোয়া ছাত্রাবাস। শামীম বলল—এই মেসে থাকতেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। সঙ্গে সঙ্গে গুণদাকে ফোন করলাম—ফোন বন্ধ। এরপর সবাই মিলে গাড়িতে করে ফিরে এলাম শিল্পকলায়, তখন বেলা তিনটে। শিল্পকলার কাছে এসে বসলাম তমাল তলায়। এই প্রথম তমাল গাছ দেখলাম। বিকেলে গল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হলো মঞ্চে। গল্প বিষয়ক আলোচনার আগে সাহিত্য সম্মেলন নিয়ে ঘোষণাপত্র পাঠ করলেন উত্সব সমন্বয়ক স্বাধীন চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক আল মাকছুদ, কবি শামীম সিদ্দিকী, তিওফেল নকরেক, গল্পকার সালিম হাসান এবং আমি। পুরো অুনষ্ঠানটি পরিচালনা করলে অধ্যাপক আলী ইদ্রিস। গল্প নিয়ে আলোচনা শেষে চলল কবিতা পাঠ। কবিতা পাঠ শেষে হলো স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মুগ্ধ হয়ে গান শুনলাম। এ আগের দিনেও ছিল আনন্দদায়ক ও প্রেরণায় পূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পরিচালনা করছিলেন ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব আমির হোসেন চৌধুরী। সাহিত্য বাজার আয়োজিত তিন দিনের অনুষ্ঠানের প্রথম দিন উদ্বোধন করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কথাশিল্পী আতা সরকার, নাসরীন জাহান, ছড়াকার দীপঙ্কর চক্রবর্তী, সংস্কৃতির মানুষ আশিক চীেধুরী, আবৃত্তিকার মীর বরকত, কবি ওমর কায়সার এবং কবি শামসুল ফয়েজ। রাতে খেয়ে শিল্পকলায় ফিরে গেলাম। রাতে ঘুম দিলাম, সকাল সাড়ে পাঁচটায় উঠে বাসে উঠলাম ঢাকার উদ্দেশে। বাস এগিয়ে চলছে ঢাকার দিকে, পেছন থেকে ডাকছে জয়নুল, মৃত ব্রহ্মপুত্র আর দুই দিন দুই রাতের রঙিন আনন্দ উচ্ছল সময়। সঙ্গে একটা ভাবনা, বাংলাদেশের সব এলাকায় যদি নিয়মিতভাবে এই রকম সাহিত্য সংস্কৃতির সন্মিলন হতো, আমাদের মরা গাঙে জোয়ার আসত।