বলা যায়, কবিতা হচ্ছে নিঃসঙ্গ শিল্প। এর সামনে কেউ দাঁড়িয়ে নেই, পেছনেও নেই। ডানে-বাঁয়ে তো প্রশ্নই ওঠে না। কবিতাকে দাঁড়াতে হয় নিজের পায়ে, দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সামর্থ্য নিয়ে। যদি সামর্থ্য নেই, উপায় নেই বেঁচে থাকার। তাহলে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, অন্যান্য শিল্প কি সামষ্টিক, দলবদ্ধ। তা কিন্তু নয়। শিল্পের অন্যান্য যে মাধ্যম, এদের প্রকাশের পথে কেউ কেউ সহযোগী হয়ে হাত বাড়ায়, এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। যেমন গান। এর প্রকাশের প্রধান বাহন কণ্ঠ। অবশ্য গানও কবিতা। কবিতা বলে পাঠের বিষয় থাকতেই পারে। তবে গান অনেকটাই শোনার বিষয়। কণ্ঠের নির্ভরতা আছে, আছে সঙ্গত-সহযোগিতা। চারুকলার সহযোগিতা যথেষ্ট স্পষ্ট। দৃশ্যমানতা থাকে। অনুভবের বিষয় যে নেই, তা কিন্তু নয়। শিল্পীকে রঙের রূপায়ণ যেমন ঘটাতে হয়, নিবর্ণও আঁকতে হয়। দৃশ্যগ্রাহ্যতা একটি বড় সহযোগী চারুকলার ক্ষেত্রে। সেই অর্থেই কবিতা নিঃসঙ্গ। তা হলে কি কবিতার পাশে কেউ থাকে না, সহযোগী হয়ে কেউ দাঁড়ায় না! কবিতা কি শুধু শব্দসমষ্টি। তা নয়। কবিতায় শব্দ থাকে, নৈঃশব্দও থাকে। তারপরও কবিতার উপস্থিতি একক এবং সহযোগীহীন। কবিতাকে নিজের পায়েই দাঁড়াতে হয়। যে-কবিতা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না, শেষতক তা অনাবশ্য শব্দ-বর্জ্যে পরিণত হয়। ঘুরে-ফিরে জীবনানন্দ দাশের সেই কথাতেই আসতে হয়—সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। কবিতা-লেখক অনেক থাকে, কিন্তু কবি থাকে কেউ কেউ। সেই ‘কেউ কেউ কবি’র দলে যুক্ত হতে পেরেছেন সিকদার আমিনুল হক। সময়-চিহ্নিতকরণে তাঁকে বলা হয় ষাটের কবি। আসলে কবির কোনো দশক নেই। কবি কালের, সর্বকালের। সিকদার আমিনুল হক কতটা সর্বকালের কবি, তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে তিনি যে তাঁর কালের কবি, আসন্নকালের কবি, এ-কথা বলতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই। সিকদার আমিনুল হক নিঃসঙ্গ শিল্প কবিতার সাধনায় নিমগ্ন থেকেছেন। নিঃসঙ্গতার ভেতর বসবাস করে লিখে গেছেন ‘অগ্নির প্রস্তুত শব্দ এসব কবিতা।’
২.
বাংলা সাহিত্যের শুরু কবিতা দিয়ে, গদ্য এসেছে অনেক পরে। হাজার বছরের সাহিত্য-সৃষ্টির যে যোগফল, তা কিন্তু যথেষ্ট নয়। বৈষ্ণব কবিদের কথা আলাদা। তাঁরা অনেক ভালো কবিতা লিখেছেন। তাদের সমবেত যোগফল, আর পাশাপাশি অন্যান্য কবির কাব্যফল দাঁড় করালে সন্তোষজনক কিছু কি পাওয়া যায়! বাংলা সাহিত্যের এই ম্লানতা কিন্তু কেটে গেছে। কেটে যেতে খুব বেশি সময় নেয়নি। এক-শতকের মধ্যে পরিবর্তন এল। ধীরগতি নয়, কূল ভাসানো এই বিপ্লবী শতকের আদি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের সর্বকূল ছাপানো যে সৃষ্টিস্রোত তৈরি করলেন, এর টান পরবর্তী কবিদের সহজ আনন্দে পৌঁছাল বিশ শতকের দ্বারে। আমাদের বিশ শতক আর ইউরোপের বিশ শতক হয়ে গেল সমান্তরাল। আমাদের জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সুধীন দত্ত সব অর্থেই ইয়েটস, রিল্কে কিংবা পোল এলুয়ারের সমসাময়িক। বলতে হয়, এই একশ বছরে বাংলা কবিতা অনায়াসে অতিক্রম করল পাঁচশ বছরের পথ। মধ্যচল্লিশের পর অর্থাত্ সাতচল্লিশে যে দেশ-ভাগ, মোটা দাগে বলা যায়, রাজনৈতিক ভাগাভাগির পর বাংলা কবিতার নতুন বাঁক লক্ষ করা গেল বাংলা ভাষাভাষি পূর্বাঞ্চলের কবিদের কবিতায়। মধ্য চল্লিশ পর্যন্ত বাংলা কবিতার অখণ্ড রূপ, পঞ্চাশ এবং পরবর্তী সময় বাংলা কবিতার বাঁক বদল হয়েছে বহুবার। এই বাঁক বদলের কোনো কোনোটি অচিহ্নিত থাকলেও কোনো কোনোটি যে গ্রাহ্যতার দাবি রাখে, তা আস্থার সঙ্গে বলা যায়। দশক ধরে বিচার করলে ষাটের কবিদের কর্মফল বাংলা কবিতার শরীরে নতুন লাবণ্য যোগ করেছে। ষাট দশকে অন্যতম প্রধান শব্দ-নির্মাতা আবদুল মান্নান সৈয়দ বলতে চেয়েছেন—‘ষাট দশকের কবি অনুভব করলেন, তাকে ছাড়িয়ে যেতে হবে চল্লিশের কবিতামণ্ডল, পূর্বজ কবিতার পশ্চাত-ভার থেকে যেতে হবে এগিয়ে। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, সমস্যার মোকাবিলা করতে হচ্ছে চল্লিশের সমবায়ী দুর্ধর্ষ শিকারীদের সঙ্গেই যদি সেই কবিতার সংকট সময়কে বরণ্যের সঙ্গে তুলনা দেওয়া যায়; কারণ, মূলত পূর্বজ কবিতা চল্লিশের মোহনী মণ্ডলেরই অন্তঃপাতী। যুবশোভন সংরাগের তলোয়ারে নেতিয়ে-পড়া বায়ুজীবী কবিতা যেন এক-মুহূর্তে চেতিয়ে উঠল ফের। হ্যাঁ, খানিকটা অসংস্কৃত কিন্তু কিছুমাত্র জংধরা নয়—এই প্রেরণাপ্রেরিত সংবাদই কবিতায় ষাট দশকের প্রধান দান।’ মান্নান সৈয়দ স্বদশক নিয়ে এমন ধারণা ব্যক্ত করেছিলেন দশকটির শেষ প্রান্তে এসে। এর পর প্রায় পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ষাটের অনেক কবি এখনো লিখছেন। নিশ্চয় ষাট দশক বাংলা কবিতায় দৃঢ়তা দান করেছে, দান করেছে সময়ের সমর্থ শব্দমালা। ষাট দশকের কবিদের সমষ্টিকতা যেমন গ্রাহ্য, তেমনি তাদের একক অর্জনও সার্বভৌম। কবিতার একটি সার্বভৌম এলাকার নির্মাতা সিকদার আমিনুল হক।
৩.
সম্পর্ক আসলে বয়স মেপে হয় না। যদি তা-ই হতো, তা হলে তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে রাণু বা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর মধুরতম সম্পর্কটি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু হয়েছে। একজন যখন মধ্য আকাশের সূর্য, অন্যজন অস্তাচলগামী। কোনো সমস্যা তো হয়নি। হিসাব-নিকাষের ঊর্ধ্বে যে সম্পর্কের পরিধি, সেখানে বয়স কোনো বিষয় নয়। সিকদার আমিনুল হকের সঙ্গে আমার বয়সের ব্যবধান এক দশকেরও বেশি। এসেছি মফস্বল থেকে। আর তিনি শহুরে মেজাজের মানুষ। আমাদের সম্পর্কের মধ্যে বয়স কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা,
আস্থা, নির্ভরতায় আমাদের সম্পর্কে কখনোই কোনো টানাপোড়েন ছিল না। তাঁকে প্রথম দেখি ‘সাম্প্রতিক’ পত্রিকার অফিসে। সাম্প্রতিক ছিল সে-সময়ের আলোচিত সাহিত্য পত্রিকা। সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বেদু। নিউ মার্কেটের উত্তর পাশের হকার্স মার্কেটের দোতলায় পত্রিকাটির অফিস। তখন তো এত পত্রিকার ভিড় ছিল না। দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা আর হাতে-গোনা কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা—এগুলোই ছিল লেখালেখির ভরসাস্থল। তখন পত্রিকা অফিস মানেই মহা দুর্গম আর পবিত্রতম জায়গা।
দুপুর-টুপুরে হবে। সাম্প্রতিক অফিসে সম্পাদক আছেন, আছেন আরও দুজন। পরিচয় হওয়ার পর জেনেছি, একজন কবি সিকদার আমিনুল হক আর অন্যজন কবি আবুল হাসান। আলাপচারিতায় আবুল হাসান কেমন যেন অসংলগ্ন। জানা গেল আবুল হাসানের মন ভালো নেই। পকেটে যে টাকা ছিল, একশ টাকা হারিয়ে গেছে। বেদু ভাই আর সিকদার ভাই (দুজনকেই ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করার আশকারা পেয়ে গেছি) যত বোঝাচ্ছেন হাসান ততই বিমর্ষ হয়ে পড়ছেন। শেষমেষ সিকদার ভাই হাসান ভাইকে তাঁর এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় নিয়ে গেলেন, সঙ্গে আমাকেও। কোনো কবির ঘরে যাওয়ার এটাই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। কেমন হয় কবির ঘর! কৌতূহল মিটে ছিল সিকদার আমিনুল হকের গৃহদর্শনে। পরে তো সিকদার আমিনুল হকের ঘর আমার এবং আমাদের অনেকের দ্বিতীয় ঘর হয়ে উঠেছিল। সে অবশ্য অনেক পরে। মাঝে বেশ কয়েক বছর কেটেছে, সিকদার আমিনুল হকের সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল আর সব কবির মতোই। ‘বিপ্লব’ পত্রিকা করতে এসে সিকদার আমিনুল হকের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা অগ্রজ আর অনুজের বিখ্যাত সম্পর্কে পৌঁছেছিল। বিপ্লব দীর্ঘায়ু লাভ করেনি। কিন্তু বছর দুয়েক সময়ের সেই বিপ্লব-কালটি আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। সিকদার আমিনুল হক ছিলেন পত্রিকাটির সম্পাদক। আবু কায়সার আর আমি ছিলাম সহকারী সম্পাদক। কায়সার ভাই যে কী অবাক মানুষ ছিলেন, তাঁর সান্নিধ্যে না-এলে তা জানা যেত না। আবু কায়সারকে নিয়ে অনেক লেখার আছে, একটি ঢাউস গ্রন্থেও শেষ করা যাবে না। বিপ্লব-এ আমার সহকর্মী ছিলেন আফজাল হোসেন—বিখ্যাত অভিনয়-শিল্পী, ছিলেন মাসুক হেলাল, শহীদুজ্জামান ফিরোজ, ফরিদ আহমেদ। কী যে মজার সময় কেটেছে আমাদের, একান্ন পরিবারের সদস্য হয়ে। পত্রিকার কারিগরি বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা না-থাকলেও সম্পাদক হিসেবে সিকদার ভাই ছিলেন খুবই সিরিয়াস। লেখা নির্বাচনে ছিলেন শতভাগ পরিপূর্ণবাদী। বিশেষ করে কবিতার ব্যাপারে সামান্য শৈথিল্য ছিল না। কত নামজাদা কবির কবিতা যে তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন। ছন্দ-দুর্বলতা তিনি একেবারেই মেনে নিতেন না। শুধু লেখা নির্বাচন নয়, বিপ্লব পত্রিকায় নিজেও দুহাতে লিখতেন—যখন যেটা প্রয়োজন। ‘উড়ন্ত যোগাযোগ’ নামে একটি কলাম লিখতেন। গদ্যভঙ্গিটি ছিল অভূতপূর্ব। বিপ্লব-এ প্রকাশিত তাঁর কলামগুলো দিয়ে একটি বই হতে পারে। জানি না এ কাজটি কোনোদিন হবে কি না। এই বইটি বের হলে আমরাই উপকৃত হতাম। বিপ্লব-এর সেই সময়টা ছিল নানা দিক থেকেই তাত্পর্যপূর্ণ। এগুলো লিপিবদ্ধ হওয়া দরকার। আবু কায়সার বেঁচে থাকলে সেই কাজটি করতে পারতেন। সিকদার ভাই নেই, নেই আবু কায়সারও। আমার সক্ষমতার দৌড় আমি জানি। তবু যদি সুযোগ মেলে, অক্ষমতার আনন্দটুকু লেখার ইচ্ছা রাখি।
সিকদার আমিনুল হকের কবিতা নিয়ে বিষদ-বিশ্লেষণে কিছু লেখার ক্ষমতা আমার নেই। যাঁরা কবিতার বিশ্লেষক, গবেষক তাঁরা লিখবেন। সিকদার আমিনুল হক, তাঁর কালে খুব যে সমাদৃত ছিলেন, তা নয়। অবজ্ঞা, অবহেলায় জর্জরিত হয়েছেন। ‘দুর্বোধ্য’ এই অপবাদে তাঁকে দূরে ঠেলে রাখা হয়েছে। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, সিকদার আমিনুল হকের কবিতার মূল্যায়নের পরিধি বাড়ছে। শিল্পের নিয়মটাই এ-রকম। যে শিল্পে যথার্থতা আছে, তা আবিষ্কৃত হতে থাকে পরবর্তী সময়ে। সিকদার আমিনুল হকের কবিতার একজন পাঠক হিসেবে এ-টুকু বলতে পারি, উত্তরকালের পাঠক, যাদের কাছে কবির ব্যক্তিগত সম্পর্কের কোনো স্থান-কাল নেই, তারা নতুন নতুন আবিষ্কারের উত্সাহ পেয়ে পরিভ্রমণ করবেন সিকদার আমিনুল হকের কবিতার ভিতর-অন্তর। ছোট হোক বড় হোক অন্বেষণে প্রাপ্তি কিছু না কিছু মিলবেই।
সিকদার আমিনুল হক ছিলেন সার্বক্ষণিক কবি। কবিতার বাইরে তাঁর অন্য কোনো জগত্ ছিল না। অবশ্য, জীবিকার প্রয়োজনে তিনি অনেক উপায়ের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছেন। কিন্তু কোথাও থিতু হতে পারেননি। কবিতা তাঁকে সর্বক্ষণ আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তিনি ছিলেন কবিতার ধোপদুরস্ত সন্ত। ধ্যানমগ্ন, কিন্তু কবিতার পথে ছিল সন্তর্পণ এবং সচেতন অভিযাত্রা। জীবনের শেষ কুড়িটি বছর কবিতা ছাড়া আর কিছুই করেননি। ‘বিষয়বাসনা বিসর্জন’ দিয়ে ডুবে ছিলেন কবিতার জলে, কবিতার ডাঙায়। বিপুলপ্রজ এই কবির দক্ষতাও ছিল অবিশ্রান্ত লেখার। কবিতাই ছিল তাঁর ভাষা, ভালোবাসা।
