সিকদার আমিনুল হকের কবিতা

দ্রোহ ও স্মৃতির সমান্তরাল অনুরণন

আপডেট : ১৫ মে ২০১৪, ২০:৩৩
সারারাত বৃষ্টির আশঙ্কা কবির চৈতন্যলোকে মোহমেঘাচ্ছন্নতার বৈকল্যমোহনায় স্থির হয়ে আছে। আর সেই অন্তর্বৈচিত্র্যের টানাপোড়েন নানামাত্রিকতায় বিজারিত হতে থাকে। স্মৃতিমেদুর অন্তর্জালে পিতার অযত্ন ঠান্ডা ঘুম তাঁকে বহুমাত্রিক কাব্যকলায় বিলোড়িত করেছে। তিনি ‘ভুলে’ শব্দটি ব্যবহার করে তাচ্ছিল্যতার চেয়ে কল্পনার চিত্রল প্রয়াসকে বিচিত্র করেছেন নিজস্ব মুন্সিয়ানায়। যে জীবনবোধ নিয়ে তিনি আকণ্ঠ মৃত্যুভাবনায় নিজেকে নিমজ্জিত রেখেছিলেন এবং সৃষ্টি করেছেন একের পর এক শিল্পসত্ত্বার স্বাতন্ত্র্য সুর তার অভিঘাত গোরস্থানের নিঃসঙ্গতায় বিব্রত পিতার সাথে কি অপরূপ যোগসূত্র সৃষ্টি করেছে। তিনি দ্বিধান্বিত, ‘কি ক’রে ভুললে সব’—প্রশ্নটি যেন তাঁর একার নয়। এই রকম আবেগোত্তেজক শিল্প-মাধুর্যমণ্ডিত নান্দনিক প্রয়াস কেবলমাত্র দহন থেকেই অর্জিত হওয়া সম্ভব। পরাবাস্তবতার নৈরাজ্য থেকে এবং রুগ্ন ও সংকটতাড়িত বাস্তবতার কষাঘাত থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টা তাঁকে স্মৃতিভূমের ওপর রক্তাক্ত স্মৃতিচারণে বিমোহিত করে তোলে। ‘এই বাড়ি, যার পরিচর্যা...’ এ বিষয়টির বুভুক্ষু স্মৃতি-হাহাকারের অন্তরালে নিভৃতে ব্যবচ্ছেদ হতে থাকে। ‘তারা আজ বড় অসহায়...’ এরা কারা? তারা আজ অসহায় কেন? অপ্রাণ বস্তুতে কি অসহায়ত্ব বোঝা যায়? নাকি তারা বুঝতে পারে ভালোবাসার কোনো প্রয়াস? কিন্তু তারপরেই তিনি খোলাসা করেছেন—‘বাড়িও জীবন্ত ব্যক্তি।’ এ কি কল্পনা নাকি সত্য? বাড়ি জীবন্ত ব্যক্তি হয় কী করে? তিনি তো বস্তুসত্তা ও ব্যক্তিসত্তাকে কতিপয় শব্দানুষঙ্গে, উপমা ও কাব্যিকতার নির্মাণশৈলীতে কাব্য-ঘোর সৃষ্টি করেছেন অতি সচেতন ভাবেই। তিনি মিস্ত্রির মতো এই বাড়িটির অসুখ সারাতে ব্যস্ত থাকতেন। এ কাজটিতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত। আর তাঁর এ কাজের সঙ্গী হয়ে কবিতাটিকে আরো বেগবান করেছে তার উপমারা। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা আর স্মৃতিচারণে মুখরিত পরিবারটিতে পেরেক, ইস্ক্রুপ, হাতুড়ি, কলের জল, চৌবাচ্চার শুকনো বুকের মতো কঠিন সংগ্রামে মুখর। বাস্তবতার সাথে যুদ্ধ করে করে তাদেরকে জীবনের মৌলিকতার প্রশ্ন খুঁজতে হয়। তাদের কর্মতত্পরতা ও জীবনধারাকে প্রাকরণিক বিন্যাসে তিনি বিন্যস্ত করেছেন। এই কবিতাটি নিরীক্ষাধর্মী ও গভীর ভাবের কবিতা—এ কথা নিঃসন্দেহে বলা চলে। নাগরিক জীবনের একাকিত্ববোধ, নিঃসঙ্গতা, বহুমাত্রিক দুঃখবোধ আর বৈরী সময়ের নিষ্ঠুর ছোবলে ভারাক্রান্ত অস্থির সম্পর্ক আর শঙ্কা ও বোধের বহুমাত্রিক বিষয়াদি তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। সন্তানদের ছন্নছাড়া জীবন দেখে তাই তো পিতার আশঙ্কাকে চিত্রিত করা হয়েছে এভাবে—‘এরা নয় গৃহমুখী, একদিন তোমার অভাবে/ এ-বাড়ি হয়তো হ’বে শেয়াল-শাসিত ঘন বন।’ কবিতাটিতে সংসার জীবনের নানা আনন্দ বেদনার পাশাপাশি পিতৃ-নির্ভর পরিবারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই কবিতায় রয়েছে ভাবের গভীরতা ও আন্তরিকতা। তবে আমাদের প্রচলিত জীবনের প্রবহমানতার বাইরে নয়। সকলেই যদি নিজস্ব দায়িত্ব পালনে সচেতন না হয় তবে তো তা বিমুখ প্রান্তরে অনির্বাণ বাতিঘরের মতো আমৃত্যু ধুঁকে ধুঁকে জ্বলবে। সন্তানেরা কেউ গৃহমুখী নয়, সুতরাং এ গৃহ তো শেয়াল-শাসিত ঘন বন হতে বাধ্য। কেননা জীবন্ত বাড়িটির কোথাও কোনো প্রাণের সঞ্চার থাকবে না। অযত্ন-অবহেলায় গড়ে ওঠা অগোছালো বনের মতো এ-গৃহখানি অগোছালো হয়ে যাবে। কবির আশঙ্কা মোটেও কল্পনা নয়, এ তো বাস্তব সত্য। আমাদের চারপাশের অতি পরিচিত দৃশ্য এ বিষয়গুলো। তিনি যেমন নাগরিক জীবনের নানা বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনি উপমা-উেপ্রক্ষার শৈল্পিক ব্যবহারে কবিতাটিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে দীপ্তিময় করে তুলেছেন। সিকদার আমিনুল হক মূলতঃ কবি। কাব্যের প্রাকরণিক প্রকৌশলে তিনি অতি সাধারণ বিষয়টিকে মূর্তমান করে তোলেন। করে তোলেন পাঠকগ্রাহী ও হূদয়স্পর্শী। তাঁর নাগরিক সত্তাকে ব্যক্তিসত্তায় অবগাহন ঘটিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি বস্তু-সত্তার শরীরে প্রাণের সঞ্চার ঘটাতে চান অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে। কাব্যের উর্বর ভাণ্ডার থেকে রসদ সংগ্রহ করে তিনি তাঁর স্বতন্ত্র রাজপথ নির্মাণ করেন, কিন্তু হাঁটতে গিয়ে অনুগামী হয়ে পড়েন অগ্রজদের। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনে শামসুর রাহমান ও শহীদ কাদরী-র যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর নাম উজ্জ্বল। তাছাড়া তাঁর কবিতায় কিছুটা শামসুর রাহমানের সুর অনুরণিত হয়েছে—‘তাই যদি হয়, তবে কী ক’রে তোমার মুক্তবোধ/ নিদ্রা নিয়ে তুমি আছো?—তোমার আটটি সন্তানের/ চোখে খাঁ-খাঁ দিগন্তের খরা ভুলে! তোমার অবলা/ সঙ্গিনীকে দেখি আকস্মিক স্তব্ধ, ...’ সংসার ঘন বন হলে পিতার ঘুমের কি ব্যাঘাত ঘটবে? তিনি না ফেরার দেশে থেকে পারবেন না এ অবস্থার পরিত্রাণ ঘটাতে? প্রথম প্যারার মতো এই প্যারাতেও তিনি একটি ‘ভুলে’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। পিতার প্রতি সন্তানদের ক্ষোভ যে ক্ষোভ নয় তা এই ‘ভুলে’ শব্দটি দিয়ে তিনি পরিত্রাণ ঘটিয়েছেন। এর ফলে সমস্ত ক্ষোভ অভিমান হয়ে ঝরে পড়েছে। পিতার সাথে তাদের সম্পর্ক এবং এই সংসারের সম্পর্ককে কোনোভাবেই খাটো করা যাবে না। পিতার সঙ্গিনীটি আসলেই অবলা। তাছাড়া তিনি সঙ্গিবিহীন স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। তিনি আজানের ধ্বনি শুনে আকাশের পানে তাকিয়ে থাকেন যেন কাউকে খুঁজছেন, যেন বা মনে করছেন, ওই আকাশে সঙ্গীর দেখা পাবেন। মা আমার, তোমার অজুর শব্দ শুনতে পান কলঘরে—সন্তানের এমন আকুতিকে দক্ষ চিত্রকল্পের রূপায়ণ বলা চলে। যেন বা শুনতেও পান। দীর্ঘ সময় জায়নামাজের শুদ্ধতায় তিনি স্মৃতির রোমন্থনে ঘুরে ফিরে বেড়ান অতীতের স্মৃতিঘেরা কল্পনার জগতে। কবি তাঁর শিল্প-ক্ষুধা থেকে মুক্ত হতে হতে নাগরিক যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে শুরু করেন। এলিয়টের পোড়ো ভুবন কবিতায় ছড়িয়ে থাকলেও ইউরোপীয় সৌরভে মুখরিত তাঁর কাব্য-ভুবন। তাঁকে রোমান্টিক কবি বলা যায় না, যদিও রোমান্টিক কবিতাও তিনি লিখেছেন। নাগরিক অনুষঙ্গ নিয়ে তিনি তাই তো লিখেছেন—‘আজ সারারাত এই শহরের অলিতে-গলিতে/ বৃষ্টি হ’বে অকাতরে। সারারাত বৃষ্টির চিরুনি/ আঁচড়াবে নগরীর বাড়ি ঘর, দোকান, ফ্যাক্টরী;’ এই অংশে তো বলাই হলো ‘এই শহরের অলিতে-গলিতে’ এবং ‘আঁচড়াবে নগরীর বাড়ি ঘর, দোকান, ফ্যাক্টরী’। শামসুর রাহমান যেমন নাগরিকতা থেকে বেরুতে পারেননি তেমনি সিকদার আমিনুল হকও নাগরিকতা থেকে বেরুতে পারেননি। বৃষ্টির কারণে কেউ পার্কে থাকবে না আস্তানায় বা আস্তাবলে নিরাপত্তা খুঁজে পাবে। কিন্তু আস্তাবলে কারা ঠিকানা খুঁজবে? আস্তাবলে কেন? যেকোনো ঠিকানাকে কি তিনি আস্তাবল বলেছেন? কিন্তু পিতা এই বৃষ্টির রাতে পরিজনহীন ভাঙাচোরা নৌকায় একাকী। এখানে কবি ‘পরিজনহীন’ এবং ‘একাকী’ দুটি ব্যবহার করে কনফিউশন সৃষ্টি করেছেন। ‘পরিজনহীন’ শব্দটি ব্যবহারের পরে অপরিচিত কেউ সাথে আছে ভাবলেও ‘একাকী’ শব্দটি সে ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়েছে। যে পিতা ঝড়ের সামান্য সংবাদের খবরে শশব্যস্ত হয়ে পড়তেন এবং সন্ধ্যার আড্ডা বা নিশীথের সহস্র হাতছানি নিষিদ্ধ করে দিতেন সেই পিতা আজ কেন বৃষ্টিতে ভিজছেন? পিতার অসহায়ত্বের পাশাপাশি নিজেদের ভীতিময় প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন অতি সুনিপুণভাবে। নির্দ্বান্দ্বিক পারিবারিক পটভূমিকে তিনি দ্বান্দ্বিক অবয়বে বিনির্মাণ করেছেন। পিতার পলায়নপর মানসিকতাকে তারা ক্ষোভের অবয়ব দিলেও তা মূলত আবেগের, অভিমানের এবং বেদনাবোধের বহিঃপ্রকাশ। তাই তো তিনি লিখেন—‘নাকি তুমি জেনে গ্যাছো, বাউন্ডুলে-হাভাতে যেভাবে/ উড়ুক্কু স্বভাবে ঘোরে, জীবনে প্রথম এইভাবে/ তুমিও ঘুরবে খুব। ...’ মনোবিশ্লেষণের উপযোগী জটিল এক ধ্রুপদী ভাষাও তিনি রচনা করেছেন এই অংশে। শব্দসমূহ ধ্বনিপ্রধান না হলেও আত্মরতি ও রিরংসা সৃষ্টিতে যথেষ্ট। ভাষাঘোর নয়, তবে মনস্তাত্ত্বিক ইলিউশান পাঠককে সমান্তরাল মোহনায় ঘুরপাক খাওয়াতে থাকে। পিতা কি জেনে গেছে এবং কেন-ই বা জেনে গেছে? প্রাণপ্রিয় সংসার ফেলে বাউণ্ডুলে-হাভাতের উড়ুক্কু স্বভাবকে কেন জীবনের ব্রত করে নিলেন? ক্লেদগ্লানিভরা এ জীবনের প্রতি এত আকর্ষণ আমাদেরকে আবারও ইলিউশানে আবদ্ধ করে। এই বাস্তবতায়, এই নাগরিক জীবনের ভিড়ে কোন প্রেতায়িত বাস্তবতা লুকিয়ে রয়েছে? খাপছাড়া এবং উত্কণ্ঠা ব্যতীত সেই রথ কতদূর ছুটবে তা জানা নেই। তাঁর প্রিয়তম স্ত্রী এবং সন্তানেরা যখন উত্কণ্ঠায় এবং ভীত-সন্ত্রস্ত। ঝড়ো রাত্রি আর ডাকিনীর অশ্লীল চিত্কার তাদের সেই উত্কণ্ঠাকে আরো প্রকটতর করে তুলছে। সে-সময় পিতার অনুপস্থিতিকে কোনোভাবেই তারা মেনে নিতে পারছেন না। পুরো কবিতাটি এক ধরনের স্মৃতিনাট্য। অপ্রাপ্তিজনিত বিকলন, স্বপ্ন-ভঙ্গ, আত্মসংকট আর আশাহতের বেদনায় জর্জরিত কবিতাটি বাস্তবতা আর শিল্পের এক সফল সমন্বয়। তাই তো তিনি লিখেন—‘... ... ... ... ... ... ... ... ...। পথহীন/ রূপালী শহর ভাসে আদিগন্ত নর্দমার জলে :/ গচ্ছিত সম্পদ ভুলে, গৃহ ভুলে তুমিও ছুটবে,/ দেখবেনা সন্তানেরা ধূূ ধূ খরা অকাল বৈশাখে!’ অতি পিতৃনির্ভর পরিবারটি আজ গভীর সংকটে পতিত। রাতভর বৃষ্টিতে উপচে ওঠা রুপালি শহরের কোনো পথ-ঘাট নেই, সকলই নর্দমার নোংরা জলে ডুবে একাকার হয়ে গেছে। শহরটিকে দেখলে মনে হয় যেন নর্দমার জলে ভেসে চলেছে। তথাপি পিতার কোনো হদিস নেই। এই সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে পিতা ছাড়া তাদেরকে কে রক্ষা করবে। তাই তো তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। গচ্ছিত সকল সম্পদ ফেলে, গৃহ ভুলে তিনি কোথায় ছুটবেন? সন্তানদের প্রচণ্ড অভিমান ক্ষোভ হয়ে ঝরে পড়ছে এই অংশেও। যদি শহর নর্দমার জলে ভাসে, তবে সন্তানদের ধূ-ধূ খরা অকাল বৈশাখ কী করে এলো? তাহলে কি ‘খরা’ শব্দটি প্রকৃত খরা নয়, তাহলে তো রুপালি শহরও নর্দমার জলে ভাসছে না। তাহলে তো শব্দগুলো প্রতীকী অর্থে ব্যবহূত। সিকদার আমিনুল হক এইরূপ উপমা আর প্রতীক ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত। পিতৃহীন সন্তানেরা পিতার অভাবকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। সুরের প্রবাহমানতা আর ধ্বনিময়তা কবিতাটির মূল উপজীব্য না হলেও আমরা মোটেও তা অস্বীকার করতে পারি না। তিনি ধ্বনিকে চিত্রময়তায় এবং সুরের সাবলীলতায় উন্মীলন করতে পেরেছেন। কবিতাটির মাঝে যে সংসারটির বর্ণনা করা হয়েছে, আমরা সে সংসারটিকে দেখেছি অনুভবে, দেখেছি কল্পনায় জীবন্ত রাজলক্ষ্মী হিসেবে।