সাহিত্যবিশ্বের পরিসর বিশ্বব্যাপী প্রসারিত হয়ে আছে। সাহিত্যবিশ্বই হচ্ছে আমাদের বৌদ্ধিকবিশ্ব, একথা আগে উল্লেখ করেছি। কিন্তু কীভাবে তা বিস্তার লাভ করেছিল? কোন প্রেক্ষাপটে? কারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? এবার সেইসব প্রসঙ্গ।
সাহিত্য রচিত হয় লেখকদের হাতে, সুতরাং সাহিত্যবিশ্ব সৃষ্টিতে লেখকেরাই মূল ভূমিকা গ্রহণ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। এই লেখকদের মূল সংগ্রামটা ছিল সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে সাহিত্যবিশ্বে স্থান করে নেওয়া। নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করা। এজন্যে সাহিত্যবিশ্ব বা বৌদ্ধিক জগতে অবস্থান করে নেওয়ার জন্য তারা নানা ধরনের লেখা লিখেছেন। লেখার ভেতর দিয়েই চেয়েছেন আত্মপ্রতিষ্ঠিত হতে। লেখার ভেতর দিয়েই তারা সৃষ্টি করে নিয়েছেন এমন পরিসর, যা পাঠকদের কাছে নতুন আর অভিনব মনে হবে। যে-লেখার ধরনটা পুরোনো, প্রকাশভঙ্গি পুরোনো, সেই লেখা তো পাঠকের কাছে সমাদৃত হবে না। ফলে, তারা সাহিত্যের প্রচলিত পথ ছেড়ে নতুন পথে হাঁটার চেষ্টা করেছেন। নতুন ধরনের সাহিত্য উপহার দেওয়ার জন্য সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু নতুন হলেই পাঠক বা সমালোচকেরা সেই সাহিত্যকে গ্রহণ করবেন, এমন তো কোনো কথা নেই। গ্রহণ আর বর্জনের মধ্য দিয়ে তাই তাদের অগ্রসর হতে হয়েছে। সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়াই ছিল ওই লেখকদের কাছে বড় সমস্যা। লেখকেরা কে কাকে ছাড়িয়ে যাবেন, কার লেখা পূর্বসংস্কার ত্যাগ করে আকর্ষক হয়ে উঠবে, এই নিয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা দেয়। সারা পৃথিবী জুড়েই লেখকেরা এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন। কেউ হয়তো নতুন ধরনের একটা লেখা লিখলেন, কিছুদিন পরেই দেখা গেল ওই রীতিটাকে সনাতন বলে বাতিল বলে অন্য একজন আরও নতুনতর কোনো লেখা লিখে পাঠক আর সমালোচকদের চমকে দিচ্ছেন। আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের তিক্ত তর্ক-বিতর্কেও জড়িয়ে পড়েছিলেন লেখকেরা। বেশ দ্রুতই বদলে যাচ্ছিল সাহিত্যিক অভিজ্ঞান আর পরিবেশ। একটা ধারা প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি ধারা এসে তাকে সরিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইছিল।
এইসব লেখকের রচনার দিকে যদি দৃষ্টি নিবদ্ধ করি, তাদের লেখা যদি পড়ি, তাহলে এক অস্বাভাবিক, বিস্ময়কর পৃথিবীর সন্ধান মিলবে। কেমন ছিল সেই রচনাবিশ্ব? ওই সময়ের লেখকেরা নানাভাবে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু যেভাবেই তারা ব্যাখ্যা করুন না কেন, ঘুরে-ফিরে একটা কথাই পুনরুচ্চারিত হয়েছে, আর সেটা হচ্ছে ‘বাণিজ্য’। সাহিত্য আর কিছুই নয়, পাঠকের বাজারে সাহিত্য কতটা বিকোবে, সেটাই হচ্ছে আসল কথা। রুশ ফিউচারিস্ট কবি ও নাট্যকার ভ্লেদিমির ক্লেভনিকভ সাহিত্যকে বলেছিলেন ‘বাচনিক বাজার’, যে বাজারকে দখল করার জন্য লেখকেরা ‘অদৃশ্য যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েছেন। মহান জার্মান লেখক গ্যেটে সাহিত্যকে ‘বৌদ্ধিক পণ্যের বিশ্ববাজার’ বলে মহিমান্বিত করেছিলেন। ফরাসি কবি পল ভ্যালেরি এত রাখঢাক না করে বলেছিলেন, ‘সংস্কৃতি হচ্ছে পুঁজি’, আর সাহিত্য হচ্ছে এই সংস্কৃতিরই উজ্জ্বলতম শস্য। সাহিত্যবিশ্বে তাই স্থান করে নেওয়ার জন্যে লেখকেরা যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হবেন, এটাই ছিল স্বাভাবিক। বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সময়ে এভাবে লেখকেরা যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন, ভ্যালেরি তাকে উল্লেখ করেছেন ‘অধ্যাত্ম অর্থনীতি’ বলে। লেখকেরা এই অধ্যাত্ম অর্থনীতির অসমাপ্ত ছবি এঁকেছেন, নিজেদের সৃষ্টিশীল লেখাকে বলেছেন প্রথাহীন, অভিনব। উপন্যাস রচনাতেও বৃত হয়েছিলেন তারা। উদ্ভাবন করেছিলেন নিজেদের লেখাকে ব্যাখ্যা করবার নানা অভিনব কলাকৌশল। কিন্তু এই উদ্ভাবনা সত্ত্বেও কোনো লেখকই নিশ্চিতভাবে বিশ্ববৌদ্ধিক জগতে তার অবস্থান কোথায়, সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। বুঝতেও পারেননি তার প্রকৃত অবস্থান। সাহিত্যবিশ্বের সাধারণ সূত্র সম্পর্কেও তারা সচেতন ছিলেন না।
লেখালেখির ধরনটা ছিল এমন, যে যা লিখেছেন সেই লেখাকেই তিনি শ্রেষ্ঠ বা উল্লেখযোগ্য মনে করেছেন। এভাবেই লেখক সংকীর্ণ একটা খাঁচায় বন্দি হয়ে পড়েছিলেন। তিনি সাহিত্যবিশ্বের যে অংশের স্রষ্টা সেই অংশটাকেই শুধু দেখতে পেয়েছেন, সাহিত্যসমগ্রের সম্পূর্ণ চেহারাটা তার চোখে পড়েনি। সাহিত্যকে দেখার সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই লেখকেরা এই অন্ধত্বের শিকার হয়েছিলেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিশ্বাসের এই অন্ধত্ব যে-কোনো লেখকের জন্যে মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। নিজের বিশ্বাসের কারণে নিজের বা নিজের মতো কিছু লেখকের লেখা ছাড়া অন্যদের লেখাকে অগ্রাহ্য করবার প্রবণতা তাকে পেয়ে বসতে পারে। অন্য সবার রচনা তখন তার কাছে মনে হতে পারে ঝাপসা, অদৃশ্য বা অনুল্লেখযোগ্য। লেখকের মধ্যে নিজের লেখা নিয়ে আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিরও জন্ম হয় এভাবেই। ফলে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে এই লেখকেরা কী বলেছিলেন, সতর্কতার সঙ্গে সেই কথাগুলো বোঝাটা জরুরি। যে ভাবাদর্শে তারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, যে প্রজ্ঞার অধিকারী তারা ছিলেন, অনুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দেখলেই আন্তর্জাতিক বৌদ্ধিকতার পরিসরকে ছুঁয়ে দেওয়া সহজ হবে। ফলে, সাদামাঠাভাবে নয়, তাদের রচনাকে দেখতে হবে গভীরভাবে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। প্রতিটি সৃষ্টিশীল রচনা থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে যে আলো, অবগাহন করতে হবে সেই আলোর ঝরনাধারায়।
সাহিত্যের একটা ‘রাজনীতি’ আছে, কথাটা তুলেছিলেন ভ্যালেরি লারবো। এই কথাটার মর্মার্থ কী? লারবোই জানাচ্ছেন, সাহিত্যের পথটা তার নিজস্ব, নিজের যুক্তিশীলতার ওপর ভর করেই সে চলে। জাতীয় রাজনীতি বা জাতিরাষ্ট্রের রাজনীতি সাহিত্যের এই পথ ও মত সম্পর্কে সচেতন থাকে না। লারবো একারণেই বলেছেন, বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র এবং বৌদ্ধিক মানচিত্রের মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক। সাহিত্যের পরিবর্তন বা বাঁক-পরিবর্তন ঘটে প্রতি পঞ্চাশ বছরে। অনিশ্চিত, অনির্দেশ্যভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে সাহিত্য, নানা রূপে নানা ঢঙে পাঠকের সামনে তা হাজির হয়। নতুনত্বের ছোঁয়ায় পাঠকের ঘোর লাগে। দেশে দেশে এইভাবে সাহিত্যচর্চার কারণে সাহিত্যবিশ্বের কেন্দ্রটিও এই সময়ে ক্রমাগত বদলে গিয়েছিল, তৈরি হয়েছিল নতুন নতুন সাহিত্যকেন্দ্র।
বৌদ্ধিক মানচিত্র অবশ্য রাজনীতির মতো দ্রুত বদলায় না। সৃজনশীলতায় বড় রকমের ধস না নামা পর্যন্ত অথবা নতুন কোনো শক্তিশালী সাহিত্যকেন্দ্র গড়ে না ওঠা পর্যন্ত এর সীমানাও অনেকদিন সুরক্ষিত থাকে। বৌদ্ধিক বা সৃষ্টিশীল রাজনীতির সঙ্গে অর্থনৈতিক রাজনীতির তাই কোনো সম্পর্ক নেই। এই দুই পৃথিবী একেবারেই আলাদা।
ফার্নান্দ ব্রোদেল এই বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষাপটেই বলেছিলেন, শিল্পসাহিত্যের যে পরিসর বা পৃথিবী, তা অনেক মুক্ত, স্বাধীন। পক্ষান্তরে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পরিসরের এতটা স্বাধীনতা উপভোগ করবার সুযোগ নেই। ষোল শতকে ভেনিস ছিল ইউরোপের অর্থনৈতিক রাজধানী। কিন্তু সেই সময়ে ভেনিসের নয়, বৌদ্ধিক জগতে চালু ছিল ফ্লোরেন্স ও তুসকানের স্থানীয় ভাষা বা বুলি। সতেরো শতকে আমাস্টারডাম ছিল ইউরোপীয় বাণিজ্যের কেন্দ্র। কিন্তু সাহিত্য-শিল্পে দারুণ সমৃদ্ধ ছিল রোম ও মাদ্রিদ। আঠারো শতকে লন্ডন হয়ে উঠেছিল বিশ্বঅর্থনীতির কেন্দ্র, কিন্তু সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করেছিল প্যারি। একইভাবে, ব্রোদেল বলছেন, উনিশ শতকের শেষ দিকে এবং বিশ শতকের প্রথম দিকে ফ্রান্স যদিও অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপের অন্যান্য অংশের তুলনায় পিছিয়ে ছিল, কিন্তু পশ্চিমী চিত্রকলা ও সাহিত্যের অবিসংবাদিত কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এই দেশটি। ইতালি এবং জার্মানি যখন সংগীতের জগতে প্রাধান্য বিস্তার করে ছিল, তখন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান তেমন সুসংহত ছিল না। এমনকি এখন, এই সময়ের বিশ্বঅর্থনীতির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু দেশটি শিল্পসাহিত্যের নেতৃত্বে নেই। কীভাবে আসলে এই সাহিত্যজগত্ গড়ে ওঠে বা প্রাধান্য বিস্তার করে, সেটা বুঝতে হলে এর নানা সীমান্ত, নানা রাজধানী, বিভিন্ন সরণী এবং এর যোগাযোগ পদ্ধতি বা ছড়িয়ে পড়ার রীতিপদ্ধতিটা বোঝা জরুরি। এর সঙ্গে যে সব সময় রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিশ্বের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যাবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। সৃষ্টিশীল সাহিত্যবিশ্ব মূলত অনেকটা স্বাধীন; সৃষ্টিশীল সাহিত্যও স্বতন্ত্রভাবেই বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চর্চিত হয়েছে এবং ছড়িয়ে পড়েছে। সাহিত্যবিশ্বের এটাই হচ্ছে প্রধান বৈশিষ্ট্য।
