সিকদার আমিনুল হক বাংলার গালিব

আপডেট : ১৫ মে ২০১৪, ২০:৩৬
বুদ্ধদেব বসুর মতে—আমরা কোনো কিছুই নির্মাণ করতে পারি না; পুনর্নির্মাণ করি মাত্র। আর এই পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়েও কবি স্বীয় কাব্যভাষা নির্মাণের চেষ্টা করেন। এই কাব্যভাষা বা স্বতন্ত্র স্বর-এর কারণে প্রকৃত কবি গৌণ কবি থেকে আলাদা হন। অনেক ভালো কবিতা লিখেও স্বাতন্ত্র্য না থাকার কারণে সাহিত্যের ইতিহাস থেকে অনেক কবি হারিয়ে গেছেন । তাই স্বীয় কাব্যভাষা বা কবিতার স্বর সৃষ্টি করতে প্রায় প্রত্যেক কবিই সচেতন। কেউ হয়তো পারেন, কেউ পারেন না। তারপরও কবিতার পথে অন্তহীন যাত্রা চলতে থাকে। ত্রিশের দশকে যেমন নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যের কারণে জীবনান্দ বাংলার সোনালি ডানার চিল হয়ে ছিলেন আছেন এবং থাকবেন। তেমনি পঞ্চাশের নাগরিক কবি শামসুর রাহমান নাগরিক জটিলতা, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতিনিধিত্বকারী সরল ও সহজবোধ্য কাব্যভাষায় পাঠক-হূদয়ে বেঁচে থাকবেন। তেমনি আল মাহমুদ গ্রাম-বাংলার সৌন্দর্য ও বাংলা প্রকৃতির সুতোর বুননে নির্মিত চিত্রকল্প রূপক উপমায় থাকবেন অম্লান। আর ঠিক একইভাবে ষাটের দশকে যে কবিদের অস্তিত্ব অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলা কবিতায়; তাঁদের একজন যদি আবুল হাসান, তবে নিশ্চয়ই অন্যজন সিকদার আমিনুল হক। আবুল হাসানের চিন্তার গভীরতা, শব্দের সাথে শব্দের সংযোজন ও বিমূর্ত ভাবনা নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি করে খেলার ক্ষমতা আজও প্রভাবিত করে তরুণদের। কারণ কবি সিকদার আমিনুল হক স্বতন্ত্র আকাশ নির্মাণ করেছেন—ষাটের ডিসকোর্সধর্মী কবি রফিক আজাদের কবিতা, কবি আসাদ চৌধুরীর গ্রাম বাংলার শ্লোকনির্ভর রচনা, বা জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখরে সহজতর ভাষায় কবি হেলাল হাফিজের আরোহনের প্রচেষ্টা বা মহাদেব সাহার নির্মল প্রেম, বিরহ-বেদনার কবিতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে। তাঁর এই আলাদা আকাশ কখনো গালিবিয় দর্শননির্ভর আবার কখনো র্যাবোঁর মতো চিত্ররূপময় প্রকৃতি ও নারীর সৌন্দর্য বর্ণনায় ব্রত। বিমূর্ত ভাবনায় ডুবে গিয়ে চিত্রকল্পের চিত্ররূপময়তায় কবিতার শরীরে দার্শনিক সত্যের বুননে নির্মাণ করেছেন স্বীয় কাব্যভাষা। কবি নজরুল ইসলাম যখন বলেন—‘হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান;/ দানিয়াছ খ্রীস্টের সম্মান কণ্টক-মুকুট শোভা’। তখন এক চিরন্তন সত্য আমাদের সামনে ভেসে আসে। যেমন—পৃথিবীর অধিকাংশ মহত্জন দারিদ্র্যে থেকেই মহত্ কাজগুলো করতে সক্ষম হয়েছেন। এ কথা যেমন আইনস্টাইনের বেলায় সত্য, তেমনি পাবলো নেরুদা বা বোদলেয়ারের ক্ষেত্রেও সত্য। এই সত্যকে তুলে ধরে যে চিত্র কবি নির্মাণ করেন তা-ই কবিতার দর্শন। একইভাবে রবীন্দ্রনাথের ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে’। অন্যায়ের প্রতিরোধ না করার কারণে অন্যায়কারী আরও প্রশ্রয় পায়। তাই যে অন্যায় করার প্রশ্রয় দিয়ে সমাজে অনাচার সৃষ্টি করার সুযোগ তৈরি করে দেয়—তাদের উভয়ের প্রতি কবি ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। আর এই বাস্তবতাকে আমরা দর্শন বলি। এরকম অসংখ্য উদাহরণ নিয়ে ‘সতত ডানার মানুষ’ কাব্যগ্রন্থে কবির উজ্জ্বল উপস্থিতি। আর তাই তিনি যখন বলেন, ‘কে ভোলে দুঃসহ গ্রীষ্মের রাত্রি, আকাঙ্ক্ষিতা নারীর প্রত্যাখান...।’ তখন পাঠকও দার্শনিক ভাবনায় ডুবে যান। কারণ এও বিরহী প্রেমিকের বেলায় চিরন্তন সত্য। তিনি যেমন নারীর সৌন্দর্য বর্ণনায় ফরাসি কবি র্যাবোঁর শিষ্য, ঠিক তেমনি মৃত্যুচিন্তার মাধ্যমে পরমাত্মার সাথে মানবাত্মার মিলনের বিষয়ে দ্বারস্থ—গালিব, রুমি ও খৈয়্যামের। গালিবিয় ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকা, রুমির মতো মৃত্যুচেতনা ছড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর পরে আমরা জেগে উঠবো।.../ গণিকার জন্য যেমন সন্ধ্যা; মহার্ঘ অলঙ্কার আর রেশমের পোশাক পরা অনিচ্ছুক মুহূর্ত;/ সেরকমই শব্দহীন অনন্ত প্রান্তরের ওপর আমাদের জাগরণ।’ এখানে তিনি দর্শনকে বিমূর্ত চিন্তার চিত্রকল্পায়নের মাধ্যমে বাস্তব করে তুলেছেন। কবিতায় ও গদ্যের মতো দর্শন আসতে পারে স্বতস্ফূর্তভাবে। কারণ, কবিই বলতে পারেন, ‘কিন্তু প্রেম অভিনন্দের চেয়ে ক্ষণস্থায়ী’ বা ‘শেষ কবিতাটি কবি কখন লিখবে সে নিজেই জানে/ আবার ঠিক জানেও না । শেষ নারীটির প্রতীক্ষায় মানুষ এ রকমই মুখর, আবার একই ধরনের/ হতাশায় বোবা।...’ যাকে দার্শনিক কাব্য বলতে হয়। একইভাবে তিনি আধ্যাত্মিকতার বিমূর্ত ভাবনাকে বাস্তবে চিত্রায়ণ করেন ‘মৃত্যু’ শব্দটি দ্বারা। কারণ, পৃথিবীতে মানব অস্তিত্বের প্রয়োজন শুধু স্রষ্টাকে স্মরণ করার জন্য। আর ‘যে হূদয় সেই স্রষ্টার স্মরণ করতে পারল না—তার মতো অকৃতজ্ঞ কে আছে।’ জালালুদ্দিন রুমির এই আধ্যাত্মিকতা তাঁকে মোহগ্রস্ত করে। তাই তিনি বলেন, ‘মৃতের মুখের কাছে অমি বসলাম— একটি বিশাল মাঠের ওপর বাদামী ঘোড়ার নিঃসঙ্গতার/ গাম্ভীর্য সেই প্রথম আমি টের পাই’। অর্থাত্ তিনিও প্রথম প্রথম বিশ্বাস করেন স্রষ্টাহীন জীবন অর্থহীন। কিন্তু পরক্ষণেই নিজস্ব সত্তা প্রকাশ করতে তিনি বলেন, ‘জানালায় পরীদের বসা যেন ঠিক ফুলের ওপর প্রজাপতি। কেবল তারা পরেছিলো আপাদমস্তক/ মসলিনের শাদা পোশাক।... বোধ হয় মৃতের সামনে সুুগোল স্তন আর খুলতে নেই’। ফরাসি ভাষায় নারীর সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি ফার্সি আধ্যাত্মিক কবিদের চিন্তার সংমিশ্রণ তাঁর কাব্যভাষা তৈরির মূল কাঁচামাল বা বৈশিষ্ট্য। যেখানে বারংবার চিত্ররূপময় অবস্থা বা Sensory imagery তৈরি করে কবি বলেন, ‘বালিকা বয়স থেকেই নিদ্রিত স্তন হ’য়ে ওঠে নৈরাশ্য এবং/ সম্পদের ভার! তাঁরা বাঁচে বসন্ত আর প্রেমের কয়েকটা দিন... বাতাস আর পাতাও যখন তাদের/ ইশারায় কাঁদায়, সেই সরল কয়েকটা দিনই ওদের নির্ভুল।’ এ কবিতার চিত্রকল্পকে বোঝাতে পাঠককে তিনি একই সাথে শ্রবণ, দর্শন, স্বাদের অনুভব, ঘ্রাণ নেয়া ও স্পর্শের প্রয়োজন হয়। এত কিছুর পরও যদি তাঁর সাথে সম্পৃক্ত হয় গালিবিয় প্রেম তবে কবিতার নেশায় ডুব দিতে পাঠক কেনই বা চাইবেন না। কারণ, গালিব যেখানে বলেন, ‘এদিকে আমি শতো সহস্র আর্তনাদ/ ওদিকে তুমি এক পরমাশ্চর্য না শোনা।’ তিনিও স্বর পরিবর্তন করে বলেন, ‘বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি, আর তোমার মনে দুঃস্বপ্নের উত্সব’। তারপও তাঁর কবিতার বৈচিত্র্যময় ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়। কারণ, তিনি শুধু গালিবিয় প্রেমে তৃপ্ত হতে পারেন না। তিনি প্রেমের সফলতা মিলনে বিশ্বাসী । তাই কখনো ফ্রয়েডের উসকানিতে পাঠকমনকে আক্রান্ত করে তাঁর কবিতা বলে ওঠে, ‘যেন ঘুরে ফিরে তোমার আগুনের মধ্যেইে যাচ্ছি বারবার!... তোমার উদ্ধত ঊরু আর পশুর মতো গর্জনের সামনে।’ কবিতার প্রতি পাঠক সহজেই আকর্ষিত হন কবির বক্তব্যশৈলী দ্বারা। তার বক্তব্যের হাতুড়ি পাঠকহূদয়ে দারুণ আঘাত করে, যা উদ্ধৃতি দিয়ে বোঝানোর চেয়ে বারবার সেই পঙিক্ত পাঠ করে বিরহ-ব্যাথায় আহত হওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়। যেমন, ‘এখনও নারী মাত্রই বিদায় নেবার সময়/ তার মনোনীত পুরুষকে যন্ত্রণার কথাই শুধোয়।’ বা ‘তার চুল লেবু পাতার গন্ধকেও হার মানায়’ বা ‘...মানুষের কোন হারানোর বেদনা নেই। তথাপি আমি যে থরথর ক’রে কাঁপি, সে/ এক বোবা পবিত্রতা,’ বা ‘কিন্তু লালসার বর্শা আমাকেও রক্তাক্ত করে অগের মতোই।’ এই চিত্ররূপময় আধ্যাত্মিকতার কারণেই তিনি সিকদার আমিনুল হক। কারণ সিকদার আমিনুল হক বাংলার র্যাবোঁ অন্তত না হন, না হন বাংলাদেশের জালালুদ্দিন রুমি, কিন্তু তিনি যে দর্শনের সৌন্দর্যে বাংলা কবিতাকে স্নান করিয়েছেন, ফরাসি চিত্ররূপময়তায় যেভাবে নারীকে তুলে ধরেছেন, জন ডানের মতো যেভাবে বিমূর্ত ভাবনায় আমাদের চিন্তাকে প্রসারিত করেছেন, যেভাবে শব্দের সাথে শব্দের বিয়ে দিয়ে অনন্য চিত্রকল্প তৈরি করেছেন—এ জন্য অন্তত তিনি বাংলাদেশের গালিব হওয়ার অধিকার রাখেন। সিকদার আমিনুল হক স্মরণসভা কবি সিকদার আমিনুল হকের একাদশতম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আগামীকাল ১৭ মে ২০১৪, শনিবার বিকেল ৫.৩০ এ শাহবাগস্থ গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের সেমিনার হলে ‘সতত ডানার কবি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কবি সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন কবি মিনার মনসুর। আলোচনায় অংশ নেবেন কবি রফিক আজাদ, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কবি কামাল চৌধুরী এবং অধ্যাপক মাসুদুজ্জামান।