অবশেষে গ্রেফতার হচ্ছেন সেই তিন র্যাব কর্মকর্তা

আপডেট : ১৫ মে ২০১৪, ২৩:২০
নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় অবশেষে গ্রেফতার হচ্ছেন র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা। তাদের গ্রেফতারের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা দূর হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠির জবাব গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পাওয়া গেছে। চিঠিতে পুলিশকে কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিওর (সিআরপিসি) অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল সন্ধ্যায় ইত্তেফাককে বলেন, ‘প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়া গেছে। তবে চিঠির বিষয়বস্তু আমি দেখিনি। অফিস থেকে বের হওয়ার সময় চিঠি পাওয়ার কথা আমাকে ফোনে জানানো হয়েছে। যদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পুলিশকে সিআরপিসি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলে- তাহলে তাদের গ্রেফতারে আর কোন আইনগত বাধা নেই।’ গত ১১ মে বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাকে অবিলম্বে গ্রেফতারে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজি) নির্দেশ দিয়েছিলো। হাইকোর্টের ওই নির্দেশের পর পাঁচ দিনেও তা কার্যকর হয়নি। হাইকোর্টের আদেশ পাওয়ার পর তা প্রতিপালনের জন্য আইজিপি চিঠিটি পাঠিয়ে দেন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের কাছে। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দেয়া হয়। জানা গেছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় চিঠিটি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে পাঠায়। তারপর ওই চিঠি যায় সেনা ও নৌ-বাহিনীর হাতে। সেখান থেকে জবাব পাওয়ার পর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পুলিশের চিঠির জবাব দিয়েছে। ফলে এই পাঁচ দিন চিঠি চালাচালির মধ্যে আইনগত প্রক্রিয়া চলেছে। পুলিশ সদর দফতরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, এখন সাবেক তিন র্যাব কর্মকর্তাকে গ্রেফতারে অভিযান চলানো হবে। যদিও তারা সেনাবাহিনীর লগ এরিয়াতেই আছেন। ফলে তাদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশকে তেমন কোন অভিযান চালাতে হবে না। তাদের গ্রেফতারের পরই নারায়ণগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হবে। এর আগে এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেছেন, অবসরে পাঠানো সশস্ত্র বাহিনীর তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারে পুলিশের আইজিকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হাইকোর্ট নির্দেশ দিলেও তাদের গ্রেফতারে দেরি হওয়ায় আদালত অবমাননা হবে না। কারণ আদালত কোনো সময় বেধে দেয়নি। তাদের গ্রেফতারে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো কি হবে সেটা সময়ই বলে দেবে। এ ধরনের আদেশে গ্রেফতারে কত দিন পর্যন্ত সময় গ্রহণযোগ্য- এমন প্রশ্নের জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেন, সেটা আমি জানি না। আদালত বলতে পারে। প্রসঙ্গত, নিহত নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম এই হত্যাকাণ্ডের র্যাব কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করার পর র্যাব-১১ এর তত্কালীন কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এম এম রানাকে নিজ বাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়। এরপর সেনাবাহিনী গত ৫ মে লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ ও মেজর আরিফ হোসেনকে অকালীন অবসরে পাঠায়। আর লে. কমান্ডার এম এম রানাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয় নৌ বাহিনী। নূর হোসেনের বাড়ির মালামাল ক্রোক আমাদের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারসহ ৭ জনকে অপহরণ ও খুনের ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত নূর হোসেনের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলের টেকপাড়ার বাড়িতে মালামাল জব্দ করতে গতকাল বিকাল অভিযান চালায় পুলিশ। দুইতলা ভবনের নিচতলার কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে পুলিশ। অভিযানে জব্দ করা মালামাল বাড়ির সামনের উঠানে এনে জড়ো করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- ৮টি গুলিসহ একটি রিভলবার, শটগানের ৮টি কার্তুজ, দুটি ম্যাকাও পাখি, একটি হরিণের চামড়া, শাড়ি, পাঞ্জাবি, ১২টি ঘড়ি, ৫ টাকা নোটের ২টি বান্ডিল, দলিলপত্র, সিলিংফ্যান ৩টা, ২ সেট সোফা, এলইডি টিভি ৫টা, ২১ ইঞ্চি রঙিন টিভি ১টা, খেলনা ছুরি ২টা, খেলনা পিস্তল ১টা, বক্স খাট ১টা, সিডি প্লেয়ার সাউন্ড সিস্টেমসহ ২টা, ওয়ারড্রোব ২টা, শোকেশ ২টা, কার্পেট, কম্বল, হাঁড়ি-পাতিলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। ৫ জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের একটি পুলিশ টিম এই ক্রোক অভিযান করে। পুরো ক্রোক অভিযানের তদারকি করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের এনডিসি আবুল কাশেম শাহীন। এসময় সিআইডি নারায়ণগঞ্জের এএসপি এহসানউদ্দিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত শহীদ চেয়ারম্যান এদিকে ৭ জনকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনায় র্যাবকে অভিযুক্ত করে বক্তব্য দেয়ার পর থেকে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম। র্যাব তাকে মেরে ফেলতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। গতকাল তিনি গণশুনানিতে হাজির হয়ে র্যাবের সাবেক ৩ কর্মকর্তাসহ অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আবারো অনুরোধ করেন। সিদ্ধিরগঞ্জে গণশুনানি কাল নিহত নজরুলের ভাই আবদুস সালাম গণশুনানিতে গিয়ে তদন্ত কমিটিকে বলেন, এভাবে সার্কিট হাউজে এসে লোকজন সাক্ষ্য দিতে ভয় পায়। কারণ এখানে অনেক মিডিয়াসহ লোকজনের নজর থাকায় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী থাকলেও কেউ আসেনি। তাই তদন্ত কমিটির উচিত ঘটনাস্থলসহ সিদ্ধিরগঞ্জে গিয়ে সাক্ষ্য নেয়া। তার এই বক্তব্যের পর তদন্ত কমিটি গণশুনানি আরো একদিন বাড়িয়েছে। এবার গণশুনানি হবে সিদ্ধিরগঞ্জে। শুনানি চলাকালে তদন্ত কমিটির প্রধান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শাহজাহান আলী মোল্লা সাংবাদিকদের বলেন, আগামী শনিবার সিদ্ধিরগঞ্জের পাওয়ার হাউজে গণশুনানি হবে। তিনি জানান, ১২ মে ও ১৫ মে দুদিন সার্কিট হাউজে গণশুনানিতে অনেক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এসব প্রকাশ করা যাচ্ছে না। গতকাল গণশুনানিতে ৮৭ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সাক্ষ্য দিয়েছেন ৬০ জন। গতকালও সবাই নূর হোসেন ও র্যাবকে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বক্তব্য দিয়েছে বলে জানা গেছে। এসপির প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য গতকাল ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় প্রকাশিত ‘গ্রেফতারের পরও হাসুকে নিয়ে পুলিশের লুকোচুরি’ শীর্ষ সংবাদের একাংশের প্রতিবাদ করেছেন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন। প্রতিবাদ লিপিতে তিনি বলেছেন, ‘বাসসের বরাত দিয়ে তাকে উদ্ধৃত করে যে বক্তব্য ছাপা হয়েছে তা ঠিক নয়। হাসুকে গ্রেফতারের বিষয়টি তিনি বাসসকে নিশ্চিত করেননি।’ প্রতিবেদকের বক্তব্য:রিপোর্টে প্রকাশিত বক্তব্য ইত্তেফাকের নিজস্ব নয়। বাসসের বরাত দিয়েই এসপির বক্তব্য ছাপা হয়েছে।