পরিবেশের ক্ষতি করে কোন উন্নয়নই টেকসই হবে না

আপডেট : ১৫ মে ২০১৪, ২৩:২৬
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবেশবান্ধব হওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করা ছাড়া কোন উন্নয়নই টেকসই হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ মোকাবেলা ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় পরিদর্শন এবং মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বক্তব্য রাখেন। তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী গতকাল পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে অফিস করেন। সকাল সাড়ে ১০টায় তিনি এই মন্ত্রণালয়ে পৌঁছান। এ সময় পরিবেশ ও বন মন্ত্রী তাঁকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিল্প বর্জ্য দ্বারা নদী, জমি ও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে কোন উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, শিল্প বর্জ্য ও খেয়া পারাপারের নৌকার ইঞ্জিনের জ্বালানিই বুড়িগঙ্গা দূষণের মূল কারণ। এ দূষণ রোধের উপায় বের করার জন্য তিনি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এখন বুড়িগঙ্গার দিকে তাকালে চোখে পানি চলে আসে। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে তাঁর সরকার যেকোন পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না। এই নদীকে দূষণমুক্ত এবং ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে অন্যান্য নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে ১৩৫টি ড্রেন দিয়ে রাজধানীর আবাসিক ও কল-কারখানার সমস্ত বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পৌঁছে। এসব ড্রেনের লাইনকে একটি লাইনে এনে বর্জ্য অন্যত্র ফেলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সরকার বুড়িগঙ্গার তীরে একটি কেন্দ্রীয় শোধনাগার তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এতে যত অর্থেরই প্রয়োজন হোক না কেন তা দূষণের কাছে কিছুই না। একটি কার্যকর দূষণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পারাপারের খেয়ায় ইঞ্জিনের ব্যবহার বন্ধ করে বৈঠার প্রচলন চালু করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য বন সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার গ্রীন হাউস গ্যাস কমাতে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে বনায়ন করার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে চরাঞ্চলে প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর জমিতে বনায়ন করে নয়নাভিরাম উপকূলীয় বন সৃষ্টি করা হয়েছে। এই উপকূলীয় বনায়ন প্রক্রিয়ায় বঙ্গোপসাগর থেকে ১ হাজার ২শ’ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ভূমি দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দেশের বন্যপ্রাণী ও জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে ৩৭টি সংরক্ষিত এলাকা পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া ১৪টি ইকো-পার্ক, উদ্ভিদ উদ্যান, সাফারি পার্ক পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক এবং চট্টগ্রামে রাসেল এভিয়ারী ইকো-পার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সামাজিক বনায়ন বাংলাদেশের বন ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ও সাফল্য এনেছে। এটা দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন ও পরিবেশ উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ইতিমধ্যে বন বিভাগ স্থানীয় বন নির্ভর ৫ লাখ উপকারভোগী পরিবারকে সম্পৃক্ত করে দেশের অবক্ষয়িত বনভূমি ও প্রান্তিক ভূমিকে সামাজিক বনায়নের আওতায় এনেছে। এ কার্যক্রমকে আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, বন গবেষণার মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া টিস্যু কালচার পদ্ধতির মাধ্যমে বনজ ও ফলদ বৃক্ষ এবং ১২ প্রজাতির বাঁশের বংশবৃদ্ধির কৌশল উদ্ভাবন করা হয়েছে। প্ল্যান্ট ট্যাক্সোনোমিক গবেষণার মাধ্যমে ২টি নতুন প্রজাতি আবিষ্কারসহ ১২৫টি নতুন রেকর্ড এবং প্রায় ৫০ হাজার সংগৃহীত উদ্ভিদ নমুনা সঠিকভাবে সনাক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, হাজারীবাগ ট্যানারী অতিসত্বর সাভারে স্থানান্তরের ব্যাপারে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় শিল্প মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে ইটিপি কার্যক্রম অনলাইনে মনিটর করার বিষয়েও এ মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ট্যানারি চলে গেলে ওই স্থানটিকে দূষণমুক্ত করার কাজে হাত দেবে সরকার। শিল্প-কারখানা থেকে নির্গত দূষিত তরল বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত ৮১২টি কারখানায় ইটিপি স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। ২০১৮ সালের মধ্যে কলকারখানাসমূহে শতভাগ ইটিপি চালুর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বায়ু দূষণের মাত্রা হ্রাস করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে ২ হাজার ১৪১টি ইট-ভাটাকে আধুনিক প্রযুক্তির ইট-ভাটায় রূপান্তর করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সকল ইট-ভাটাকে আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা হবে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বর্তমানে গোটা বিশ্বের পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ কোনভাবেই দায়ী না হলেও এর অসহায় শিকার। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখন শুধুমাত্র একজন মন্ত্রী, একটি মন্ত্রণালয় ও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়, এটি এখন প্রধানমন্ত্রী ও পুরো কেবিনেট এবং গোটা প্রশাসনের বিষয় হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ শিল্পাঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও সুপেয় পানির উত্সগুলো আজ হুমকির মুখোমুখি। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের ভূমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। নারী ও শিশুরাও জলবায়ু পরিবর্তনের অসহায় শিকার হচ্ছে। আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ উপহার দিতে নিরলসভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে আমরা দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। তিনি আরো বলেন, ঢাকা শহরের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত রাখতে ট্যানারি শিল্পকে হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিষয়টি শিল্পমন্ত্রীর কাছে গুরুত্ব পেয়েছে এবং ইতিমধ্যে ইটিপি বানানোর কাজ শুরু হয়েছে। এমনকি কয়েকটি ট্যানারি সাভারে স্থানান্তরিত হয়েছে। মতবিনিময় সভায় পরিবেশ ও বন উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান শিকদার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব আবুল কালাম আজাদ, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব শফিকুর রহমান পাটোয়ারীসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।