চৌদ্দগ্রামে দুর্ঘটনার কবলে অ্যাম্বুলেন্স, নিহত ৪

আপডেট : ১৫ মে ২০১৪, ২৩:২৬
সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল আরো ছয়টি তাজা প্রাণ। গতকাল বৃহস্পতিবার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাস-ট্রাক্টর ও অ্যাম্বুলেন্সের ত্রিমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই ৪ জন নিহত এবং সেনা সদস্যসহ ১৬ জন আহত হয়েছে। একই দিন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বাস-কাভার্ড ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা গেছেন এক নারী চিকিত্সকসহ ২ বাসযাত্রী। কুমিল্লা প্রতিনিধি ও চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, বিকাল ৫টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম উপজেলার সুজাতপুরে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। থানা ও হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সেনবাগ থেকে ঢাকা অভিমুখি অ্যাম্বুলেন্স (ঢাকা মেট্রো-ছ-৭১-০২১০), চট্টগ্রাম অভিমুখি বিআরটিসির একটি যাত্রীবাহী বাস (চট্ট মেট্রো-ব-১১-০৭০৮) এবং একটি ট্রাক্টরের ত্রিমুখী সংঘর্ষ হলে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। এতে অ্যাম্বুলেন্সের চালক নোয়াখালীর সেনবাগের উত্তর সাহাপুর গ্রামের পারভেজ হোসেনসহ (৩৫) চার জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। নিহত অপর ৩ জন হলেন- ফেনী সদরের বারাইপুর গ্রামের বিটু মিয়ার পুত্র জাহাঙ্গীর আলম (২৫), একই জেলার দাগনভুঁইয়া উপজেলার উদরাসপুর গ্রামের আবদুর রবের স্ত্রী রহিমা আক্তার (৬০) ও একই গ্রামের খোকন মিয়ার স্ত্রী আসমা আক্তার শিল্পী (৩০)। এসময় বাসে থাকা কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত সেনা সদস্য চট্টগ্রামের বাঁশখালীর নূর মোহাম্মদসহ (৩৫) কমপক্ষে ১৬ যাত্রী আহত হন। আহত সেনা সদস্যকে কুমিল্লা সামরিক হাসপাতালে, ফেনীর দাগনভুঁইয়ার রামেন্দ্রপুরের ফারুক (৪২), নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের চরপার্বতীপুরের ইসমাইল হোসেন (৩৬), আলমগীর (১৮), আবির হোসেনসহ (৫) অপর আহতদের আশংকাজনক অবস্থায় কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণে সড়কটিতে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। এতে যানজটের সৃষ্টি হয়। চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি উত্তম কুমার চক্রবর্তী জানান, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও এলাকাবাসী ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিহতদের লাশ ও দুর্ঘটনাকবলিত বাস-ট্রাক্টর-অ্যাম্বুলেন্স উদ্ধার করে। লাশগুলো ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া হলো না সঞ্জিতার চট্টগ্রাম অফিস জানায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক পদে চাকরি হয়েছিল তার। পোস্টিং হয়েছিল চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। আগামীকাল শনিবার তার এই চাকরিতে যোগ দেয়ার কথা ছিল। তবে নতুন জীবন শুরুর আগে চট্টগ্রামে মায়ের সাথে দু’টি দিন একত্রে কাটানোর সাধ ছিল ডা. সঞ্জিতা বিশ্বাস নামে ২৮ বছর বয়সী এই তরুণ চিকিত্সকের। তাই গত বুধবার রাতে নাইট কোচে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রওনা করেন তিনি। তবে নতুন চাকরিতে যোগ দেয়া আর মায়ের আদর কোনোটাই তার ভাগ্যে জুটলো না। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় চিরতরে পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছেন সঞ্জিতা। চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া এলাকায় আরআর জুট মিলের সামনে সঞ্জিতাকে বহনকারী হানিফ পরিবহনের বাসের সাথে ঢাকাগামী একটি কাভার্ড ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান বাসযাত্রী সঞ্জিতা। একই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত মো. বারেক (৩৫) নামে অপর এক যাত্রীকে সংকটাপন্ন অবস্থায় চমেক হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিত্সকরা তাকেও মৃত ঘোষণা করেন। সঞ্জিতার মা সুপ্তি চৌধুরী নগরীর দামপাড়া ১নং গলির সুফিয়া ভবন নামের একটি ভবনে থাকেন। পেশায় তিনি বিভাগীয় হিসাব নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের সিনিয়র অডিটর। দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে অনেক সংগ্রাম করে মানুষ করেছেন। ২০১২ সালে সঞ্জিতার বিয়ে হয় ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিত্সক শান্তনু করের সঙ্গে। গতকাল সকালে সুফিয়া ভবনের বাসায় গিয়ে দেখা যায় আদরের মেয়েকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা সুপ্তি চৌধুরী। তার বুকফাঁটা আহাজারিতে আশপাশের পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে। আত্মীয়-স্বজন ও সঞ্জিতার বন্ধুরা তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছেন। তার মুখে ঘুরেফিরে একই কথা, ‘আমাকে মেরে ফেলো। আমি আমার মেয়ের কাছে যাবো।’ সঞ্জিতার মায়ের কান্না দেখে উপস্থিত অনেকে নীরবে চোখের পানি মুছছিলেন। সঞ্জিতার চাচা দীপক কান্তি বিশ্বাস বলেন, আমার ভাইপো ও ভাতিজিরা সকলেই খুব মেধাবী। তবে অন্যদের তুলনায় সঞ্জিতা পড়াশোনায় কিছুটা বেশি ভালো ছিল। ছোটবেলায় তাদের বাবা মারা যায়। তাদের মা সন্তানদের কষ্ট করে বড় করেছেন। বড় ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। মেঝো মেয়ে ডাক্তার। ছোট মেয়ে ফার্মেসি বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী। শরীরের রক্ত পানি করে মানুষ করা সন্তান যদি অকালে হারিয়ে যায় তাহলে কোনো মায়ের পক্ষেই তা মেনে নেয়া সম্ভব নয়। সঞ্জিতা ২০০৮ সালে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং পরে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১১ সালে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অনারারি মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০১৩ সালে শিশু বিশেষজ্ঞ হিসেবে যোগ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) হাসপাতালে। আগামীকাল শনিবার তার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চিকিত্সক হিসেবে মেজর পদে যোগ দেয়ার কথা ছিল।