ডব্লিউটিওর সদস্য হওয়ার শর্ত হিসেবে স্বল্পোন্নত ও কম উন্নয়নশীল দেশগুলো দেশীয় বাজার বিদেশি পণ্যের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করেছে। সেই বাজার দখল করেছে উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো। বিনিময়ে দরিদ্র দেশগুলো কিছু আশ্বাস আর এইড ফর ট্রেডের নামে সামান্য দান-খয়রাতের অংশ ছাড়া কিছুই পায়নি। বহু আরাধ্য রপ্তানির জন্য কার্যকর বিশেষ বাজার সুবিধা পায়নি। শর্তের বেড়াজালে সবই আটকা পড়েছে
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ষড়যন্ত্র চলছে। তবে এবারের চক্রান্তে খলনায়কের সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের অপরিসীম শক্তি-সামর্থ্য; আক্রমণের পক্ষে যুক্তিও অনেক শাণিত। গত ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ট্রাজেডির বছর পূর্তিতে পশ্চিমা বিশ্বে পরিবেশবাদীরা ফ্যাশন বিপ্লব দিবস পালন করেছে। সেদিন তারা প্রায় ৪০টি দেশে আলোচনা, সমাবেশ, র্যালি প্রভৃতি করে। যদিও কাজের নিরাপদ পরিবেশ ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার জন্য বহুজাতিক বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোকে আহ্বান জানানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বলে মিডিয়ায় প্রচারিত সংবাদ থেকে জানা গেছে। কোনো কোনো সংগঠন উল্টো করে পোশাক গায়ে জড়িয়ে প্রতিবাদ করেছে। কেউ কেউ মেড-ইন বাংলাদেশ ব্র্যান্ডকে কুরুচিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণার এসব কৌশল বিভিন্ন শ্রমিক অধিকার গ্রুপ, ক্রেতা সংগঠন এমনকি খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানও প্রয়োগ করছে।
বিগত প্রায় একবছর ধরেই এ ধরনের আক্রোশমূলক প্রচারণা চলছে। সরকার ও পোশাক প্রস্তুতকারকদের ওপর পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হুমকি-ধামকিও অব্যাহত আছে। কেউ কেউ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। কোনো কোনো দেশ শাস্তির হুমকি দিচ্ছে। বছরজুড়ে এত তোলপাড় শুধুই রানা প্লাজা ট্রাজেডিতে নিহত সহস্রাধিক শ্রমিকের স্মরণে করা হচ্ছে না। অতীত উদাহরণ তা বলে না। ২০১২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর করাচীতে একটি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ২৮৯ জন শ্রমিক ভস্মীভূত হয়। শ্রমিকের নিরাপত্তা নেই এ অভিযোগ দেখিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বা যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উপরন্তু, ইইউ পাকিস্তানকে জিএসপি সুবিধা দিয়েছে। যা গত জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। তাই বলা যায়, বাংলাদেশের ব্যাপারে এত প্রতিক্রিয়া দেখানোর পিছনে গভীর ষড়যন্ত্র আছে। ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রতিষ্ঠার পর বলা হয়েছিলো, বিশ্বে অবাধ বাণিজ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো। বাস্তবে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা একটি ছাতার নিচে তো আসেইনি বরং বিশ্ব বাণিজ্য আরও নিয়ন্ত্রিত হয়েছে।
ডব্লিউটিওর সদস্য হওয়ার শর্ত হিসেবে স্বল্পোন্নত ও কম উন্নয়নশীল দেশগুলো দেশীয় বাজার বিদেশি পণ্যের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করেছে। সেই বাজার দখল করেছে উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো। বিনিময়ে দরিদ্র দেশগুলো কিছু আশ্বাস আর এইড ফর ট্রেডের নামে সামান্য দান-খয়রাতের অংশ ছাড়া কিছুই পায়নি। বহু আরাধ্য রপ্তানির জন্য কার্যকর বিশেষ বাজার সুবিধা পায়নি। শর্তের বেড়াজালে সবই আটকা পড়েছে। ডব্লিউটিওর দোহা রাউন্ড শুরু হয়েছে ২০০১ সালে। দু’বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেই আলোচনা ১৩ বছরেও শেষ হয়নি। কবে শেষ হবে তাও কেউ জানে না। ২০০৫ সালে ডব্লিউটিওর হংকং সম্মেলনে আলোচনায় কিছুটা লোক দেখানো অগ্রগতি হয়েছিল, এই যা। এ রাউন্ড শেষ হলে স্বল্পোন্নত দেশগুলো কিছু বাণিজ্য সুবিধা পাবে এবং উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দরিদ্র দেশগুলোকে কিছু ছাড় দিতে হবে। তাই এ আলোচনা চূড়ান্ত করতে কারও আগ্রহ নেই। কারণ, চুক্তি হলে তা বাস্তবায়নের নৈতিক চাপ আসবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানো ও ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য শিল্পোন্নত দেশগুলো বাংলাদেশসহ মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন দেশগুলোকে প্রতিবছর ২০ বিলিয়ন ডলার করে সাহায্য ২০২০ সাল পর্যন্ত দেয়ার কথা। উন্নত দেশগুলো এতে সম্মত হয়েছে ২০০৯ সালে। তারপর চারটি বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন হয়েছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তটি চুক্তিতে রূপ দেয়া হয়নি। কারণ, চুক্তি হলে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিশ্রুত সাহায্য দিতে হবে। এর বিপরীতে প্রতিবছরই কতগুলো আশ্বাস ও নীতিবাক্য শোনানো হয়। আর প্রতিশ্রুত বৈদেশিক সহায়তার অংশ থেকে কিছু অর্থ কেটে জলবায়ু ফান্ডে দেয়া হয়। বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় তারা দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তা করছে। অথচ দেড়শ’ বছর ধরে উন্নত বিশ্ব প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রতিযোগিতায় নেমে অবিচারে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করেছে। প্রতিবছর ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন টন কার্বন বায়ুমণ্ডলে নিঃসরণ করেছে। এর কুফল হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন।
বাংলাদেশকে এখন এ ষড়যন্ত্রের গভীরে যেতে হবে। কূটনৈতিকভাবেই অগ্রসর হওয়া উচিত এবং সব দেশ তাই করে। নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থা এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর গতিবিধি ও কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের এ প্রবৃদ্ধিকে তারা সবসময় সন্দেহের চোখে দেখেছে। তাই তারা ছিদ্র খোঁজার চেষ্টা করেছে। শুরুতেই তারা শিশুশ্রম নিয়ে কথা বলে। অথচ তখন শুধু বাংলাদেশ, ভারত বা থাইল্যান্ড নয় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শিল্প-কারখানায় শিশুশ্রম ছিল। তাদের শ্রমমান আইনে ১২ বছরের শিশুরা শিল্পে কাজ করতে পারে। তখন ইউনিসেফের সহযোগিতায় বিজিএমইএ শিশুশ্রম বন্ধে উদ্যোগ নেয়। তাতে তারা কিছুটা পিছু হটে। তারপর শুরু হয় ইপিজেডগুলোতে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার আদায়ের প্রচেষ্টা। অথচ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চাহিদা অনুযায়ীই ইপিজেড আইনে ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ রাখা হয়নি।
আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের কল্যাণে একটি কমিটি থাকবে যারা মালিকপক্ষের সাথে নিয়মিত আলাপ-আলোচনা করে শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করবে। তখনই স্পষ্ট হয় যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর আমেরিকার সর্ববৃহত্ শ্রমিক ফেডারেশন এএফএল-সিআইওর নজর পড়েছে। এদিকে ইইউ বারবারই জিএসপি পাওয়ার জন্য রুলস অব অরিজিনে পরিবর্তন আনে। দেশের উদ্যোক্তারা নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে কম্পোজিট টেক্সটাইল কারখানা স্থাপন শুরু করে। তাতে কাপড়ের জন্য আমদানির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে না। বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা, আইএফসি বললো, বাংলাদেশে টেক্সটাইল শিল্প লাভজনক হবে না। তাদের জন্য কাপড় আমদানি করাই যুক্তিযুক্ত হবে। শুধু সেলাইর কাজটা এখানে হবে। বৈদেশিক ঋণ বন্ধ হলো। কিন্তু উদ্যোক্তারা থেমে থাকলো না। আজ দেশে প্রায় ১৫০০ টেক্সটাইল শিল্পে সুতা ও কাপড় উত্পাদিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশ নিট সুতা ও পোশাক উত্পাদনে মনোযোগী হলো এবং বেশ সফলও হলো। এখন দেশের তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয়ের অর্ধেকের বেশি আসে নিট পোশাক থেকে। নব্বইয়ের দশকের প্রথম ভাগে যা প্রায় শূন্যই ছিল। আন্তর্জাতিক টেক্সটাইল এন্ড ক্লোদিং চুক্তি অনুযায়ী ২০০৪ সালের পর জিএসপি থাকবে না। বিরোধী গ্রুপ ধরেই নিয়েছিল যে বিশেষ বাজার সুবিধা না পেলে বাংলাদেশ টিকতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আরও বেড়েছে। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা করেই তারা প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০০৮ থেকে বিশ্বমন্দার মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশই সর্বাধিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ফলে বাংলাদেশ চীনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন কয়েকটি চ্যালেঞ্জ আছে। এক. এএফএল-সিআইওর সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য প্রতিটি পোশাক কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ দিতে হবে। নেতাদের ওপর হয়রানি বন্ধ করতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে মালিকপক্ষের মধ্যে একটা ভীতি কাজ করে। ট্রেড ইউনিয়নের অতীত ইতিহাস ভাল নয়। সরকারকে এখানে প্রকৃত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিবেদিতপ্রাণ হতে হবে। কারখানার নিরাপত্তার ব্যাপারে সরকার, মালিক, ক্রেতাগোষ্ঠী, আন্তর্জাতিক সংস্থা সব পক্ষই সক্রিয়ভাবে মাঠে আছে। এটি অব্যাহত থাকলে মালিকের গাফিলতির কারণে দুর্ঘটনা বন্ধ হবে। মজুরির বিষয়টি সঠিকভাবেই এগোচ্ছে। সরকার মজুরি কমিশনের মাধ্যমে নিয়মিত মজুরি পুনঃনির্ধারণ ও তা বাস্তবায়ন মনিটরিং করলে শ্রমিকদের মধ্যে কোনো ক্ষোভ থাকবে না। স্বল্পোন্নত দেশ হয়েও বিশ্ব তৈরি পোশাক বাজারে দ্বিতীয় স্থানে চলে আসাটা ঈর্ষার কারণ যাতে না হয় সেজন্য মোড়লদের কথাবার্তা একটু আমলে নিতে হবে। প্রতিযোগীদের সাথে বন্ধুত্বের ভাব বজায় রাখতে হবে। প্রতিযোগিতা-সুবিধা ঠিক রেখে পণ্যের দাম বাড়ানোর লক্ষ্যে ক্রেতাদের সাথে গঠনমূলক আলোচনা করতে হবে। মালিকদের লাভের পরিমাণটাও কমাতে হবে। তবেই ষড়যন্ত্র ভোঁতা হবে। দেশের পোশাক খাত ও অর্থনীতির অগ্রযাত্রা নির্বিঘ্ন হবে।
