মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার দৌলতপুরে মেঘনা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় গতকাল শুক্রবার রাত ১০টা পর্যন্ত আরো ১৯টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। তবে স্রোত ও ক্রেনের রশি ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে লঞ্চটি উদ্ধার করা যায়নি। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার ১২টিসহ এ নিয়ে মোট ৩১ জনের মৃতদেহ উদ্ধার হলো। এছাড়া জীবিত উদ্ধার হয়েছেন অর্ধশতাধিক। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন দেড় শতাধিক যাত্রী।
নিহতদের মধ্যে ২৮ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দু’জনের লাশ হাসপাতালের মর্গে ও অপর একজনের লাশ উদ্ধার করে মেঘনা পাড়ে রাখা হয়েছে। লাশের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঢাকা থেকে শরিয়তপুর যাওয়ার পথে বৃহস্পতিবার বিকালে প্রায় আড়াইশ’ যাত্রী নিয়ে এমভি মিরাজ-৪ নামের ওই লঞ্চটি ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায়।
লাশ চেয়ে বিক্ষোভ
এদিকে লঞ্চটি উদ্ধারে বিলম্ব হওয়ায় নিখোঁজদের স্বজনরাসহ স্থানীয় জনতা বিক্ষোভ করেছে। গতকাল সকাল সোয়া ৯টার দিকে উত্তেজিত জনতা ‘লাশ চাই , লাশ চাই’ বলে স্লোগান দিয়ে মিছিল করে। এ সময় তারা ক্ষেপে গিয়ে নদীর তীরে দায়িত্ব পালনরত চ্যানেল একাত্তরের ফটোগ্রাফার ও রিপোর্টারকে মারধর করে। পরে পুলিশের আশ্বাসে তারা শান্ত হন।
লঞ্চডুবির ঘটনায় নিহতরা হলেন- লঞ্চ মালিক আনোয়ার ঢালী (৪৫), জামাল শিকদার (৫০) ও তার ছেলে আবির (১১), সেতারা বেগম (৫৫), টুম্পা বেগম (২৬), শিশু মাহি, শিশু সুমনা, জলিল মালত (৫০), মানিক (১৪), আব্দুল্লাহ আল-রেদওয়ান (৪০), রাফিয়া বেগম (৬০), খোরশেদ আলম খোন্দকার (৭৫), ওসমান গণি মোল্লা (৭০), ইসমাইল ফকির (৬০), কৃষ্ণ কমল দাস (৫০), আব্দুল জলিল (৫৫), তাসলিমা আক্তার রিয়া (২৫), রাশিদা বেগম (৫৬), লাইলী বেগম (৫৫), ঋতু (২৪), আব্দুল মান্নান দেওয়ান (৬৫), লক্ষ্মী রানী দাস (৮৫), রজিয়া (৩২), শিশু রুমান, আব্দুল জলিল খান (৭০), মিন্টু সুকানী (৪০), মাসুম (৩৮) ও রিমা আক্তার (৩২)। এদের অধিকাংশই শরীয়তপুরের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। শুধু মিন্টু সুকানীর বাড়ী মতলবের দামদর্দি এলাকায়।
নিহতদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল জানান, নিহতদের প্রতিটি পরিবারকে তাত্ক্ষণিক ২০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। উদ্ধার কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, কোনো একটি লাশ উদ্ধার হলেই ভিড় করছেন স্বজনরা। তবে নিখোঁজ হওয়াদের জীবিত উদ্ধারের আশা এখন নাই বললেই চলে। চলছে শুধু লাশের অপেক্ষা।
উদ্ধার কাজ বিলম্বের কারণ
বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান শাসছুদ্দোহা জানান, মেঘনার তলদেশে স্রোত, দমকা হাওয়ার কারণে উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। যদিও আগে মনে করা হয়েছিলো সন্ধ্যা নাগাদ উদ্ধার কাজ শেষ করা যাবে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটি শেষ হতে মধ্যরাত পর্যন্ত লাগতে পারে। তিনি আরো জানান, উদ্ধারকারী দলের ডুবুরিরা প্রথমে লঞ্চটি থেকে মালামাল সরিয়ে কিছুটা হালকা করেছে। যদি ভেতরে কোনো লাশ থাকে সেগুলোকে অক্ষত অবস্থায় স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে খুব ধীর ধীরে টেনে আনা হচ্ছে লঞ্চটিকে। গতকাল লঞ্চটি টেনে তোলার চেষ্টার একপর্যায়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ক্রেনের একপাশের রশি ছিড়ে লঞ্চটি আবার নদীতে তলিয়ে যায়। লঞ্চটির উদ্ধার কাজ দেরি হওয়ার এটিও অন্যতম কারণ। এছাড়া লঞ্চটি উল্টো অবস্থায় থাকার কারণে উদ্ধার কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। তবে উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়কে সহযোগিতা করছে দুর্বার ও দুরন্ত।
এদিকে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে মেঘনা তীরে শতশত মানুষ ভিড় করেছেন। নিখোঁজ ও নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে মেঘনার বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ ট্রলার নিয়ে মেঘনা নদী ও এর আশে-পাশে খুেঁজ ফিরছেন স্বজনদের। অপেক্ষা কখন মিলবে প্রিয় মানুষের লাশটি।
হাসপাতালে ১৫ জন
জীবিত উদ্ধার হওয়া ১৫ জন যাত্রী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন সোনিয়া আক্তার, নূরুল ইসলাম, নূর মোহাম্মদ, মুরাদ মিয়া, রোকন মিয়া, খোকন মিয়া, শরীফ, রিতু বেপারী, রুবেল, মনোয়ার, রহিমা খাতুন, ফিরোজা, আব্দুল কাদের, বছির ও নজরুল। ঢাকা ও গজারিয়ার ভবেরচর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালে তারা ভর্তি থাকায় অনেক স্বজনই তাদের খুঁজে পাননি।
তদন্ত কার্যক্রম শুরু
এদিকে লঞ্চডুবির ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম খান জানান, নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার এএসএম সিরাজুল ইসলামকে প্রধান করে ৩ সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যেই কমিটি কাজ শুরু করেছে বলে তিনি জানান। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এমভি মিরাজ-৪ লঞ্চটি এর আগেও ২ বার দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল।
লঞ্চেই উত্থান, লঞ্চেই মরণ
লঞ্চ ব্যবসায়ী আনোয়ার ঢালী দীর্ঘদিন ইটালিতে ছিলেন। তার ৬টি লঞ্চ রয়েছে। নিয়তির খেলায় এমভি মিরাজ-৪ লঞ্চের যাত্রী হয়ে উঠে সেই লঞ্চেই মারা গেলেন তিনি। লঞ্চটির চার নম্বর কেবিনের যাত্রী ছিলেন আনোয়ার। ব্যবসায়িক কাজে ঢাকায় গিয়েছিলেন। বাড়ি ফেরার আগে কথা হয়েছে শ্বশুর ইদ্রিস ব্যাপারীর সঙ্গে। কিন্তু একবারও হয়তো ভাবেননি, যে লঞ্চ ব্যবসার মাধ্যমে তার জীবনের উত্থান, সেই লঞ্চেই জীবনের চূড়ান্ত পতন নেমে আসবে।
শরীয়তপুরে ঘরে ঘরে কান্নার রোল
শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, এমভি মিরাজ-৪ লঞ্চের প্রায় অধিকাংশ যাত্রীই শরীয়তপুরের নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার অধিবাসী। শুক্রবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত উদ্ধারকৃত ১৫টি মৃতদেহ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ জন পুরুষ, ৪ জন মহিলা, ২ ছেলে শিশু ও ১ মেয়ে শিশু। স্বজনরা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মৃতদেহগুলো গ্রহণ করেছে। নিখোঁজ ও মৃতদের ঘরে ঘরে এখন চলছে শোকের মাতম। নিহতদের অনেকের বাড়িতে তাদের দাফনের জন্য কবর খোঁড়া হচ্ছে। নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনরা শুরেশ্বর, কাচিকাটা ও তারাবুনিয়ার পদ্মা মোহনায় নৌকা ও ট্রলার নিয়ে এখনো খুঁজে ফিরছে স্বজনদের জীবিত অথবা মৃত ফিরে পাবার আশায়। তাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে এলাকার আকাশ-বাতাস।
জেলা প্রশাসক রাম চন্দ্র দাস জানান, মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার পর শনাক্ত হওয়ার সাথে সাথেই দ্রুত শরীয়তপুরে তাদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন তারা । মৃতদেহ দ্রুত স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ট্রলার ও এম্বুলেন্সও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
