নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন এখন ভারতে। হত্যাকাণ্ডের পর প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে নাম পাল্টিয়ে ‘গোপাল’ নামে তিনি ভারতের কলকাতায় পালিয়ে গেছেন। জানা গেছে, সেখানে রাধা নামে তার এক স্ত্রীও রয়েছেন। নিজ ধর্ম পরিচয় গোপন রেখে এই হিন্দু নারীকে নূর হোসেন বিয়ে করেন। পাসপোর্টে তার নাম গোপাল। ফলে তাকে কেউ সন্দেহ করেনি। কলকাতার সদর স্ট্রীটে এখন অবস্থান করছেন আন্ডার ওয়ার্ল্ডের এই ডন। সদর স্ট্রীটে নির্মাণ করেছেন এক আলিশান ভবন। স্ত্রী রাধার নামে রেখেছেন শত কোটি টাকা। বাংলাদেশে ফিরে না আসলেও তার কিছু যায় আসে না। ইতিমধ্যে তার ৪র্থ স্ত্রী রুমা এবং তার এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে গেছেন ভারতে। নূর হোসেনের ঘনিষ্ঠ এক সহযোগী ইত্তেফাককে এসব তথ্য জানিয়েছেন। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরই ভারতে পালিয়ে যান নূর হোসেন। সেখানে গিয়ে তিনি গোপাল নাম ধারণ করেন। এই নামে সংগ্রহ করেন পাসপোর্ট। ফলে সেখানে অবস্থান করতে তাকে কোন ঝামেলার মুখে পড়তে হয়নি। নূর হোসেন ছিলেন নারায়ণগঞ্জের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি, যার অদৃশ্য ইশারায় নারায়ণগঞ্জের প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পরিচালিত হতো বলে বিভিন্ন সূত্রে বেরিয়ে আসছে। আর এ কারণেই টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছেন নূর হোসেন। প্রকাশ্যে করেছেন মাদকের ব্যবসা। দখল, উচ্ছেদ ও টেন্ডারবাজি করেছেন ইচ্ছেমতো। বছর জুড়ে চালিয়েছেন অশ্লীল নৃত্য-যাত্রা। জুয়ার আসর বসিয়ে অবৈধ ব্যবসা করেছেন। কাউন্টার বসিয়ে তুলেছেন চাঁদা। শিমরাইল ট্রাক টার্মিনালকে অপরাধের ঘাঁটি বানিয়েছিলেন। সব ধরনের মাদকের ট্রানজিট ছিল এই ট্রাকস্ট্যান্ড যার অধিকাংশই পরিচালিত হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাহারায়। মদ, জুয়া, যাত্রাসহ তার বিভিন্ন অপকর্মে এলাকাবাসী ছিল অতিষ্ঠ। কিন্তু প্রতিবাদ করার সাহস ছিল না কারো। কারণ, নূর হোসেনের বিরুদ্ধে গেলেই তাকে হয় প্রাণ দিতে হয়েছে, নইলে বরণ করতে হয়েছে পঙ্গুত্ব। এলাকা ছাড়া হয়েছেন অনেকেই। কিন্তু কোন প্রতিকার মেলেনি প্রশাসনের কাছ থেকে।
নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জের ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর জান্নাতুল ফেরদৌস নীলা। নূর হোসেনের হাতের পতুল ছিলেন তিনি। শুধু নীলা নয়, আরো এক ডজন সুন্দরী নারীকে অস্ত্রের মুখে রক্ষিতা বানিয়েছিলেন এই নূর হোসেন। কিন্তু কেউ কোন প্রতিবাদ করার সাহস পাননি। রক্ষিতাদের অবৈধ মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা থেকে শুরু করে সকল অপকর্মে ব্যবহার করেছেন তিনি। এই এক ডজন রক্ষিতার পাশাপাশি নূরের ছিল চার স্ত্রী। সুন্দরী নারী হিসেবে যাকে চোখে পড়েছে, ভাল লেগেছে, তাকেই বিয়ে করেছেন তিনি। এর বাইরেও নূরের ছিল অসংখ্য নারীর সাহচর্য। নূরের ঘনিষ্ঠজনরা দাবি করেন, নূর হোসেনের ৫ স্ত্রীর মধ্যে প্রথম স্ত্রী লিলির বাড়ি ঢাকার মিলব্যারাক এলাকায়। নূর হোসেনকে তালাক দিয়ে আলাদা সংসার করছেন তিনি। দ্বিতীয় স্ত্রী লিপির বাড়ি নারায়ণগঞ্জের খানপুরে। তার সংসারে বিপ্লব নামের এক ছেলে ছিল। কলেজ পড়ুয়া এ ছেলে তার এক খালাতো বোনকে বিয়ে করে। পরে বাপের বসানো মদের দোকান থেকে অত্যধিক মাদক সেবন করে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। মাদক নিরাময় কেন্দ্রে নিয়েও তাকে ফেরানো সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায়ই কিছুদিন আগে নির্মমভাবে তার মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুকে এলাকাবাসী ‘পিতার পাপে পুত্রের মৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তৃতীয় স্ত্রী পারুলের বাড়ি ডেমরার সারুলিয়ায়। সেও এখন নূরের সংসারে নেই। চতুর্থ স্ত্রী কাঁচপুরের রুমা। তার সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে। রুমার সঙ্গেই সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলের বাসায় বসবাস করতেন নূর। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের পর শিমরাইলের বাসা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান স্ত্রী-সন্তানরা। পরে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে রুমা কলকাতায় চলে গেছেন বলে ঘনিষ্ঠজনরা জানান। তাদের বসবাসের জন্য নূর হোসেন আলাদা বাড়ির ব্যবস্থা করেছেন বলে জানা গেছে। অবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তারা দেশে ফিরবেন না। পঞ্চম স্ত্রী রাধার বাড়ি ভারতের কলকাতার সদর স্ট্রীটে। ২০০১ থেকে প্রায় ৬ বছর ভারতে পালিয়ে থাকার সময় ‘গোপাল’ নাম ধারণ করে রাধাকে বিয়ে করের নূর হোসেন।
এলাকাবাসী জানায়, হিন্দি ফিল্মে আন্ডার ওয়ার্ল্ড ডনদের নানা চরিত্র বিভিন্নভাবে চিত্রায়িত হয়েছে কিন্তু এই নূর হোসেনের চরিত্র সেইসব ডনদের চরিত্রকেও হার মানিয়েছে তার অপকর্ম দ্বারা।
