চা-ওয়ালা থেকে প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৬ মে ২০১৪, ২৩:৪৪
নরেন্দ্র মোদী। পুরো নাম নরেন্দ্র দামোদারদাস মোদী। এই মোদীই এখন ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। তার প্রধানমন্ত্রীত্বের খবরে হয়তো মনে হতে পারে তার জীবনটা যেন আরাম-আয়েশের। কিন্তু এর জন্য তাকে নানা চড়াই উত্রাই পার হতে হয়েছে। একটি নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া মোদীর জীবন ছিল খুবই সাদামাটা। সামান্য চাওয়ালা থেকে তিনি বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। ভাগ্য তার সুপ্রসন্ন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীদের মধ্যে হয়তো তাকে ঘিরেই সবচেয়ে বিতর্ক ছিল বেশি। কিন্তু সব বিতর্ক যেন উবে গেল তার বড় ধরনের বিজয়ে। বিতর্ককে পাত্তা দিল না ভারতের জনগণ। বিতর্ক যতই থাকুক না কেন জয়রথ কিন্তু তার পেছনে লেগেই ছিল। কিশোর বয়সে তিনি যোগ দেন কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘে (আরএসএস)। বহু বছর ধরে তিনি তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। সেখান থেকেই ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর ধাপে ধাপে উত্থান। নিজ রাজ্য গুজরাটে একজন ক্ষমতাবান রাজনীতিক হয়ে উঠেন। দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। নরেন্দ্র মোদীকে একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী, পরিশ্রমী এবং খুবই কঠোর প্রকৃতির রাজনীতিক হিসেবে বর্ণনা করেন তার ঘনিষ্ঠজনরা। ১৯৯৫ এবং ১৯৯৮ সালে গুজরাট রাজ্যের নির্বাচনী প্রচারণায় মূল দায়িত্বে ছিলেন মোদী। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও তিনি বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেন। যদিও জয় প্রবেশ করেছিল কংগ্রেসের ঘরে। ২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী কেশুবাই প্যাটেলের পদত্যাগের পর-সৌভাগ্য এসে কড়া নাড়ে মোদীর দরজায়। ২০০১ সালের অক্টোবরে তিনি রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী হন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মোদীকে। তবে মাঝে ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার দায় তার ওপরই পড়ে। আর সেই যন্ত্রণা তাকে এখনো কুরে কুরে খায়। এই ঘটনাকে ঘিরে সমালোচনা কেবল ভারতে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও লক্ষ্য করা যায়। এমনকি দাঙ্গার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোদীর ভিসা বাতিল করে। তাকে একজন সামপ্রদায়িক ব্যক্তি হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। সামপ্রদায়িকতা এবং অসামপ্রদায়িকতার মাঝখানে পড়ে মোদী সমালোচনার সম্মুখীন হলেও অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে তার প্রশংসাই তাকে আজ প্রধানমন্ত্রীত্বের দিকে নিয়ে এসেছে। তার গুজরাট মডেল অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে যে সুনাম কুড়িয়েছে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। মোদীর জন্ম ১৯৫০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। বর্তমান গুজরাটের মেহসানা জেলার ভাদনগরে ঘাঞ্চি-টেলি সমপ্রদায়ে। বাবা দামোদারদাস মুলোচন্দ মোদী এবং মা হিরাবান। বাবা পেশায় ছিলেন একজন মুদি দোকানি। বাবা-মায়ের তৃতীয় সন্তান হলেও মোদীই আজ সবার উপরে। ছেলেবেলায় রেলস্টেশনের কাছে অবস্থিত বাবার চায়ের দোকানে কাজ করতেন মোদী। তার কাজ ছিল বাবাকে সাহায্য করা। কৈশোরে ছিলেন ভাইয়ের চা দোকানে। ঘাঞ্চি বর্ণের নিয়মানুযায়ী শৈশবেই ছেলে মোদীর বিয়ে দেন বাবা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে জসোদাবেন চিমানালের সঙ্গে চিরজীবনের গাঁট বাঁধেন মোদী। কিন্তু বিয়ের পর জসোদাবেনের ছোঁয়া পেয়েছেন খুবই কমদিন। তাইতো মানুষকে বলা হয়নি সেই শৈশবের বিয়ের কথা। চেপে গেছেন বিয়ের কথা। নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন চিরকুমার হিসেবে। কিন্তু সেই সত্য বেরিয়ে আসে এবার লোকসভা নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমাদানের সময়। ভারতের জনগণসহ সারা বিশ্বের কৌতূহলী মানুষ জানতে পারে চিরকুমার মোদী বিবাহিত ১৩ বছর বয়স থেকে। ১৩ বছর বয়সের সেই জসোদাবেনই হতে যাচ্ছেন ভারতের ফার্স্ট লেডি! গুজরাটের দাঙ্গার ঘটনায় আলোচিত মোদী ২০১৩ সালে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংসদীয় বোর্ডের সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর তিনি নির্বাচনী প্রচারণা কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। গত বছরের সেপ্টেম্বর বিজেপি লোকসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে মোদীর নাম ঘোষণা করে। এর পরের ঘটনা কেবলই ইতিহাস যার মূল নায়ক এক সময়ের চাওয়ালা নরেন্দ্র দামোদারদাস মোদী।