বৃহস্পতিবার দুপুর ১ টায় ২ শতাধিক যাত্রী নিয়ে ঢাকা থেকে শরীয়তপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা ‘এমভি মিরাজ-৪’ লঞ্চটি ঝড়ের কবলে পড়ে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে ডুবে যায়। নিহতদের মরদেহ নিতে এবং নিখোঁজ যাত্রীদের খোঁজে বৃহস্পতিবার বিকাল থেকেই শরীয়তপুরের পদ্মার পাড়ে হাজার হাজার মানুষের ভিড় জমে।
ভোর হতেই কয়েকটি ট্রলারযোগে নিখোঁজ যাত্রীদের সন্ধান নিতে এবং শেষ সান্ত্বনা হিসেবে উদ্ধার হওয়া মরদেহ আনতে ঘটনাস্থলে ছুটে যান স্বজনরা। প্রশাসনের সহায়তায় শনাক্ত হয়ে মরদেহ আসতে শুরু করেছে শরীয়তপুরে। নিখোঁজ যাত্রীদের এবং নিহতদের বাড়িতে বাড়িতে চলছে কান্না, আহাজারি। শরীয়তপুরের সুরেশ্বর লঞ্চঘাটে এখনও হাজার হাজার মানুষের ভিড়। অপেক্ষা— কখন আসবে প্রিয় মানুষের মরদেহ। পরিবারের একাধিক সদস্য একসাথে হারিয়ে মন না মানায় ছুটে যাচ্ছেন অনেকেই ঘটনাস্থলে।
এ দুর্ঘটনায় শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার গ্রামে গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শোকের কান্নায় ভাসছে গ্রামগুলো। নড়িয়ার ভোজেশ্বর ইউনিয়নের পাচক গ্রামের নূরু শেখের একমাত্র পুত্র মোঃ মূসা (১৭) ঢাকা থেকে শরীয়তপুরে আসছিল প্রিয় মা বাবাকে নয়নভরে দেখবে বলে। মোবাইলে কথা বলেছিলঃ বাবা আমি আসছি, মাকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে। সেই কথাটি ওর জীবনের শেষ কথা। মূসা নিখোঁজ রয়েছে। হয়তো লাশ হয়ে আসবে মা বাবার কাছে। কথা বলবে না আর কোনদিন মা-বাবার সাথে তাদের প্রিয় মূসা। মূসার পছন্দের খাবার তৈরি করে পথ চেয়ে বসেছিল মা তার আদরের সন্তানকে নিয়ে খাবে বলে, খাওয়া আর হলো না। এখন বাড়িতে চলছে শুধু কান্না আর আহাজারি। চাকধ এলাকার লিটন বেঁচে গেলেও স্ত্রী তুম্পা (২৭) আদরের কন্যা সুমা (৮) হারিয়ে গেল চিরতরে। লাল শাড়ি ও চুড়ি কিনে রেখেছে ছোট চাচ্চু। সুমার বায়না ছিল এবার লাল শাড়ি আর চুড়ি কিনে দিতে হবে। ছোট্ট চাচ্চু ঠিকই কিনে রেখেছিল, কিন্তু ছুঁয়েও দেখতে পারলো না ছোট্ট সুমা। স্ত্রী সন্তানকে হারিয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছে লিটন। সুমার লাশ পাওয়া গেলেও স্ত্রী তুম্পার লাশ পায়নি লিটন। স্থানীয়ভাবে ধারণা করা হচ্ছে এখনও অর্ধশতাধিক যাত্রী নিখোঁজ রয়েছে। শেষ সান্ত্বনা হিসেবে স্বজনরা তাদের প্রিয়জনদের কবর দেখতে চায়। উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনরা।
ঘরিসার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রব খান জানান, সন্তানহারা মায়ের কান্না আমরা আর দেখতে চাই না। লঞ্চগুলো নিরাপদ নয়, ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চগুলোই আমাদের শরীয়তপুর-ঢাকা লাইনে চলাচল করে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে। ফলে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। আমরা আমাদের জীবন রক্ষায় সরকারের কাছে দাবি জানাই যাতে ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চগুলো বন্ধ করে ভাল লঞ্চ এই লাইনে দেয়া হয়। কবির নামের বেঁচে ফেরা এক যাত্রী বলেন, আমাদের প্রাণ নিয়ে খেলা করছে সরকার। লঞ্চগুলোতে বয়া বা লাইফ জ্যাকেট নেই, যাত্রীদের সাথে মালবোঝাই করে চালাচ্ছে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ। একতলা-দোতলা লঞ্চকে তিনতলা বানানো হয়েছে, ফলে সামান্য ঝড় বৃষ্টিতেই উল্টে যায়। সেই দিকে সরকারের কোন নজর নেই। আমরা এর প্রতিকার চাই।
শরীয়তপুরে পদ্মারপাড়ে আইন-শৃংখলা রক্ষাসহ উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করার জন্য প্রশাসনিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। শরীয়তপুর জেলা প্রশাসন মরদেহ প্রতি দাফনের জন্য ৫ হাজার টাকা ও মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন শরীয়তপুর জেলা প্রশাসক। নিখোঁজ যাত্রীদের সঠিক হিসেব জানা যায়নি। সংবাদ লেখা পর্যন্ত শরীয়তপুরে ২৮টি মরদেহ স্বজনদের কাছে পৌঁছায়।
