কি পাসের হার, কি জিপিএ ৫ প্রাপ্তি—সব দিক বিবেচনাতেই অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল। গ্রেডিং পদ্ধতিতে ফল প্রকাশের চর্তুদশ বছরে অর্থাত্ ২০১৪ সালে পাসের হার বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে জিপিএ ৫ প্রাপ্তির সংখ্যা। দেশে ১০টি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশ যা গতবারের চেয়ে ২ দশমিক ৩১ ভাগ বেশি। গতবার পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। এবার ১০টি বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ২৭৬ জন। গতবারের চেয়ে এ সংখ্যা বেড়েছে ৫১ হাজার ৫০টি। গতবার জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৯১ হাজার ২২৬ জন। এসএসসি পরীক্ষায় সকল বোর্ডের মধ্যে সেরা হয়েছে রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গতকাল শনিবার দুপুর ১টায় সচিবালয়ে তার সম্মেলন কক্ষে এ ফল ঘোষণা করেন। এর আগে সকাল ১০টায় তিনি গণভবনে পরীক্ষার ফলাফলের কপি তুলে দেন প্রধানমন্ত্রীর হাতে।
গত ছয় বছরের পাসের হার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে প্রতিবছর পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় পাসের হার বেড়েছে। ২০০৯ সালের পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। পরের বছর তা বেড়ে হয় ৭৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এরপর ২০১১ সালে ৮২ দশমিক ৩১ শতাংশ, ২০১২ সালে ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং ২০১৩ সালে ৮৯ দশমিক ০৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে। আর এবার তা বেড়ে হয় ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
গণিত, ইংরেজি, পদার্থ ও রসায়নে পাসের হার বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক পাসের হার বেড়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
এবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৩১৩ জন।
প্রতিবারের মতো এবারো শহরের স্কুলগুলোর ভাল ও ঈর্ষণীয় ফলাফল অব্যাহত রয়েছে। গতকাল ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ভাল ফল করা স্কুলগুলোতে বাঁধ ভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠে শিক্ষার্থীরা। স্কুলে স্কুলে বাদ্য বাজিয়ে, হৈ-হুল্লোড় করে, হাতে হাত রেখে নেচে-গেয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা।
গতকাল সকাল থেকেই শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা কাঙ্ক্ষিত ফলের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অপেক্ষা করতে থাকে। বেলা দুইটায় স্কুলের দেয়ালে দেয়ালে টাঙিয়ে দেয়া হয় ফলাফল। এরপরই অভিভাবক-শিক্ষার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে ফল জানার জন্য। কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পেরে অনেকের চোখেই আনন্দ অশ্রু দেখা যায়। আবার প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে না পেরে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে। বেলা আড়াইটা থেকে ওয়েবসাইটে ফল প্রকাশ করা হয়। এছাড়া মোবাইল ফোনে এসএমএস-এর মাধ্যমেও পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষার ফল জানতে পারে।
পাসের হার বিবেচনায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড (৯৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ)। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ঢাকা (৯৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ) ও দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড (৯৩ দশমিক ২৬ শতাংশ)। তবে অন্য বোর্ডগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে সিলেট শিক্ষা বোর্ড। এরপর যশোরে ৯২ দশমিক ১৯ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৯১ দশমিক ৪০ শতাংশ, বরিশালে ৯০ দশমিক ৬৬ শতাংশ, কুমিল্লায় ৮৯ দশমিক ৯২ শতাংশ এবং সিলেট শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৮৯ দশমিক ২৩ শতাংশ।
এছাড়া মাদ্রাসা বোর্ডে দাখিলের পাসের হার ৮৯ দশমিক ২৫ শতাংশ, কারিগরী শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৮১ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
এ বছর ১০টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৯২৩ জন। পাস করে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৩৩১ জন। এর মধ্যে ৬ লাখ ৭১ হাজার ৯৬১ জন ছাত্র এবং ৬ লাখ ৩১ হাজার ৩৭০ জন ছাত্রী।
এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৮৭০ জন। এর মধ্যে পাস করে ১০ লাখ ৮ হাজার ১৭৪ জন। এর মধ্যে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৬৭৭ জন ছাত্র এবং ৫ লাখ ৮ হাজার ৪৯৭ জন ছাত্রী।
এবারো পাঁচটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে সেরা স্কুল নির্ধারণ করা হয়েছে। গতবারের মতো এবারো প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডে ২০টি সেরা প্রতিষ্ঠানের তালিকা করা হয়েছে। এসএসসি পরীক্ষায় সকল বোর্ডের মধ্যে সেরা হয়েছে রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল এ্যান্ড কলেজ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আইডিয়াল স্কুল এ্যান্ড কলেজ। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভিকারুন নিসা নূন স্কুল এ্যান্ড কলেজ।
এবার শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান ৬ হাজার ২১০টি। গতবার এ সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৯২। এবং শূন্য ভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান ২৪টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২২।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ড : এবার ঢাকা বোর্ডে পরীক্ষায় অংশ নেয়া ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৯০৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩ লাখ ২২ হাজার ৮১৯ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ১ লাখ ৬১ হাজার ৭২৩ জন ছাত্র এবং ১ লাখ ৬১ হাজার ৯৬ জন ছাত্রী।
রাজশাহী বোর্ড :এ বোর্ডে পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ১৮২ জন। উত্তীর্ণ হয় ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৯৩ জন। এর মধ্যে ৬১ হাজার ১৬৮ জন ছাত্র এবং ৫৬ হাজার ৫২৫ জন ছাত্রী।
কুমিল্লা বোর্ড : কুমিল্লা বোর্ডে ১ লাখ ৪৫ হাজার ১৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয় ১ লাখ ২৯ হাজার ৮৬৮ জন। এর মধ্যে ৬০ হাজার ৬০০ জন ছাত্র এবং ৬৯ হাজার ২৬৮ জন ছাত্রী।
যশোর বোর্ড :যশোর বোর্ডে ১ লাখ ২৯ হাজার ৮৪২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ লাখ ১৯ হাজার ৯৭ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৬০ হাজার ৯৭২ জন ছাত্র এবং ৫৮ হাজার ১২৫ জন ছাত্রী।
চট্টগ্রাম বোর্ড : এ বোর্ডে ৯২ হাজার ১২৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৮৩ হাজার ৯৪৬ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৩৯ হাজার ৬১২ জন ছাত্র এবং ৪৪ হাজার ৩৩৪ জন ছাত্রী।
বরিশাল বোর্ড :এ বোর্ডে ৭০ হাজার ৪৩৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬৩ হাজার ৫৪৩ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৩১ হাজার ৮৬১ জন ছাত্র এবং ৩১ হাজার ৬৮২ জন ছাত্রী।
সিলেট বোর্ড :এ বোর্ডে ৬৮ হাজার ২৪৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬০ হাজার ৭৫০ জন উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ২৭ হাজার ৩৯৯ জন ছাত্র এবং ৩৩ হাজার ৩৫১ জন ছাত্রী।
দিনাজপুর বোর্ড :এ বোর্ডে ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৬৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৫৮ জন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এর মধ্যে ৫৬ হাজার ৩৪২ জন ছাত্র এবং ৫৪ হাজার ১১৬ জন ছাত্রী।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড :এবার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেয় ২ লাখ ৩৯ হাজার ৭৬৫ জন পরীক্ষার্থী। মোট উত্তীর্ণ হয় ২ লাখ ১১ হাজার ২০৩ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার ৯৩৬ জন ছাত্র এবং ১ লাখ ২৬৭ জন ছাত্রী।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ড : এ বছর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ লাখ ২ হাজার ৪২৩ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে ৮৩ হাজার ৯৫৪ জন উত্তীর্ণ হয়। এদের মধ্যে ৬১ হাজার ৩৪৮ জন ছাত্র এবং ২২ হাজার ৬০৬ জন ছাত্রী।
