নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় গতকাল শনিবার ছিল গণশুনানির তৃতীয় দিন। সাক্ষী দিতে এসেছিলেন শত শত মানুষ। এদের একজন বন্দর থানা এলাকার সাহিদুল ইসলাম। গণশুনানিতে সাক্ষ্য দিয়ে বের হয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘২৭ এপ্রিল আমার মেয়ের পরীক্ষা শেষে মেয়েকে নিয়ে লিংক রোড দিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। আনুমানিক দেড়টার দিকে ফতুল্লা স্টেডিয়ামের আগে র্যাব-১১-এর দুইটি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। হঠাত্ ওই সময় অন্য দুইটি প্রাইভেটকার থেকে কিছু লোককে র্যাবের গাড়িতে জোর করে তোলা হচ্ছিল। এ সময় তাদের একজন উঠতে চাচ্ছিল না। তাকে পিস্তল দিয়ে মাথায় আঘাত করতে দেখি।’
আরেক সাক্ষী মোহাম্মদ আলী সাক্ষ্য দিয়ে বের হয়ে সাংবাদিকদের বলেন, নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোড দিয়ে ঢাকা যাওয়ার পথে দেখি- ফতুল্লা স্টেডিয়ামের একটু সামনে রাস্তার পশ্চিম পাশে র্যাবের দুইটি গাড়ি অবস্থান করছে। পরে খবর পাই- নজরুলসহ ৭ জন আদালত থেকে সিদ্ধিরগঞ্জের বাসায় ফেরার পথে অপহূত হয়েছেন। এতে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়- র্যাবই তাদেরকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। এরপর আমি বাসায় এসে দেখি আমার প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন আশিকের (নিহত নজরুলের স্ত্রীর দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি) স্ত্রী ঘরের সমস্ত মালামাল নিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলে তিনি আমাকে জানান, বাবার বাড়িতে চলে যাচ্ছি। ফলে এ থেকে প্রতীয়মান হয়- আশিকও এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত।
সাক্ষ্য দেয়ার দাবিতে বিক্ষোভ
গতকাল সিদ্ধিরগঞ্জের পাওয়ার হাউজে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল ১১টা থেকে গণশুনানি শুরু হয়ে চলে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। সাক্ষ্য দিতে ৩০৬ জন নাম তালিকাভুক্ত করেন। শুনানি শেষে তদন্ত কমিটির কর্মকর্তারা বলেন, এ দিন তারা ১৯৮ জনের সাক্ষ্য নিয়েছেন। গণশুনানি শেষেও দেখা গেছে, শত শত নারী-পুরুষ সাক্ষ্য দিতে অপেক্ষা করছেন। তাদের সাক্ষ্য নেয়ার দাবিতে তারা বিক্ষোভও করেন।
বিক্ষোভকারীরা নূর হোসেন ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে শ্লোগান দেন। তদন্ত কমিটি বলেছে, সময় স্বল্পতার কারণে তারা সবার সাক্ষ্য নিতে পারেননি। শুধু প্রত্যক্ষদর্শী ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের সাক্ষ্য তারা নিতে পেরেছেন। হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শাহজাহান আলী মোল্লা গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। এর আগেও নারায়ণগঞ্জ শহরে দুই দিন গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি এলাকার মাহমুদ আলীর (৬৫) সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে ৭ সদস্যের কমিটি। সাক্ষ্য দিয়ে বের হয়ে মাহমুদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম একজন ভালো লোক ছিল। প্রশাসন ইচ্ছে করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আসামিদের গ্রেফতার করতে পারে। মিজমিজি এলাকার বৃদ্ধ আব্দুল খালেক সাক্ষী দিতে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি জানান, গত ১ ফেব্রুয়ারি নূর হোসেনের লোকজন নজরুলকে মারতে এসে এলাকায় তাণ্ডব চালায়। পরে নূর হোসেনই নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা দেয়। সেই মামলায় হাজিরা দিতে গিয়ে নজরুল অপহরণ হয়। তার দাবি, নূর হোসেনই র্যাব দিয়ে নজরুলসহ ৭ জনকে অপহরণ করিয়ে খুন করেছে। তিনি নূর হোসেনর ফাঁসির দাবি করেন।
পুরুষের পাশাপাশি অনেক নারীও সাক্ষী দিয়েছেন। মিজমিজি এলাকার কুলসুম (৪৮) সাক্ষ্য দিয়ে এসে সাংবাদিকদের জানান, ‘নজরুল মামা একজন ভালো লোক ছিল। কারো সাথে তাকে খারাপ আচরণ করতে দেখিনি। যারা তাকে এ ভাবে মেরেছে আমরা তার সুষ্ঠু বিচার চাই।’ আরেক সাক্ষী আছিয়া বেগম (৫৬) জানান, ‘নজরুল আমার উকিল বাবা। সে একজন খুবই ভালো লোক ছিল। এলাকার উন্নয়নে তার অনেক অবদান রয়েছে। তার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষণীয় হয়ে নূর হোসেন র্যাব দিয়ে তাকে হত্যা করেছে। হত্যকারীদের সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।’
নূর হোসেনের এক আত্মীয়ের দায়ের করা মামলায় নজরুলের সঙ্গে আসামি সহিদুল ইসলাম। তিনিও গতকাল সাক্ষ্য দিয়েছেন। শহিদুল জানান, ‘ঘটনার দিন আদালতে নজরুলকে এক লোক অনুসরণ করছিল। এ সময় আমাদের সন্দেহ হলে তাকে আটক করে কোর্ট পুলিশের হাতে সোর্পদ করি। পরে র্যাবের পোশাক পরা এক সদস্য এসে কোর্ট পুলিশের সাথে কথা বলে ওই লোকটিকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। পরে কোর্ট পুলিশকে জিজ্ঞাসা করলে জানায়, লোকটি র্যাবের গোয়েন্দা সদস্য। আসলে ওই লোকটি নজরুলকে ফলো করছিল।’
আজও সাক্ষ্য
আজ রবিবার নারায়ণগঞ্জে পুনরায় গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। বিকাল ৩টায় অনুষ্ঠিত এই গণশুনানিতে নারায়ণগঞ্জের সুশীল সমাজের সাক্ষ্য নেয়া হবে।
